খুব কাছে এসে পড়েছে জাগুয়ার। তার মুণ্ড ও ভাসমান পৃষ্ঠদেশের উপর কালো কালো ছাপগুলি এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
জাগুয়ার গর্জন করে উঠল– অন্ধকার মুখ-গহ্বরের আড়াল থেকে উঁকি দিল ছুরিকা-শুভ্র করাল দন্তের সারি।
ঠিক সেই চমর মুহূর্তে শিকারিরা তাদের ভুল বুঝতে পারলে।
তাদের সঙ্গে এখন কোনো অস্ত্র নেই।
দুটো রাইফেলই তারা তাবুতে ফেলে এসেছে, এমনকি যে পিস্তলটা সব সময় ডেল-এর কাছে থাকে সেটাকেও সে সঙ্গে আনতে ভুলে গেছে।
মারাত্মক ভুল!
এমন ভুল তাদের কখনো হয় না। কিন্তু আজ তারা শিকারের জন্য প্রস্তুত ছিল না শুধু নৌকাটাকে জোগাড় করার জন্যেই স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে তারা দরবার করতে এসেছিল।
এখন আর কোনো উপায় নেই।
ভরসার মধ্যে আছে ক্লে-র হাতে নৌকার একখানা বৈঠা বা দাঁড়। সেই দাঁড়টাকেই মুগুরের মতো বাগিয়ে ধরে ক্লে প্রস্তুত হল।
নিজের অস্ত্রের উপর ক্লের বিশেষ ভরসা ছিল না। ওই নড়বড়ে কাষ্ঠদণ্ডের আঘাতে জাগুয়ারের মতো বলিষ্ঠ পশুর কী ক্ষতি হবে?
ক্লে-র মনে পড়ল ব্যাঞ্জোর কথা।
জলের উপর ভাসমান অবস্থায় ছটফট করছে একটা আহত কুকুর, তার কাঁধ থেকে পেট পর্যন্ত নেমে এসেছে একটা রক্তাক্ত ক্ষতরেখা।–ব্যাঞ্জো! ক্লে শিউরে উঠল।
জাগুয়ার যদি ক্যানোর উপরে হানা দেয় তবে ভাঙা-চোরা ক্যানো নির্ঘাত উলটে যাবে। জলের মধ্যে ওই বিপুলবপু মার্জারের কবলে পড়লে তাদের দশা হবে ব্যাঞ্জোর মতোই। যে জানোয়ার একটা শক্তিশালী হাউন্ডকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, মানুষ তো তার কাছে নস্যি–
ক্লে শিউরে উঠল।
জাগুয়ার কিন্তু এখনও তাদের আক্রমণ করছে না। শিকারিদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে কেবল ক্যানোর চারপাশে সাঁতার কেটে চক্রাকারে ঘুরছে আর ঘুরছে চাঁদের আলোয় তার সবুজ চোখ দুটো জ্বলে জ্বলে উঠছে দু-টুকরো মরকত-মণির মতো।
দারুণ আতঙ্কে হঠাৎ ক্লে-র কণ্ঠভেদ করে বেরিয়ে এল তীব্র আর্তধ্বনি। তৎক্ষণাৎ ক্লে-র সঙ্গে গলা মিলেয়ে চিৎকার করে উঠল ডেল।
জ্বলন্ত চক্ষু মেলে জাগুয়ার একবার দু-ভাইকে পর্যবেক্ষণ করলে।
সে যেন শত্রুদের ভালো করে চিনে নিতে চাইছে।
শুধু কয়েকটি মুহূর্তের জন্য জন্তুটা জলের উপর স্থির হয়ে ভেসে রইল। তারপর খুব নির্লিপ্তভাবে সাঁতার কেটে একবার ক্যানোটাকে প্রদক্ষিণ করে আবার তেমনি অলস মন্থর গতিতে সে হ্রদের দূরবর্তী তীর লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল।
একটু পরেই হ্রদের অপর পারে গাছপালার ছায়ামাখা ঘন অন্ধকারের মধ্যে সেই বিপুলবপু মার্জারের দেহ অদৃশ্য হয়ে গেল।
