যে লোকগুলো সেখানে দাঁড়িয়েছিল তাদের মুখ শুকিয়ে ছাই-এর মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ইংলিস সাহেব একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়েছিলেন কোনোদিকে না তাকিয়ে সেই গাছটা বেয়ে তিনি উপরে উঠে গেলেন বিদ্যুৎ বেগে। তাঁর বন্দুকটা পড়ে রইল গাছের তলায়!
পরক্ষণেই জঙ্গলের আবরণ ভেদ করে আত্মপ্রকাশ করল ক্রুদ্ধ শার্দুল!
বাঘটি অল্প বয়সের জানোয়ার, তবে তাকে একবারে নাবালক বাচ্চা বলা যায় না। বয়স কম হলেও বিক্রম বড়ো কম ছিল না। তার গোঁফ খাড়া হয়ে উঠেছিল, ঘাড়ের লোম শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছিল সজারুর কাঁটার মতো, লেজ লোহার ডাণ্ডার মতো কঠিন ও আড়ষ্ট এবং চোখ হিংস্র আক্রোশে জ্বলন্ত!
সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষই চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা, এই নীতি অবলম্বন করে দৌড় মারল। যে ছোকরাটি ঢিল ছুঁড়েছিল সেও দ্রুতবেগে পা চালিয়েছিল, কিন্তু ব্যাঘ্রের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারল না। দু বার কি তিন বার লাফ মেরে বাঘ একেবারে তার পিঠে এসে পড়ে সজোরে চপেটাঘাত করল। সে কি ধাক্কা, এক থাপ্পড়ে ছেলেটির দেহ শূন্যপথে উড়ে গিয়ে ধরাশায়ী গ্রহণ করল সশব্দে!
বিড়াল যেমন ইঁদুরের পিছনে তাড়া করে ছুটে তেমনি করেই বাঘ ছুটে গেল ধরাশায়ী ছেলেটির দিকে। ভাগ্যক্রমে সে ছেলেটির গায়ে দাঁত কিংবা নখ বসাবার চেষ্টা করল না। ভূপতিত শত্রুর পাশে দাঁড়িয়ে সে তার কাধ আর ঘাড়ের মৃদু সঞ্চালনে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করল, তার লাঙ্গল পাঁজরের উপর আছড়ে পড়তে লাগল। আক্রোশে তার কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে লাগল অবরুদ্ধ ক্রোধের চাপা গর্জনধ্বনি।
তরুণ বাঘ তার রাজত্বে অনধিকার প্রবেশকারীর উপর তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছে সদর্পে ও সগর্জনে!
ততক্ষণে ভয়ের ধাক্কা সামলে নিয়েছেন ইংলিস সাহেব। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে তিনি বন্দুকটাকে হস্তগত করলেন, তারপর চটপট বন্দুকে গুলি ভরে নিয়ে গুলি চালালেন। একটা গুলি লাগল বাঘের পিছনে, আর একটি গুলি তার বুক ভেদ করে চলে গেল। তৎক্ষণাৎ ধরাশয়ী ছেলেটির শরীরের উপর পড়ে গেল গুলিবিদ্ধ ব্যাঘ্রের মৃতদেহ। তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে বাঘের তলা থেকে টেনে আনা হল। পরীক্ষা করে দেখা গেল তার পাঁজরের উপর বাঘের নখ লেগে একটি গভীর ক্ষতচিহ্নের সৃষ্টি হয়েছে বটে, তবে আঘাত মারা যাবার মতো নয়।
আচম্বিতে নীচের ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে এল আর একটি গম্ভীর গর্জনধ্বনি। ইংলিস সাহেব আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলেন গাছটির দিকে। তবে এবার আর গাছে ওঠার চেষ্টা না করে আগে যেটায় চড়েছিলেন, সেটার আড়ালে আশ্রয় নিলেন। ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে আরও কয়েকটা গর্জন শোনা গেল, তবে সৌভাগ্যবশত কণ্ঠস্বরের মালিক জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করতে চাইল না।
