ক্লে বললে, ইচ্ছেটা এখন মুলতুবি রাখ। কাল সকালে যা হয় করা যাবে।
ডেল হাসল, আরে তা তো বটেই, সত্যি সত্যি কি এই অন্ধকারে জলার মধ্যে পা বাড়াব নাকি? আমি শিকার করতে এসেছি, আত্মহত্যা করতে আসিনি। চল এখন তাঁবুর মধ্যে– চটপট খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়া যাক। কাল সকালে জাগুয়ারের পিছনে ছুটতে হবে।
…অন্ধকারের কালো যবনিকা ভেদ করে উঁকি দিল ঊষার আলোকধারা, গাছে গাছে কলরব করে পাখির দল বন্দনা জানাল সূর্যকে।
দিনের আলোয় জলাভূমিকে খুব বেশি ভয়ানক মনে হল না। জলাশয়গুলিতে কোনো অশুভ বিভীষিকার ইঙ্গিত নেই। বল্লমের ফলার মতো পাতা ছড়িয়ে অদ্ভুত জাতের যে-সব গাছ দাঁড়িয়ে আছে, তাদের উপর থেকে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বিচিত্র বর্ণের বিভিন্ন পক্ষী। সমস্ত পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও মধুর।
সুর্যের তেজ খুব বেশি প্রখর হওয়ার আগেই শিকারিদের কুকুরগুলো একটা জাগুয়ারকে কোণঠাসা করে ঘিরে ধরলে।
শিকারিরা তার ফোটো তুলল, তারপর দু-দুটো রাইফেল গর্জে উঠতেই জাগুয়ারের প্রাণহীন দেহ মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।
সমস্ত ব্যাপারটা মনে হল ছেলেখেলার মতোই সহজ।
ক্লে বড়ো ভাইকে বিদ্রূপ করে হেসে উঠল, এই নাকি তোমার সাংঘাতিক জানোয়ারের নমুনা? এ তো দেখছি হরিণ-শিকারের মতোই সহজ!
ডেল গম্ভীর স্বরে বললে, দাঁড়াও, এই তো সবে শুরু, এখনও দুপুর হয়নি। রাত্রি পর্যন্ত যদি তোমার মুখের হাসি বজায় থাকে তাহলে বুঝব তুমি বাহাদুর শিকারি। প্রত্যেকবারই যে আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন হবে এমন আশা করো না। তাছাড়া এই জন্তুটা স্ত্রী-জাতীয় পুরুষ জাগুয়ার এত সহজে পরাজয় স্বীকার করে না।
ক্লে কোনো মন্তব্য করল না বটে, কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হল ভাইয়ের কথা সে বিশ্বাস করতে রাজি নয়।
সারা দুপুরের মধ্যে শিকারিরা আর একটিও জাগুয়ারের সন্ধান পেল না। কুকুরগুলি এদিক সেদিক ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
ডেল লী তখন এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলে। ভেনেজুয়েলায় থাকতে সে জাগুয়ারের শব্দ অনুকরণ করতে শিখেছিল। এবার সেই কায়দাটা সে কাজে লাগাতে চাইল।
একটা ফাঁপা গোরুর শিং-এ মুখ লাগিয়ে ডেল মাটির উপর ঝুঁকে পড়ল। পরমুহূর্তেই তার মুখ থেকে ঠিক জাগুয়ারের গর্জনের মতো আওয়াজ শোনা গেল।
তাঁবুর পিছনে একটা হ্রদের পাশ থেকে তৎক্ষণাৎ দুটো জাগুয়ার গর্জে উঠল। দুর পাহাড়ের নীচে আর-একটা জলাশয়ের বুক থেকে ভেসে এল তৃতীয় কণ্ঠের হুঙ্কারধ্বনি।
নকল জাগুয়ারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গর্জে উঠেছে তিন-তিনটে আসল জাগুয়ার।
