ডেভ রোজার্স নামক আর একটি শিকারি ছিল ফুলারের সঙ্গী, তাদের পথ-প্রদর্শক হল এড কেনেডি নামধারী একজন স্থানীয় অধিবাসী। শিকারিরা প্রত্যেকেই ঘোড়ার পিঠে যাত্রা শুরু করেছিল, তা ছাড়া প্রয়োজনীয় মালপত্র বহন করার জন্য তারা আরও তিনটি অতিরিক্ত ঘোড়া সঙ্গে নিয়েছিল।
শিকারিরা প্রথম দিন তাবু ফেলল একটা পাহাড়ের নীচে। জায়গাটা অত্যন্ত নির্জন। একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে একটা মস্ত বড়ো পাথরের মধ্যস্থলে অবস্থিত জমিটার উপর দাঁড়িয়ে শিকারিরা দেখল, পূর্বোক্ত পাথরের ঢালু দেয়াল নেমে গেছে একটা গভীর খাদের মধ্যে এবং সেই সুগভীর খাদের বক্ষ ভেদ করে ছুটে চলেছে এক পার্বত্য-নদীর তীব্র জলস্রোত। উপরে পাহাড়ের মাথায় দেখা যাচ্ছে তুষারের শুভ্র আস্তরণ, নীচের দিকেও যতদূর দেখা যায় চোখে পড়ে শুধু বরফ আর বরফ।
ওইখানেই শিকারিরা আস্তানা পাতল। সন্ধ্যার সময়ে ডেভকে তাবুর পাহারায় রেখে ফুলার ও এড হানা দিল নিকটবর্তী অরণ্যে। একটু পরেই তাদের গুলিতে মারা পড়ল একটা হরিণ। এই জন্তুটা অবশ্য এ হরিণ নয়, তবে মাংসের জন্যই তারা জন্তুটাকে বধ করতে বাধ্য হয়েছিল। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার জন্য তাদের টাটকা খাদ্য অর্থাৎ টাটকা মাংসের প্রয়োজন ছিল।
এল রাত্রি। শিকারিরা মৃত হরিণটাকে একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিয়ে তাঁবুর ভিতর শয্যাগ্রহণ করল। হরিণের দেহটা তারা তাঁবুর মধ্যে রাখেনি, কারণ মাংসের লোভে হয়তো কোনো বুনো জানোয়ার তাবুতে হানা দিতে পারে, কিন্তু গাছের উপর ঝোলানো মৃগ-মাংসকে শিকারিরা বন্যপশুর নাগালের বাইরে নিরাপদ বলে বিবেচনা করেছিল। পরের দিন সকালে উঠেই শিকারিদের আক্কেলগুড়ুম! গাছের উপর হরিণটা স্বস্থানে আছে বটে কিন্তু সম্পূর্ণ নেই। হরিণের দেহ থেকে বেশ কিছু মাংস হয়েছে অদৃশ্য!
গাছের নীচে জমি পরীক্ষা করে শিকারিরা পুমার পায়ের ছাপ দেখতে পেল। পদচিহ্ন পরীক্ষা করে তারা বুঝল, জন্তুটার ওজন হবে দেড়শো থেকে দুশো পাউন্ড!
হানাদার পুমাটা নেহাত ছোটোখাটো জীব নয়!
ফুলার লক্ষ করল পথ-প্রদর্শক এড কেনেডির মুখে ফুটে উঠেছে দারুণ বিস্ময়ের চিহ্ন, সে যেন হতভম্ব হয়ে পড়েছে।
ফুলার প্রশ্ন করল, কি ভাবছ তুমি?
এড বলল, আমি ভাবছি জন্তুটা গাছে উঠে মাংস নিয়ে গেল অথচ এত কাছে দাঁড়িয়েও ঘোড়াগুলো পুমার উপস্থিতি টের পেল না!