সহেব এবং তাঁর সঙ্গীদল রীতিমত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। বারবার গর্জন শুনে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় করা মুশকিল। জঙ্গলের আড়ালে একাধিক ব্যাঘ্রের অবস্থানের সাংঘাতিক সম্ভাবনা যখন সকলকেই উদবিগ্ন করে তুলেছে, তখন হঠাৎ মুশকিল আসানের মতো দেখা দিল অশ্বারোহী জগরু এবং তার পিছনে হাতির সঙ্গে একদল গ্রামবাসী ও জেমস ইংলিসের ভৃত্যবর্গ।
ওই অঞ্চলের বাঘের মেজাজ-মরজি সম্পর্কে ইংলিস সাহেবের যে অভিজ্ঞতা হল, তাতে তিনি বুঝেছিলেন যথেষ্ট সাবধান না হলে বাঘের কবলে এক বা একাধিক মানুষের হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অতএব নীচের জঙ্গলে বাঘ যেখানে আত্মগোপন করেছে, সেই জায়গাটা থেকে যথাসম্ভব দূরে দাঁড়িয়ে তিনি লোকজনদের চেঁচামেচি করে বাঘকে ভয় দেখাতে বললেন। তিনি নিজে জগরুর সঙ্গে মতির পিঠে বসলেন। তাঁর আদেশে মতির মাহুত তাকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে চলল। হাতি অবশ্য ব্যাপারটা আদৌ পছন্দ করছিল না।
এবার প্রায় দুই মানুষ উঁচু ঘন উদ্ভিদের মধ্যে প্রবেশ করল হাতি, আর পরমুহূর্তেই গর্জে উঠল বাঘ। তৎক্ষণাৎ জঙ্গল থেকে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল হাতি। তাকে অনেক মারধর, অনেক তোয়াজ করেও কোনো ফল হল না। হাতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঘন জঙ্গলের মধ্যে বাঘের সান্নিধ্যে আসতে সে নিতান্তই নারাজ।
বাধ্য হয়ে হাতির পিঠ থেকে মাটিতে নামলেন ইংলিস সাহেব। জগরুকে সঙ্গে নিয়ে অনেক ঘুরে তিনি নদীর ধার দিয়ে একটা খাড়া পাড় বেয়ে সমতল ভূমিতে হাজির হলেন। ওই জায়গাটা থেকে নীচের জঙ্গলের দিকে দৃষ্টি রাখা অনেক সহজ।
গহ্বরের মতো অরণ্য-সঙ্কুল নিম্নভূমি ছিল চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ একরের মতো চওড়া। জায়গাটা অতিশয় দুর্গম। অসমান মাটির উপর হাঁ করে রয়েছে অসংখ্য ফাটল, আর সেই ফেটে যাওয়া মাটির চারপাশে লতাগুল্ম ও শুষ্ক ঝোপের সমাবেশে গড়ে উঠেছে এক দুর্ভেদ্য ন্যূহ। অভিজ্ঞ শিকারি জেমস ইংলিস বুঝলেন একটি মাত্র হাতির সাহয্যে সেই উদ্ভিদের ব্যুহ ভেদ করে বাঘের সম্মুখীন হওয়া অসম্ভব।
সুতরাং তখনকার মতো বাঘের অনুসরণকার্যে ইস্তফা দিলেন জেমস ইংলিস। আশেপাশে একদল লোক মোতায়েন করে তিনি নির্দেশ দিলেন বাঘের গতিবিধির কোনো লক্ষণ দেখলে তারা যেন অবিলম্বে সেই খবর সাহেবকে পাঠিয়ে দেয়। নির্দেশ অনুসারে কাজ করলে প্রচুর পুরস্কারের আশা দিয়ে মৃত বাঘের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে সাহেব অ্যালেনগঞ্জে চলে গেলেন, আর সেখান থেকে তার ঘোড়ার সাহায্যে অশ্বারোহী দূত পাঠিয়ে দিলেন হাতি সংগ্রহের চেষ্টায়।