শিকারিরা বুঝতে পারল শব্দ অনুসরণ করে হানা দিলে কাল সকালেই জাগুয়ারের পায়ের দাগ চোখে পড়বে। দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে, এমন সময়ে নেহাৎ মূর্খ এবং উন্মাদ ছাড়া কেউ জাগুয়ারের পিছনে তাড়া করে না। অতএব সকালের জন্য অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের
সকাল হল।
আজকের অভিযানের জন্য শিকারিরা দলের ভিতর থেকে বেছে নিল কয়েকটা হাউন্ড-জাতীয় কুকুর। এই জন্তুগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং শিকারের রক্তাক্ত খেলায় তারা প্রত্যেকেই ওস্তাদ খেলোয়াড়।
দলের অন্যান্য কুকুরগুলিকে তাঁবুর মধ্যে বেঁধে রেখে শুধু বাছাইকরা জন্তুগুলিকে নিয়ে দুই ভাই একটা ছোটো পাহাড়ি নদীর বাঁক ধরে যাত্রা শুরু করলে। তাঁবুর মধ্যে বাঁধা কুকুরগুলো তারস্বরে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতে লাগল, কিন্তু শিকারিরা তাদের অভিযোগে কর্ণপাত করলে না।
যে কুকুরগুলোকে শিকারিরা সঙ্গে নিয়েছিল তারা হঠাৎ খাঁড়ির জলে নামল। এই জায়গাগুলো বিষাক্ত মোকাসিন সাপের আড্ডা– সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে ক্লে এবং ডেল জলে নেমে পড়ল।
হাঁটু পর্যন্ত জল, কিন্তু খাড়িটা গভীর না হলেও বেশ চওড়া।
খাঁড়ি পার হয়ে কুকুরগুলো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল। শিকারিরা বুঝল ওরা জাগুয়ারের গন্ধ পেয়েছে। দলের মধ্যে যে কুকুরটার নাম বাদামি চোখ, তাকে সঙ্গে নিয়ে ডেল এগিয়ে গেল।
কুকুরগুলো এখন ভীষণ উত্তেজিত, বারবার টানে মেরে শিকারিদের হাত থেকে শিকল ছিনিয়ে নিতে চাইছে।
বাদামি চোখ হঠাৎ খাঁড়িটাকে পিছনে ফেলে বাঁ দিকে ঘুরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ডেলও সেইদিকে ঘুরল; সে জানত তার কুকুর কখনো ভুল করবে না। ডেল-এর অনুমান নির্ভুল একটু পরেই তারা একটা জাগুয়ারের পায়ের চিহ্ন দেখতে পেল।
ডেল লী ঝানু শিকারি; পদচিহ্ন পরীক্ষা করে দেখে সে বুঝতে পারল এটা একটা পুরুষ জাগুয়ারের পায়ের ছাপ।
ক্লের দিকে তাকিয়ে সে বললে, অন্য কুকুরগুলিকে এখানে নিয়ে এস।
বাদামি চোখ আগেই জাগুয়ারের গায়ের গন্ধ পেয়েছিল।
অন্য কুকুরগুলো এখানে এসেই চঞ্চল হয়ে উঠল। চিৎকার করে, লাফিয়ে তারা গলার শিকল ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করলে।
শিকারিরা এবার কুকুরগুলোর গলা থেকে শিকল খুলে নিল।
সঙ্গেসঙ্গে জন্তুগুলো খাঁড়ির বাঁক ধরে ছুটতে শুরু করলে।
দুই ভাই বুঝল জাগুয়ার কিছুক্ষণ আগে এখানেই ছিল, কারণ কুকুরগুলো মাথা নিচু করে মাটিতে শত্রুর গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করেনি, শূন্যে মাথা তুলে তারা দ্রুত ছুটে চলেছে। অর্থাৎ এখনো বাতাসে জাগুয়ারের গায়ের গন্ধ লেগে আছে।
ডেল ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল, আর বেশিক্ষণ নয়। দশ মিনিটের মধ্যেই ওই ছাপ-মারা বিড়ালটাকে আমরা ধরে ফেলব।
