প্রায় এক ঘণ্টা পরে ডেভ আর এড যখন ঘরে ঢুকল তখন ফুলার কাঁধের ক্ষতটার উপর একটা ব্যান্ডেজ বাঁধার চেষ্টা করছে। ঘরের মধ্যে পুমার মৃতদেহ এবং ফুলারের রক্তাক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে এড আর ডেভ সহজেই অনুমান করে নিল ব্যাপারটা কি হয়েছে।
দারুণ বিস্ময়ে এড যে শপথ বাক্যাটি উচ্চারণ করল সিধে বাংলায় তার অর্থ হচ্ছে, এ কি দেখছি! পুমা এগিয়ে এসে মানুষকে আক্রমণ করে।
হঠাৎ ফুলারের দৃষ্টি পড়ল ছাদের বরগার সঙ্গে ঝোলানো মৃগ-মাংসের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ফুলারের মনে হল হয়তো ওই মাংসের লোভেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করেছিল পুমা, প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা তার ছিল না–
মাংস-লোপ ক্ষুধার্ত পুমাকে হয়তো ফুলার প্রতিশোধ পরায়ণ শ্বাপদ বলে ভুল করছে, হয়তো যে সব বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিতত্ত্ববিদ পুমার নিরীহ স্বভাবের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের কথাই ঠিক, কিন্তু–
হ্যাঁ, তবু একটা কিন্তু থেকে যায়। যে কোনো কারণেই হোক এই পুমাটা মানুষের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে ঘরের ভিতর প্রবেশ করেছিল এবং জানলার খোলা পথে পালানোর উপায় থাকা সত্ত্বেও সে মানুষকে আক্রমণ করতে একটুও ইতস্তত করে নি।
উদভ্রান্ত শিকারি
কর্মোপলক্ষ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষের বিহার অঞ্চলে জেমস ইংলিস নামে এক সাহেবের রোমাঞ্চকর একটি শিকারের অভিজ্ঞতা তোমরা কিছুদিন আগে সন্দেশ-এ পড়েছ। এবার তার আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা তোমাদের বলব।
বিশেষ কোনো কারণে কিছুদিনের জন্য মাতৃভূমি নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিলেন জেমস ইংলিস। ফিরে এসে তিনি দেখেন তার কাজের জায়গা বদলে গেছে। এবার তাঁকে যেতে হবে অযোধ্যা প্রদেশের উত্তর-অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল তৃণভূমিতে। সেখানে তাঁর বাসস্থানটিও নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে।
এলাকাটি ইংলিস সাহেবের সম্পূর্ণ অপরিচিত। ওখানকার মানুষের রীতিনীতিও তার অজানা। তা ছাড়া বাঙালি সংলাপে অভ্যস্ত থাকলেও অযোধ্যার বাসিন্দাদের ভাষা বুঝতে প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হচ্ছিল। আরো এই যে, তার প্রথম বারের জায়গা কুশীনদের তীরে বনভূমির সঙ্গে অযোধ্যার বন্য প্রকৃতির কোনো সাদৃশ্য ছিল না। এখানে শস্যের চেহারা অন্যরকম, চাষবাসের ব্যবস্থা আগের তুলনায় আদিম। বালুকাময় প্রান্তরের মধ্যে সুদীর্ঘ ঘাসজঙ্গলের পরিবর্তে অযোধ্যায় দেখা যায় ছায়া নিবিড় অরণ্যের জটিল সমাবেশ, আর সেই অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে তৃণগুল্মে আবৃত অসংখ্য প্রান্তর বহু দূর প্রশস্ত বিস্তার। কৃষ্ণসার নামে হরিণজাতীয় পশুরা দলে দলে ঘুরে বেড়ায় ওইসব প্রান্তরের বুকে।
