পদচিহ্নের কাছাকাছি এসেই কুকুরগুলো সমস্বরে চিৎকার করে জানিয়ে দিল তারা শিকারের গায়ের গন্ধ পেয়েছে। ডেল তৎক্ষণাৎ কুকুরগুলোর গলার শিকল খুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বিপুল সারমেয় বাহিনী চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবারেও দলের নেতৃত্বের ভার নিল বাদামি চোখ নামধারী কুকুরটি– আগের দিনের অভিযানে যে ছিল দলের নেতা।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সারমেয় কণ্ঠের উল্লাসধ্বনি শিকারিদের জানিয়ে দিল, জাগুয়ার আবার কোণঠাসা হয়েছে।
যে-দিক থেকে কুকুরের চিৎকার ভেসে আসছিল শিকারিরা সেইদিক লক্ষ্য করে দ্রুত পা চার্লিয়ে দিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিকারিদের চোখে পড়ল, একটা ছোটো গাছের ডালের উপর গুঁড়ি মেরে জাগুয়ার বসে আছে। মুখব্যাদান করে নীচে পাহারা দিচ্ছে দন্ত-ভয়াল সারমেয়-বাহিনী, অতএব জাগুয়ারের নীচে নামার উপায় নেই।
ক্লে এবং ডেল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জন্তুটাকে নিরীক্ষণ করলে।
সঙ্গেসঙ্গে তাদের মুখে ফুটল হতাশার অভিব্যক্তি। স্থানীয় শিকারিদের দিকে তাকিয়ে ডেল নিরাশ স্বরে বললে, এটা আমাদের আসামী নয়। তাছাড়া এটা মাদি জানোয়ার।
জাগুয়ারটার দেহ-সৌষ্ঠব কিন্তু চমৎকার।
কমলা-হলুদ জমির উপর কালো কালো বুটিদার চামড়ায় ঢাকা দেহটি যেন শক্তি ও সৌন্দর্যের আধার।
ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে ডেল জন্তুটার ফোটো তুলল। তারপর স্থানীয় শিকারিদের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করলে। একজন শিকারি এগিয়ে এসে গুলি ছুড়ল।
পরক্ষণেই বৃক্ষশাখা থেকে সশব্দে ভূমিপৃষ্ঠে লম্বমান হল জাগুয়ারের প্রাণহীন দেহ।
সেদিন আর উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটল না।
.
দু-দিন পরের কথা।
জলাভূমির শেষ প্রান্তে অবস্থিত পর্বতশ্রেণির নীচে আর একটা জাগুয়ার কুকুর বাহিনীর বেড়াজালে ধরা পড়ে প্রাণ বিসর্জন দিল।
এই জন্তুটা পুরুষ জাতীয়, তবে ব্যাঞ্জোর হত্যাকারী পলাতক জাগুয়ারটার তুলনায় নেহাত বাচ্চা।
পর-পর দুটো জাগুয়ারকে হত্যা করলেও শিকারিরা ব্যাঞ্জোর হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারলে না। ডেল-এর মাথায় খুন চড়ে গেল। গাড়ি চলার রাস্তা ধরে সে এগিয়ে গেল এবং স্থানীয় অধিবাসীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে জোগাড় করে ফেলল একটা ভাঙা-চোরা ক্যানো নৌকা।
জলার বুকে এই ক্যানো বেয়ে চলাফেরা করতে খুব সুবিধা। এইসব ছোটো-ছোটো নৌকাতে লগি থাকে না, শুধু একখানা দাঁড়ের সাহায্যে চালাতে হয়।
ডেল স্থির করেছিল এই ক্যানোতে চড়েই তারা পলাতক আসামীকে গ্রেপ্তার করবে।
ফেরার সময়ে ডেল এবং কে মাটিতে পদার্পণ করলে না– ক্যানোটাকে জলার উপর নামিয়ে তাতে উঠে বসল। নৌকাটার অবস্থা অবশ্য খুব ভালো নয়, কিন্তু নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো- অতএব সেই ভাঙাচোরা ক্যানোটায় উঠে একখানা মাত্র বৈঠা সম্বল করে দু-ভাই জলার বুকে ভেসে পড়ল।
.
