এড এবং ডেভ জন্তুটাকে দেখতে পায়নি। ঘোড়ার পিঠ থেকেই পুমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুডল ফুলার। পমার মুখের কাছেই একটা পাথরের উপর তীব্র সংঘাতের শব্দ তুলে গুলিটা ঠিকরে পড়ল, ভয়ার্তকণ্ঠে চিৎকার করে পুমাও গা-ঢাকা দিল তৎক্ষণাৎ!
পুমা যে তাদের অনুসরণ করছে এবং তার উদ্দেশ্য যে ভালো নয় এ বিষয়ে ফুলারের আর সন্দেহ ছিল না। ডেভ ও এড অবশ্য ফুলারের সন্দেহ অমূলক বলে উড়িয়ে দিল। এড আরও বলল যে, কয়েক মাইল দূরে যে কাঠের ঘরটা আছে শীঘ্রই তারা সেখানে পৌঁছে যাবে, কাজেই এ যাত্রায় আর মি, কুগারের সঙ্গে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ফুলারের ধারণা অবশ্য অন্যরকম, তবে সে তর্ক না করে ঘোড়া চার্লিয়ে দিল গন্তব্য পথের দিকে…
যে কাঠের ঘরটার কথা এড কেনেডি তার সঙ্গীদের কাছে বলেছিল, সেই ঘরটার সামনে তারা যখন এসে পৌঁছল তখন প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমেরিকার বনে-জঙ্গলে এই ধরনের কাঠের ঘর দেখা যায়; ঘরগুলি কোনো ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তি নয়। ভবঘুরে শিকারিরা এগুলো তৈরি করে ভবঘুরে শিকারিদের জন্যই। এই সব ঘরের দরজা-জানালাও অনেক সময় থাকে না। এই ঘরটা অবশ্য দরজা থেকে তখনও বঞ্চিত হয়নি, তবে দু-দুটো জনালার মধ্যে একটারও পাল্লার বালাই ছিল না! খোলা জানালা দিয়ে ঘরের ভিতর ছুটে আসছিল ঠান্ডা হাওয়া। হরিণের চামড়া দিয়ে জানালা দুটির ফাঁক বন্ধ করে শিকারিরা কনকনে ঠান্ডা বাতাসের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করল। এড আগুন জ্বালিয়ে খাদ্য প্রস্তুত করতে লাগল। শিকারিদের সঙ্গে কিছুটা মৃগমাংস ছিল, সেই মাংসের টুকরোটা তারা ছাদের বরগার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘরের তিনটি কোণে শয্যা প্রস্তুত করে তিন সঙ্গী যখন নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মনোনিবেশ করল, বাইরে তখন নেমে এসছে রাত্রির অন্ধকার…
গভীর রাতে হঠাৎ ডেভ-এর ডাকাডাকিতে ফুলারের ঘুম ভেঙে গেল। ডেভ ফুলারকে জানাল বাইরে তাদের ঘোড়াগুলিকে সে বেঁধে রেখেছিল বটে, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে উত্তেজিত হয়ে দুটি ঘোড়া অন্ধকার অরণ্যের গর্ভে আত্মগোপন করেছে। অতএব এডকে নিয়ে সে এখনই পলাতক অশ্ব দুটিকে গ্রেপ্তার করতে বাইরে যাচ্ছে, ফুলার যেন সাবধানে থাকে।
আচ্ছা, বলেই ফুলার আবার ঘুমিয়ে পড়ল। জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সে কৃতকার্য হল না, তার শ্রান্ত ক্লান্ত দেহ তখন বিশ্রাম চাইছে নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে..
আচম্বিতে ঘুম ভেঙে ফুলার সচমকে উঠে বসল, তার শ্রবণ-ইন্দ্রিয়ে প্রবেশ করেছে একটা ঘর্ষণ-শব্দ।
প্রথমে সে ভাবল ঘোড়াগুলো হয়তো পা ঠুকছে, কিন্তু ভালো করে কান পেতে শুনে সে বুঝতে পারল, পাহাড়ের দিকে যে জানালাটা আছে সেই জানালার সঙ্গে ঝোলানো হরিণের চামড়াটার উপর কেউ যেন নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।
নখের আঁচড় কাটার শব্দ!
