প্রায় মিনিট পাঁচেক বাদে কুকুর নিয়ে ডেল যেখানে এসে দাঁড়াল একটু আগেই সেখান থেকে জাগুয়ার পলায়ন করেছে।
কিন্তু মানুষকে ফাঁকি দিলেও কুকুরের ঘ্রাণশক্তিকে ফাঁকি দেওয়া যায় না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কুকুরগুলি শত্রুর গায়ের গন্ধ পেয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ শুরু হল অনুসরণ-পর্ব।
ডেল-এর কুকুরগুলি এখন পর্যন্ত খুব বেশি ছুটোছুটি করেনি, কাজেই তাদের উৎসাহে ভাটা পড়ার কোনো কারণ ছিল না। পূর্ণ উদ্যমে তারা জাগুয়ারের পিছনে ছুটল।
জাগুয়ার আর পালাতে চেষ্টা করলে না। বোধহয় সে বুঝতে পেরেছে আক্রমণই হচ্ছে আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়। একটা কোপেক গাছের শিকড়ে পিঠ দিয়ে সে কোণঠাসা বিড়ালের মতো রুখে দাঁড়াল।
কুকুরের দল সামনে আসতেই সে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রক্তের নেশায় হাউন্ডগুলো খেপে রয়েছে, তারও পিছু হটল না।
অগ্রবর্তী দুটো কুকুর কিনো আর মিউজিক একেবারে জাগুয়ারের ঘাড়ের উপর এসে পড়ল।
মাত্র একটি মুহূর্ত প্রচণ্ড দংশনে মট করে ভেঙে গেল কিনোর মাথার খুলি, সনখ থাবার একটি মাত্র আঘাতে মিউজিক-এর বক্ষপঞ্জর বিদীর্ণ করে জেগে উঠল একটা রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন।
দুটো কুকুরই তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করলে।
জাগুয়ার এবার অন্য কুকুরগুলির সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হল…
ঘন উদ্ভিদের ফাঁক দিয়ে ডেল তার প্রিয় কুকুরদের দুর্দশা দেখতে পেল। কিন্তু সেই দুর্ভেদ্য আগাছার জঙ্গলের মধ্যে রাইফেল তুলে নিশানা করাই অসম্ভব– গুলি চালানো তো দুরের কথা।
ঝোপের শেষ বাধাটা উত্তীর্ণ করে ডেল যখন রাইফেল তুলে ধরলে তখন কুকুরগুলো আবার জাগুয়ারকে আক্রমণ করেছে।
হাতের অস্ত্র নামিয়ে ডেল সাগ্রহে দেখতে লাগল এক বন্য নাটকের হিংস্র অভিনয়।
ডেল অ্যারিজোনার অধিবাসী, আমাদের মহাভারতের সঙ্গে তার পরিচয় নেই। সে যদি মহাভারত পড়ত তাহলে নিশ্চয়ই তার সপ্তরথী-বেষ্টিত অভিমন্যর কথা মনে হত।
…জাগুয়ারকে মাঝখানে রেখে সারমেয় বাহিনী অর্ধবৃত্তাকারে এগিয়ে এল কাছে, কাছে আরও কাছে…
হিংস্র উল্লাসে কুকুরগুলো ক্রমাগত চিৎকার করছে।
জন্তুগুলোর চেহারা তখন সত্যিই ভয়ানক—
তাদের জ্বলন্ত চোখ থেকে মুছে গেছে গৃহপালিত পশুর নিরীহ অভিব্যক্তি কপিশ চক্ষুর অগ্নিময় দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে বন্য নেকড়ের ক্ষুধিত হিংসা, হত্যার উদগ্র আগ্রহে উন্মুক্ত মুখবিবরের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে নিষ্ঠুর দাঁতের সারি।
অপর পক্ষে জাগুয়ারের দেহে উত্তেজনার বিশেষ কোনো চিহ্ন নেই।