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ।
কিন্তু কালো রাত্রির অন্ধকার আজ মানুষের দৃষ্টিকে অন্ধকার করে দিতে পারবে না। কারণ, আকাশের পটভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেছেন শুভ্রকান্তি চন্দ্রদেব, হ্রদের জলে ছড়িয়ে পড়ছে রুপালি জ্যোৎস্নার আলোকধারা।
এমন চাঁদের আলোতে নৌকার উপর বসে জলবিহার করলে যে-কোনো মানুষেরই গান গাইতে ইচ্ছে করে।
ক্লে গুনগুন করে গান ধরলে।
কিন্তু ডেল একেবারেই কাষ্ঠরসিক– এক ধমকে কে-র গান থামিয়ে দিয়ে সে কাঁধে আটকানো চামড়ার ফিতেটা খুলে ফেলল। পরমুহূর্তেই তার হাতের মুঠোতে দেখা দিল সেই বিখ্যাত গোরুর শিং।
ক্লে আশ্চর্য হয়ে বললে, তুমি কি আবার শিঙা বাজিয়ে জাগুয়ারকে ডাকবে?
ডেল মাথা নেড়ে বললে, আলবৎ! জাগুয়ার যদি কাছাকাছি থাকে তাহলে নিশ্চয় সাড়া দেবে। আমাদের ভাগ্য যদি প্রসন্ন থাকে তাহলে হয়ত জন্তুটা জলার ধারে হাজিরা দিতেও পারে। আজ চমৎকার জ্যোৎস্না আছে- একবার রাইফেলের নাগালের মধ্যে এলে হতভাগা আর পালাতে পারবে না। শয়তানটা আমাদের অনেক ভুগিয়েছে!
ডেল শিঙায় মুখ দিল।
জলার বুকে জাগল জাগুয়ারের গর্জন। সেই নকল গর্জনের প্রতিধ্বনি শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই একটা অকৃত্রিম কণ্ঠের গম্ভীর হুঙ্কার শোনা গেল।
হ্রদের বিপরীত দিক থেকে আসল জাগুয়ার তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।
বুঝলে ক্লে, ডেল ফিসফিস করে বললে, এটাই আমাদের আসামী। আমি ওর গলার আওয়াজ চিনতে পেরেছি।
ডেল ভুল করেনি, ওই ভাঙা-ভাঙা কর্কশ গর্জিত কণ্ঠ কে-র কাছেও অপরিচিত নয়।
বিগত কয়েকদিনের মধ্যে বহুবার তারা জন্তুটার কণ্ঠস্বর শুনেছে। ক্লে ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে ভাইকে ইঙ্গিত করলে, চুপ করো।
শিঙায় মুখ লাগিয়ে ডেল আবার গর্জন করলে।
এবার খুব কাছ থেকে উত্তর এল।
জাগুয়ারের গর্জন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। কিন্তু তার গলায় আওয়াজ খুব চাপা এবং অস্পষ্ট।
ক্লে সবিস্ময়ে বললে, জস্তুটা বোধহয় জলে নেমে সাঁতার কেটে এগিয়ে আসছে।
ডেল বললে, আমারও তাই মনে হয়। জাগুয়ারের গলার আওয়াজ জলের মধ্যে অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
জলার উপরিভাগে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দুই শিকারি নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ নৌকার খুব কাছেই একটা গোলাকার বস্তু শিকারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে।
হ্যাঁ, জাগুয়ার।
সচল গোলাকার বস্তুটি আর কিছু নয়- জাগুয়ারের ভাসমান মুণ্ড। জন্তুটা জলার বুকে সাঁতার কেটে এগিয়ে আসছে শিকারিদের দিকে। চাঁদের আলোয় তার মাথাটা দেখাচ্ছে মস্ত হাঁড়ির মতো। জাগুয়ার আরও কাছে এগিয়ে এল কাছে, কাছে, আরও কাছে…