মোটেই ভালো কথা নয়।
মুহূর্তের মধ্যে ফুলারের ঘুমের ঘোর কেটে গেল, সে শয্যাত্যাগ করার উপক্রম করল।
কিন্তু ফুলার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর আগেই হরিণের চামড়াটা কোনো অদৃশ্য হাতের ধাক্কা খেয়ে ঘরের ভিতর দিকে সরে এল এবং মুক্ত বাতায়ন-পথে মেঝের উপর সশব্দে অবতীর্ণ হল এক অতিকায় মাজারের দেহ পুমা।
দারুণ আতঙ্কে ফুলারের দেহের রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। পুমা তার দিকে চাইল না, শ্বাপদের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে সেই দিকে যেখানে ছাদের বরগা থেকে ঝুলছে একখণ্ড মৃগ-মাংস।
পুমা এইবার দৃষ্টি সঞ্চালিত করল ফুলারের দিকে সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠে জাগল অবরুদ্ধ গর্জনধ্বনি এবং উন্মুক্ত মুখগহ্বরের ভিতর থেকে উঁকি দিল ভয়ংকর দাঁতের সারি!
ফুলার ঘরের কোণে অবস্থিত রাইফেলটার দিকে সতৃষ্ণনয়নে দৃষ্টিপাত করলে এবং অস্ত্রটাকে হাতের কাছে না রাখার জন্য নিজেকে অভিসম্পাত দিল বারংবার।
পুমা ঘরের মেঝের উপর নীচু হয়ে বসে পড়ল, তার কান দুটো চ্যাপ্টা হয়ে মাথার খুলির সঙ্গে মিশে গেল বিড়াল-জাতীয় পশুর আক্রমণের নিশ্চিন্ত সংকেত। ফুলার একবার ভাবল লাফ মেরে দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করবে, কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝল, পিছন থেকে আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার কোনো চেষ্টাই সে করতে পারবে না, অতএব পলায়নের কথা ভুলে গিয়ে সে বিছানার পাশে হাত বাড়িয়ে লম্বা ছুরিটা তুলে নিয়ে প্রস্তুত হল যুদ্ধের জন্য…
হিংস্র দন্তবিকাশ করে সগর্জনে লাফ দিল পুমা, বিদ্যুৎবেগে নীচু হয়ে ফুলার শ্বাপদের আক্রমণ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। পুমার ধারালো নখগুলি শত্রুর কাঁধের উপর এঁকে দিল সুগভীর ক্ষতচিহ্ন, তৎক্ষণাৎ শাপদের পাঁজর ভেদ করে বসে গেল শিকারির হাতের শাণিত ছুরিকা!
তীব্র আর্তনাদ করে পুমা ছিটকে পড়ল দেয়ালের উপর এবং সেখান থেকে ঠিকরে এসে মেঝের উপর গড়িয়ে পড়ল। এক লাফে ঘরের অপর প্রান্ত থেকে রাইফেলটা হস্তগত করে ফুলার প্রস্তুত হল চরম মুহূর্তের জন্য।
আহত পুমা আবার তেড়ে এল। ফুলার গুলি চার্লিয়ে দিল জন্তুটার মুখ লক্ষ্য করে। ভীষণ চিৎকারে ঘর কাঁপিয়ে পুমা পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তারপরই মেঝের উপর ছিটকে পড়ে ছটফট করতে লাগল। ফুলার আরও তিনবার গুলি ছুড়ল, পুমার দেহটা একবার টান হয়েই স্থির হয়ে গেল। ফুলার যখন বুঝল, জন্তুটার দেহে প্রাণ নেই, তখন রাইফেল নামিয়ে সে দেয়ালে পিঠ রেখে বসে পড়ল– দারুণ আতঙ্ক ও উত্তেজনায় তার সর্বশরীর হয়ে পড়েছে।
