তবে তিনি তার শর্ত রক্ষা করেছিলেন। টেলর সাহেব পরবর্তীকালে কখনো সিংহ শিকার। করেননি!
[ফাল্গুন ১৩৮০]
আমেরিকার সিংহ
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীরা যে বিড়াল-জাতীয় জীবটিকে পার্বত্য-সংহ নামে অভিহিত করে সেই জন্তুটি কিন্তু সিংহ নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন জানোয়ার।
পার্বত্য-সিংহ নামক জন্তুটির আরও কয়েকটি প্রচলিত নাম আছে, যেমন- পুমা, কুগার, প্যান্থার প্রভৃতি। এই নামগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দুটি নাম হচ্ছে পুমা এবং কুগার।
সিংহের সঙ্গে পুমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কিছুটা সাদৃশ্য আছে, পুমার গায়ের রংও অনেকটা সিংহের মতো। তবে স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে বিচার করলে সিংহের সঙ্গে পুমার বিশেষ মিল নেই। নিতান্ত বিপদে না পড়লে পুমা লড়াই করতে চায় না, বরং পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে; কিন্তু পশুরাজ সিংহের রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দীর বিরুদ্ধে মৃত্যুপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
সিংহ, বাঘ, লেপার্ড প্রভৃতি বিড়াল-জাতীয় বড়ো বড়ো জানোয়ারের মতো হিংস্র নয় পুমা, তাকে দস্তুরমতো নিরীহ বলা যায়। মানুষকে সে পারতপক্ষে আক্রমণ করে না। তবু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পশুপালকরা পুমার সম্বন্ধে অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। তার কারণ মানুষকে ভয় করলেও গৃহপালিত পশুর মাংস পুমার প্রিয় খাদ্য। প্রতি বৎসর বহু সংখ্যক গোরু, বাছুর, ভেড়া প্রভৃতি গৃহপালিত পশু পুমার আক্রমণে প্রাণ হারায়। এমনকি ঘোড়ার মতো বলিষ্ঠ জানোয়ারও পুমার কবল থেকে নিষ্কৃতি পায় না। সেইজন্য পশুপালকদের কাছে পুমা হচ্ছে। চোখের বালির মতোই দুঃসহ।
পুমাকে হত্যা করার জন্য শিকারিরা শিক্ষিত কুকুরের সাহায্য গ্রহণ করে। এই হাইল্ড বা শিকারি ককর দলবদ্ধ হয়ে পমাকে অনুসরণ করে এবং পলাতক পমার গায়ের গন্ধ শুঁকে শুঁকে তারা গ্রেপ্তার করে ফেলে, বেচারা পুমা কুকুরের প্রখর ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়কে কিছুতেই ফাঁকি দিতে পারে না। কোণঠাসা হলে পুমা সাধারণত গাছে উঠে সারমেয়-বাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে কুকুরের চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে অকুস্থলে উপস্থিত হয় বন্দুকধারী শিকারি এবং তারপরই গুলিবিদ্ধ পুমার প্রাণহীন দেহ আছড়ে পড়ে মাটির উপর। অনেক সময় শিকারিকে আসতে দেখলে পুমা গাছের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে সারমেয়-বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে ছুটে পালাতে চায়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার চেষ্টা সফল হয় না– দলবদ্ধ শিকারি কুকুরের আক্রমণে পুমার সর্বাঙ্গ হয়ে যায় ছিন্নভিন্ন।
তবে সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে। ফ্ল্যাটহেড নামক যুক্তরাষ্ট্রের এক অঞ্চলে হঠাৎ একবার আবির্ভূত হল একটি পুমা এবং কিছুদিনের মধ্যে সে এমন ভয়ংকর স্বভাবের পরিচয় দিল যে শিকারিরা হয়ে গেল স্তম্ভিত, স্থানীয় মানুষ হয়ে পড়ল সন্ত্রস্ত। এই সৃষ্টিছাড়া পুমাটা সারমেয়ে-বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করত না, আক্রান্ত হলেই সে অদ্ভুত সাহস ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে প্রতি-আক্রমণ করে কুকুরের দলকে বিধ্বস্ত করে ফেলত এবং শিকারি অকুস্থলে উপস্থিত হওয়ার আগেই চটপট পা চার্লিয়ে নিরাপদ স্থানে প্রস্থান করত। শিকারি এসে দেখত তার প্রিয় কুকুরদের মধ্যে অধিকাংশের দেহের উপরই রয়েছে পুমার ধারালো নখের রক্তাক্ত স্বাক্ষর, দটি বা একটি কুকুরের প্রাণহীন দেহ হয়েছে ধরাশয্যায় লম্বমান এবং বাকি কুকুরগুলো আতঙ্কে এমন বিহ্বল হয়ে পড়েছে যে তারা আর ওই বিপদজনক বিড়ালের পিছু নিতে রাজি নয়।
বারংবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ফলে কুকুরের দল ঘাবড়ে গেল, ওই পুমাটার গায়ের গন্ধ পেলে তারা আর শিকারকে অনুসরণ করতে রাজি হত না কিছুতেই।
অনেক চেষ্টা করেও এই জন্তুটাকে কোনো শিকারি হত্যা করতে পারেনি, অবশেষে হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় পুমাটার মৃত্যু হয়।
পুমার সম্বন্ধে বিভিন্ন ধরনের পরস্পরবিরোধী মতামত শোনা যায়। অধিকাংশ শিকারি ও প্রাণিতত্ত্ববিদের অভিমত হচ্ছে পুমা নিতান্তই ভীরু জানোয়ার, মানুষকে সে কখনোই আক্রমণ করতে চায় না। কিন্তু দু-একজন শিকারি ভিন্নমত পোষণ করেন; তাঁরা বলেন, সুযোগ পেলে পুমা মানুষকে আক্রমণ করে, এমনকি নরমাংসের আস্বাদ গ্রহণ করতেও নাকি তাদের আপত্তি নেই!
এ বিষয়ে জোর করে কিছু বলা মুশকিল, তবে দু-একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী পাঠ করে মনে হয় মাংসাশী বন্যপশুর স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
উত্তর আমেরিকার এক গভীর অরণ্য থেকে ফিরে এসে জনৈক শিকারি ঘোষণা করল, যে সব বইতে পুমাকে নিরীহ বলে উল্লেখ করা হয় সেই সব বই অবিলম্বে অগ্নিতে সমর্পণ করা উচিত এবং যে-সব বিশেষজ্ঞ ওই জন্তুটিকে হিংস্র নয় বলেছেন, তাঁদের কথাও আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। উক্ত শিকারির বিবরণী থেকে যে ঘটনা জানা যায় তাতে অবশ্য পুমাকে নিরীহ আখ্যা দেওয়া অসম্ভব। ঘটনাটি নিম্নে বর্ণিত হল :
উত্তর আমেরিকার এক অরণ্য-আবৃত পর্বত-সঙ্কুল অঞ্চলে জনৈক শিকারি হরিণ শিকার করতে যায়। শিকারির নাম হল অ্যান্ড্র এস ফুলার। ছোটোখাটো হরিণের দিকে তার নজর ছিল না, তার প্রার্থিত জীব ছিল এ নামক মহাকায় হরিণ।