সত্যি কথা। পুমাকে দেখতে পেলে বা তার গায়ের গন্ধ পেলে নিশ্চয়ই ঘোড়াগুলো চিৎকার করে শিকারিদের ঘুম ভাঙিয়ে দিত; কিন্তু এমন নিঃশব্দে, এমন ক্ষিপ্রগতিতে জন্তুটা গাছে উঠে মাংস নিয়ে গেছে যে নিকটবর্তী ঘোড়গুলির সম্মিলিত দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি শ্বাপদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারেনি।
পুমাটা অসাধারণ চটপটে আর ধূর্ত ছিল সন্দেহ নেই, তবে ঘোড়ার মতো প্রখর অনুভূতি। সম্পন্ন জানোয়ারকে বার বার ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়দ্বিতীয় রাত্রে তীব্র হ্রেষাধ্বনিতে শিকারিদের ঘুম ভেঙে গেল।
এড এবং ডেভ শয্যাত্যাগ করার আগেই ফুলার রাইফেল হাতে তাবুর বাইরে পদার্পণ করল। অগ্নিকুণ্ডের আলোতে অস্পষ্টভাবে পুমার দেহটা ফুলারের চোখে পড়ল, চকিতে রাইফেল তুলে সে গুলি চার্লিয়ে দিল। রাইফেলের যান্ত্রিক গর্জনধ্বনিকে ডুবিয়ে দিয়ে জেগে উঠল জান্তব কণ্ঠের তীব্র ও তীক্ষ্ণ চিৎকার- পরক্ষণেই অন্ধকারের চেয়েও কালো এক চতুস্পদ ছায়ামূর্তি মিলিয়ে গেল অন্ধকার অরণ্যের অন্তঃপুরে!
এড আর ডেভ এসে দাঁড়াল ফুলারের পাশে। এড বলল, জন্তুটার চিৎকার শুনে বোঝা যায় সে আহত হয়েছে। তার ধারণা, অবশিষ্ট মৃগ-মাংসের সন্ধানেই পুমাটা আবার তাঁবুর কাছে এসেছিল।
ফুলার কিন্তু সঙ্গীর মন্তব্যে সায় দিল না। তার ধারণা জন্তুটা শিকারির দলকে অনুসরণ করছে।
এড হেসে জানিয়ে দিল ফুলারের সন্দেহ অমূলক, একেবারে কোণঠাসা না হলে পুমা কখনও মানুষকে আক্রমণ করতে চায় না।
ফুলারের গুলিতে পুমাটা আহত হয়েছিল। সকালে উঠে ফুলার জন্তুটার পায়ের ছাপ ধরে সেটাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করল। পুমার একটা থাবা মাটির উপর দিয়ে ঘষে ঘষে গেছে দেখে শিকারিরা বুঝতে পারল ফুলারের গুলি জন্তুটার একটা থাবা জখম করে দিয়েছে।
একটু পরেই ফুলার আবিষ্কার করল এক ভয়াবহ তথ্য! শিকারিরা ঘুরছে পুমার পিছনে, কিন্তু পুমার পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যায় বৃত্তাকারে ঘুরে এসে সে শিকারিদের পিছু নিয়েছে।
ফুলার সন্ত্রস্ত্র হয়ে উঠল। তার সঙ্গীরা অবশ্য ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। এড বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বিড়াল-জাতীয় জানোয়ারের মধ্যে কৌতূহল খুব প্রবল, তাই কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্যই পুমা শিকারিদের অনুসরণ করতে উদ্যত হয়েছে।
ফুলারের অস্বস্তি দূর হল না। তার কেবলই মনে হতে লাগল পুমা জানে কে তাকে আঘাত করেছে। তাই প্রতিশোধ নেবার জন্যই জন্তুটা তাকে অনুসরণ করছে।
একটু পরেই তার সন্দেহ আরও দৃঢ় হল। ডান দিকে একটা মস্ত পাথরের উপর পুমার মাথাটা। তার নজরে পড়েছে।
পাথরটার উপর থেকে পুমা নীচের দিকে তাকিয়ে অশ্বারোহী শিকারিদের লক্ষ্য করছিল– জটার ঈষৎ হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ধারালো দাঁতগুলো দেখে শিউরে উঠল ফুলার।