বনভূমির সবচেয়ে কাছাকাছি শহর সাজাহানপুর অঞ্চলের দক্ষিণে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে ওই শহরটির অবস্থান। উত্তরদিকে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট, নাম সীতাপুর। সীতাপুরের মাঝখানে একটি গ্রাম আর পুলিশ স্টেশন।
ইংলিসের সঙ্গে ছিল একটি হস্তিনী, নাম মতি। সর্দানদীর ধারে জঙ্গল আছে শুনে ঘোড়ায় চড়ে জায়গাটা দেখতে গেলেন জেমস ইংলিস। তার আদেশে ঘোড়ার পিছু পিছু হাতিটাকে চালিয়ে নিয়ে এল সাহেবের ভৃত্যবর্গ। ওই জঙ্গলে শিকারের সম্ভাবনা আছে কিনা দেখার উদ্দেশ্য ছিল ইংলিসের।
জঙ্গলের ভিতর বহু হরিণ আর শুয়োরের পায়ের ছাপ দেখা গেল। শিকারের উপযোগী অন্যান্য জীবেরও অভাব ছিল না সেখানে। তবে বাঘ ভাল্লুকের মতো বড়ো জানোয়ারের কোনো চিহই চোখে পড়ল না। নিতান্ত নিরাশ হয়ে ফিরে আসছিলেন, হঠাৎ বাধা পড়ল। জগরু নামে যে সহিসটি তার সঙ্গ নিয়েছিল, সে জানাল একটু এগিয়ে গেলে বড় শিকারের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে তার ধারণা, এমন কি বাঘের খোঁজ পাওয়াও অসম্ভব নয়।
জাগরু শিকারে অভিজ্ঞ। তার কথা উড়িয়ে দিতে পারলেন না ইংলিস সাহেব।
নির্দিষ্ট দিকে জগরুর সঙ্গে এগিয়ে চললেন তিনি। উঁচু বালিজমির উপর অজস্র তিল ও শিমূল গাছের শুকনো ঝোঁপ ভেদ করে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শিকারিরা এসে পড়লেন সবুজ পত্রপল্লব ও উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ঘন অরণ্যের সামনে।
কোনো কারণে উঁচু জমির কিছু অংশ ধসে যাওয়ার ফলে একটা বিরাট গহ্বরের আকার নিয়ে নীচু জমির উপর হঠাৎ জেগে উঠেছে শ্যামল বনভুমি। গাছপালার ফাঁকে নদীর দিকে আকৃষ্ট হল শিকারিদের দৃষ্টি। সূর্যের আলোতে ঝক ঝক করে জ্বলছিল বালুকারাশির উপর প্রবাহিত নদীর জলধারা। বালিতে ভরা শুকনো জমি থেকে অনেক নীচে ওই বনভূমি। সাহেব বুঝলেন ওইখানেই বড়ো শিকারের খোঁজ পাওয়া যাবে। জায়গাটা বাঘের বসবাসের পক্ষে প্রশস্ত।
জগরুর দিকে তাকিয়ে ইংলিস দেখলেন তার ঠোঁটে ফুটে উঠেছে হাসির রেখা। সেই নীরব হাসির মর্ম সাহেবের কাছে স্পষ্ট কি সাহেব! বলেছিলাম কিনা জগরু কেমন দরের লোক এখন বুঝেছ তো?
হাতির সাহায্য ছাড়া ওই বনে শিকারের খোঁজ করা সম্ভব নয়। অতএব ইংলিস সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগলেন তাঁর নির্দেশ অনুসারে সহিস জগরু তার ঘোড়ায় চড়ে তিরবেগে ছুটল হাতি আনার জন্য।
পাইপে আগুন ধরিয়ে ইংলিস সাহেব ধূমপানে মনোনিবেশ করলেন। তারই ফাঁকে গ্রামবাসীদের সঙ্গে গল্প-গুজবও চলল। একটি অল্পবয়সী ছোকরা মাটির ঢেলা নিয়ে নীচের জঙ্গলে ছুঁড়ে মারছিল অলস খেয়ালের বশে।
সামান্য ঘটনা থেকে অনেক সময় চমকপ্রদ ঘটনার উদ্ভব হয়। ছেলেটির হাতের তৃতীয় বা চতুর্থ ঢিলটি জঙ্গলের ভিতর পড়তেই হঠাৎ গর্জিত কণ্ঠে প্রবল প্রতিবাদ ভেসে এসে জানিয়ে দিল নীচের জঙ্গলটি বর্তমানে ব্যাঘ্রের বাসভূমি এবং ঢিল ছোঁড়ার ব্যাপারটা বাঘ মশাই মোটেই পছন্দ করছেন না।