ক্লে আর একটুও দেরি করল না, প্রাণপণে বৈঠা টেনে সে ক্যানোটাকে তাবুর দিকে চার্লিয়ে দিল…
সেদিন রাত্রে তাঁবুর মধ্যে নৈশভোজের আসরে তর্কের ঝড় উঠল। জাগুয়ারের অদ্ভুত আচরণ কারোরই ভালো লাগেনি। যে জানোয়ার কুম্ভীর-সঙ্কুল জলার বুকে নির্ভয়ে সাঁতার কাটতে পারে এবং মানুষ দেখে যে না পালিয়ে কাছে এগিয়ে আসতে চায়, তাকে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ- এই হচ্ছে ক্লে-র অভিমত।
স্থানীয় শিকারিরা তাকে সমর্থন করলে।
শিকারিদের ভোট পেয়ে ক্লে উৎসাহিত হয়ে উঠল।
সে জানিয়ে দিল এই গুণ্ডা জাগুয়ারটার পিছনে তাড়া করার ইচ্ছে তার নেই।
ক্লে-র যুক্তি হচ্ছে, এই বেপরোয়া জন্তুটাকে যখন হাউন্ডগুলো ঘেরাও করবে তখন সে নিশ্চয়ই রুখে দাঁড়াবে সেক্ষেত্রে কয়েকটি মূল্যবান কুকুরের মৃত্যু অবধারিত। এত ঝামেলার দরকার কী? সিনেগা গ্র্যান্ডি অঞ্চলে জাগুয়ারের অভাব নেই- ওই শয়তান জানোয়ারটাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য জাগুয়ারের পিছু নিলে অনেক সহজেই তারা সাফল্য অর্জন করতে পারবে।
ক্লে-র যুক্তি অকাট্য।
স্থানীয় শিকারিরা এবারও ক্লে-র মতে মত দিল।
কিন্তু ডেল নাছোড়বান্দা, কারো কথায় সে কর্ণপাত করতে রাজি নয়; ওই সাঁতার কাটা হুলোবিড়ালটাকে আমি ছাড়ব না, ওকে আমি চাই! তার জন্য যদি সারা শীতকালটা এখানে কাটাতে হয় তাতেও আমার আপত্তি নেই।
ডেল একটু থামল, তারপর রুদ্ধস্বরে বললে, আমি ভুলিনি ব্যাঞ্জো কিভাবে মরেছে!
ক্লে আর তর্ক করলে না। সে বুঝলে ডেলকে নিরস্ত করা অসম্ভব।
পরের দিন সকালে ডেল সেই নড়বড়ে ক্যানোতে চারটে কুকুর নিয়ে হ্রদের অপর পারের উদ্দেশে যাত্রা করলে। এখানে ব্যাট বাধল। হ্রদের জলে যে হাঁসগুলো মনের আনন্দে জলক্রীড়া করছিল তাদের দেখে কুকুরগুলো নৌকার উপর চঞ্চল হয়ে উঠল। এই জন্তুগুলো খুব বড়ো জাতের হাউন্ড; তাদের গুরুভার দেহের নড়বড়ে ক্যানো ডোবে আর কি। প্রতি মুহূর্তে ডেল-এর ভয় করতে লাগল, এই বুঝি সবসুদ্ধ নৌকাটা জলের মধ্যে তলিয়ে যায়।
কোনো রকমে কুকুর সামলে সে ঘর্মাক্ত অবস্থায় অপর পারে পৌঁছল। দুপুরবেলার মধ্যেই ডেল আরও চারটে কুকুরকে হ্রদের অন্য ধারে পাচার করলে।
শোন ক্লে, ডেল বললে, একদল কুকুর নিয়ে আমি ওদের একদিকে থাকব, অন্যধারে আটটা কুকুর নিয়ে তুমি টহল দেবে। জাগুয়ার যে পারেই থাকুক, আমাদের মধ্যে একজন তাকে নির্ঘাত ধরে ফেলবে। যদি শয়তানটা জলে নামে তাহলেও তার নিস্তার নেই। এতগুলো শক্তিশালী হাউন্ডকে ফাঁকি দিয়ে জাগুয়ার পালাতে পারবে না।
হ্রদের দু-ধারে তাবু খাঁটিয়ে শিকারিরা সেদিন অপেক্ষা করলে।
অভিযান শুরু হল পরের দিন সকালে।