তার বজ্রকণ্ঠ সম্পূর্ণ নীরব শুধু মাটির উপর দুলে দুলে উঠছে তার সুদীর্ঘ লাঙ্গুল এবং থাবার নখগুলি বাইরে বেরিয়ে এসেছে কোষমুক্ত কিরিচের মতো।
ডেল রাইফেল তুলে নামিয়ে নিল, কারণ ঠিক তখনই হাউন্ডগুলো একসঙ্গে জাগুয়ারকে আক্রমণ করলে।
অস্ত্র নামিয়ে ডেল দেখতে লাগল যুদ্ধের দৃশ্য।
একটা হাউন্ড পিছনের পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে জাগুয়ারের ঘাড়ে দাঁত বসাতে গেল।
জাগুয়ার নীরব হলেও নিশ্চল নয়। একটা নখরযুক্ত প্রকাণ্ড থাবা বিদ্যুৎবেগে কুকুরটার কণ্ঠ আলিঙ্গন করলে।
ডেল সবিস্ময়ে দেখল, আহত হাউন্ড মাটির উপর লুটিয়ে পড়ে আর উঠল না তার বিভক্ত কণ্ঠনালী থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে তপ্ত রক্তধারা।
দারুণ আতঙ্কে কুকুরের দল ছিটকে সরে গেল। সারমেয়-বাহিনীর যোদ্ধারা এতক্ষণে বুঝেছে, এই বুটিদার বিড়াল অতি সাংঘাতিক জীব, তার সামনে গেলে মৃত্যু অবধারিত। কুকুরগুলো দূর থেকে জাগুয়ারকে লক্ষ করে জাতীয় ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলে ওই শরীরী মৃত্যুর সম্মুখীন হতে তারা রাজি নয়!
ডেল বুঝল এই তার সুযোগ, রাইফেল তুলে সে নিশানা করতে লাগল।
হঠাৎ জাগুয়ারের চোখ পড়ল ডেল-এর দিকে।
সঙ্গেসঙ্গে সে বুঝতে পারলে এই হচ্ছে তার আসল শত্রু, এই মানুষটাকে হত্যা করতে পারলেই আজকের যুদ্ধে তার জয় অনিবার্য।
জাগুয়ার খুব নিচু হয়ে বসে পড়ল, তার কান দুটো চ্যাপ্টা হয়ে মিশে গেল মাথার খুলির সঙ্গে- ডেল বুঝল জন্তুটা এবার তাকে লক্ষ্য করে লাফ মারবে।
জাগুয়ার লাফ দিল।
সঙ্গেসঙ্গে অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠল রাইফেল।
হাঁড়ির মতো গোল মুণ্ডটা একবার গুলির আঘাতে শিউরে উঠল, পরক্ষণেই তার প্রাণহীন দেহ অসাড় অবস্থায় লুটিয়ে পড়ল ডেল লীর পায়ের কাছে।
কুকুরগুলো এবার জাগুয়ারের জলে-ভেজা মৃতদেহটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বিক্রমে দংশন করতে লাগল।
.
এই ঘটনার পরে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বৎসর। ইতিমধ্যে লী ভাইদের রাইফেলের গুলিতে ইহলীলা সংবরণ করেছে প্রায় শ-খানেক জাগুয়ার। প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার এই বিপদজনক খেলায় লীদের ক্ষতিও হয়েছে যথেষ্ট। নিহত জন্তুগুলোর মধ্যে কয়েকটা জাগুয়ার ছিল অত্যন্ত হিংস্র ও দুর্দান্ত। রাইফেলের গুলিতে তারা মৃত্যুবরণ করেছে বটে, কিন্তু মরার আগে শিকারিদের উপহার দিয়ে গেছে অনেকগুলি মূল্যবান কুকুরের রক্তাক্ত মৃতদেহ।
শুধু তাই নয় ক্ষিপ্ত জাগুয়ারের আক্রমণে শিকারিদের জীবন বিপন্ন হয়েছে একাধিকবার।
তবে, ডেল লীর অভিমত হচ্ছে সিনেগা গ্র্যান্ডির সাঁতার কাটা জাগুয়ারটাই হচ্ছে সবচেয়ে বলিষ্ঠ, সবচেয়ে ধূর্ত, সবচেয়ে সাহসী।
মরার আগে তার লড়াইটাও হয়েছিল সত্যি দেখবার মতো।
শেরউড বনের পলাতক
০১. কালো ঘোড়ার সওয়ার
