নাঃ, সকাল ঠিক নয়, বরং শেষ রাত্রি বলা চলে।
ডেল যখন তার শিঙা নিয়ে হ্রদের ধারে এসে দাঁড়াল তখনও আকাশে সূর্যদেব আত্মপ্রকাশ করেননি। তবে অন্ধকার প্রায় দূর হয়ে এসেছে, ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।
ডেল তার শিঙায় মুখ দিলে, শেষ রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ঘন ঘন বেজে উঠল নকল জাগুয়ারের নকল গর্জন।
গভীর গর্জন-ধ্বনির সঙ্গে ভাঙা ভাঙা কাসির শব্দে জাগুয়ার সাড়া দিল। আওয়াজ এল ডেল-এর উলটো দিক থেকে
অর্থাৎ হ্রদের যেদিকে ক্লে আছে জাগুয়ারটাও সেদিকের তীরেই আশ্রয় নিয়েছে। কয়েকটা হাউন্ডকে ছেড়ে দিয়ে ক্লে সাগ্রহে প্রতীক্ষা করতে লাগল।
ক্লে-র সারমেয়-বাহিনীতে যে কুকুরটা নেতৃত্ব করছিল সে হঠাৎ চিৎকার করে জানিয়ে দিল জাগুয়ারের চলাচলের রাস্তা তার অজানা নেই।
ক্লে আর দেরি করলে না, সব কুকুরগুলিকেই ছেড়ে দিল। ঝোঁপঝাড় ভেঙে কুকুরের দল তিরবেগে ছুটল। তাদের পিছু পিছু ছুটল ক্লে এবং তার সঙ্গী দু-জন স্থানীয় শিকারি।
ছুট! ছুট! ছুট!
হ্রদের পাশ দিয়ে চলে গেছে কতগুলো ছোটো-ছোটো পাহাড়ি নদী। সেই নদীগুলোর বাঁকের উপর দিয়ে শিকার তাড়িয়ে ছুটল কুকুরের দল।
জঙ্গল ভেঙে, কাদা মাড়িয়ে, খাঁড়ির অগভীর জলে ঢেউ তুলে শিকারিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে কুকুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে।
দারুণ উত্তেজনায় সাপ আর কুমিরের কথা তারা খেয়ালই করলে না। সারমেয় কণ্ঠের তীব্র উল্লাসধ্বনি শুনে অভিজ্ঞ শিকারিরা বুঝতে পারল জাগুয়ার আর অদৃশ্য নেই, কুকুরগুলি তাকে দেখতে পেয়েছে…
ক্লে জাগুয়ারকে দেখতে পেল, তবু গুলি চালাবার সুযোগ হল না। কুকুরগুলি এখন তাকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু জাগুয়ার কিছুতেই এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না সে ছুটছে আর লড়াই করছে, লড়াই করছে আর ছুটছে।
কুকুরগুলি যখনই খুব কাছে এসে পড়ে তখনই জাগুয়ার থমকে দাঁড়ায়; তার পেশিবহুল দেহ বিদ্যুদ্বেগে ঘুরতে থাকে একবার সামনে একবার পিছনে, একবার বামে একবার দক্ষিণে। দন্ত ও নখরের সেই প্রখর ঝটিকার সম্মুখীন হওয়া কুকুরের পক্ষে অসম্ভব– তারা ক্ষণিকের জন্য পিছু হটে পড়ে। মুহূর্তের সুযোগে জাগুয়ার আবার ছুট দেয়। নাছোড়বান্দা কুকুরের দল আবার তাকে তাড়া করে, আবার জাগুয়ার রুখে দাঁড়ায় এবং এই একই ঘটনার হয় পুনরাবৃত্তি।
এই ঝটাপটির মধ্যে ক্লে গুলি চালাতে সাহস করলে না, কারণ কুকুরের গায়ে গুলি লাগতে পারে। রাইফেলটা তুলে ধরে সে পিছনের শিকারি দুজনকে ইঙ্গিত করলে, তারপর ধাবমান জাগুয়ার ও কুকুরগুলির পিছনে ছুটল।
হ্রদের জল যেখানে পাশের বিরাট জলাভূমিটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ঠিক সেই জায়গায় জলের ধারে মাটির উপর মাথা তুলেছে একঝাড় ম্যানগ্রোভ গাছ।
ছুটতে ছুটতে জাগুয়ার ওই ম্যানগ্রোভ ঝোপের ভিতরে ঢুকল। কুকুরগুলি তার পিছন পিছন ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
উদ্ভিদের বেড়াজাল ভেঙে ক্লে যখন জলের ধারে উপস্থিত হল জাগুয়ার তখন আর সেখানে নেই, শুধু কিনারায় দাঁড়িয়ে পাঁচটা হাউন্ড গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে।
কী হল! জাগুয়ার কি আবার ফাঁকি দিল?
ক্লে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চারদিক পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। না, জাগুয়ার এখনও পালাতে পারেনি। জলাশয়ের অপর দিকে তীরের খুব কাছে জন্তুটা সাঁতার কাটছে, অর্থাৎ একটা সুবিধামত জায়গা দেখে সে তীরে উঠতে চায়। ক্লে শুধু তার ভাসমান মুণ্ডটা দেখতে পেল অত দূর থেকে জলের উপর শরীরের অন্য কোনো অংশ তার চোখে পড়ল না।
একটা ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড়ের উপর রাইফেল রেখে সে নিশানা স্থির করলে, তারপর ঘোড়া টিপে দিল।
ভাসমান জাগুয়ারের পিছনে প্রায় ফুট-তিনেক দূরে রাইফেলের গুলি কামড় বসাল, জলের উপর লাফিয়ে উঠল অজস্র জলকণা–
ক্লের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে।
হ্রদের বিপরীত দিকে অনুসরণের শব্দ শুনে ডেল বুঝতে পেরেছিল ক্লের কুকুর বাহিনী জাগুয়ারকে তাড়া করছে। এপার থেকে সেই শব্দের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পথের মধ্যে দুটো জলাশয় তাকে বাধা দিল। এই জলাশয় দুটো যেমন লম্বা তেমনি গভীর। অনেক খোঁজাখুঁজি এবং ঘোরাঘুরির পরে সে আবিষ্কার করলে এক জায়গায় জলের গভীরতা খুব কম, ইচ্ছে করলে হেঁটে পার হওয়া যায়।
জল ভেঙে ডেল যখন শক্ত মাটিতে পা রাখলে তখন অনুসরণের শব্দ থেমে গেছে।
হঠাৎ হ্রদের বুকে প্রতিধ্বনি তুলে গর্জে উঠল একটা রাইফেল। আওয়াজটা শুনে ডেল ভাবলে জাগুয়ার এবার নিশ্চয় মারা পড়েছে।
কিন্তু একটু পরে সে যখন কুকুরের বিভ্রান্ত চিৎকার শুনতে পেল তখনই বুঝল, মানুষের বন্দুক এবং কুকুরের দাঁতকে ফাঁকি দিয়ে জাগুয়ার আবার পালিয়েছে।
তবে, পালাবে কোথায়!
ব্যাঞ্জোর হত্যাকারীর জন্য হ্রদের দুই তীরে মরণফাঁদ সাজিয়ে রেখেছে ডেল।
হ্রদের জলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই ডেল জাগুয়ারকে দেখতে পেল।
সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে প্রায় চারশো গজ দূরে জন্তুটা সাঁতার কাটছে।
ওপার থেকে তাড়া খেয়ে জাগুয়ার এপারে আশ্রয় নিতে চায়।
বুনো লতা-ঝোপের আলিঙ্গন ভেদ করে ডেল পাগলের মতো ছুটল।
জাগুয়ার তার শত্রুদের চেয়ে অনেক বেশি চালাক, অনেক বেশি চটপটে।
ডেল যথাস্থানে এসে তাকে গ্রেপ্তার করার আগেই সে জল থেকে ডাঙায় উঠে সরে পড়ল।
