অর্থাৎ মেক্সিকোর El Tigre, ডাঙার উপর বাঘের মতোই দ্রুত ছুটতে পারে, জলে সে কুমিরের মতো সাঁতার কাটতে জানে আবার বিড়ালের মতো চটপট গাছে উঠতেও তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা নেই।
কর্দমাক্ত জলাভূমির মধ্যে এমন জানোয়ারকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তাই শিকারিরা জাগুয়ার মিশরের জন্য শিক্ষিত কুকুরের সাহায্য গ্রহণ করে।
এই কুকুরগুলো গন্ধ শুঁকে অতি সহজেই জাগুয়ারকে আবিষ্কার করতে পারে। সেই সময় জাগুয়ার শক্ত জমির উপর থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং জল থেকে ডাঙায় উঠে আবার ছুটতে থাকে। জলের মধ্যে জাগুয়ারের গায়ের গন্ধ হারিয়ে যায়, তাই অনেক সময় অনুসরণকারী কুকুরের দল বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তবে, সব সময় তার এই কায়দা সফল হয় না। অভিজ্ঞ কুকুর জলে সাঁতরে অপর পারে গিয়ে শিকারের গন্ধ খুঁজে বার করে এবং আবার নতুন করে শুরু হয় অনুসরণ-পর্ব।
পালাবার পথ না থাকলে অথবা খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে কখনও কখনও সে গাছের উপর আশ্রয় নেয়। কিন্তু একবার বৃক্ষশাখা অবলম্বন করলে তার আর বাঁচার আশা থাকে না, কারণ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় কুকুরের দল এবং তাদের তীব্র চিৎকার শুনে যথাস্থানে এসে উপস্থিত হয় বন্দুকধারী শিকারি। তারপর আর কী? নীচের থেকে গুলি চার্লিয়ে জাগুয়ারাকে হত্যা করা খুবই সহজ।
কিন্তু সব সময়ে এত সহজে সব কিছু হয় না। তাড়া-খাওয়া জাগুয়ার হঠাৎ রুখে দাঁড়িয়ে শত্রুর উপর দাঁত ও নখের ধার পরীক্ষা করতে থাকে। শিকারি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার আগেই কয়েকটি কুকুরকে ধরাশায়ী করে সে গা-ঢাকা দেয়।
শিকারি এসে দেখতে পায় শূন্য রঙ্গমঞ্চে রক্তমাখা দেহ নিয়ে শুয়ে আছে হত ও আহত অভিনেতার দল- নাটকের নায়ক অদৃশ্য।
শুধু কুকুর নয় মাঝে মাঝে কুকুরের মালিকের প্রাণ নিয়েও টানাটানি হয়। ক্ষিপ্ত জাগুয়ার অনেক সময় সারমেয় বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে শিকারির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে : তৎক্ষণাৎ নির্ভুল লক্ষ্যে একেবারে মর্মস্থানে আঘাত করতে না পারলে শিকারির মৃত্যু অনিবার্য কারণ আহত হলেও জাগুয়ার মরণকামড় বসায়, দন্ত ও নখের ভয়াল আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে শত্রুকে; শিকার ও শিকারির প্রাণহীন দেহ একই সঙ্গে মাটির উপর লুটিয়ে পড়ে।
এইসব রক্ত জল করা তথ্য ডেল লী ভালোভাবেই জানত।
সে জাত শিকারি। মৃগয়াকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছে তার পূর্বপুরুষ- ডেল তাদের যোগ্য উত্তরাধিকারী।
ডেল জানত পশ্চিম মেক্সিকোর জলাভূমি সিনেগা গ্রান্ডি জাগুয়ারের প্রিয় বাসস্থান। মার্জারবংশের এই জন্তুটি যে গৃহপালিত বিড়ালের মতো শান্ত ও সুবোধ নয় সে কথাও তার অজানা ছিল না। তবে শিকারের নেশা বড়ো নেশা– সুদূর আরিজোনা থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে ডেল ছুটে এল এই কুখ্যাত জলাভূমির নরককুণ্ডে, তার সঙ্গে এল ছোটো ভাই ক্লে লী এবং একদল হাউন্ড জাতীয় কুকুর।
সিনেগা গ্র্যান্ডি অঞ্চলে তাদের গাড়ি যখন এসে থামল তখন সন্ধ্যার ধূসর যবনিকা দিনের আলোকে লুপ্ত করে দিয়েছে। প্রায় অন্ধকার জলাভূমির বুকে মাঝে মাঝে সশব্দ আলোড়ন উঠছে– অভিজ্ঞ মানুষ সেই শব্দ শুনেই বুঝতে পারবে কর্দমাক্ত জলে হানা দিয়ে ফিরছে ভয়াবহ কুমিরের দল।
ক্লে লী সাহসী ছেলে, বন্দুক-রিভলভার ছুঁড়তেও সে ওস্তাদ; কিন্তু বড় ভাইয়ের মতো পাকা শিকারি সে নয়।
ক্লে যখন জানতে পারলে এই জলাভূমিতে অসংখ্য কুমির ও বিষাক্ত সর্প বাস করে তখন সে রীতিমত চমকে উঠল। চমৎকার জায়গা দেখছি– একেবারে যমের দক্ষিণ দুয়ার!
ডেল হেসে বললে, মোটা হান্টিং সুট-এর আবরণ ভেদ করে সাপের দাঁত সহজে তোমার দেহ স্পর্শ করতে পারবে না। আমাদের হাতে থাকবে দু-দুটো রাইফেল, কাজেই ডাঙার উপর কুমিরকে পরোয়া করার দরকার হবে না। আমরা গভীর জলে সাঁতার কাটব না তেমন প্রয়োজন হলে হয়ত হাঁটু জলে নামতে পারি। ওই সময়ে অবশ্য বিপদ ঘটতে পারে, কিন্তু বিপদের ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে শিকার করা চলে না। তবে একটা কথা তুমি আমার কাছে শুনে রাখ–সাপ এবং কুমিরের চেয়ে জাগুয়ার অনেক বেশি বিপদজনক জানোয়ার। কোণঠাসা জাগুয়ার যদি তোমায় আক্রমণ করে তাহলে একটিমাত্র গুলিতেই তাকে ঘায়েল করতে হবে দ্বিতীয়বার গুলি ছোঁড়ার সুযোগ তুমি পাবে না। ঘাড়ে অথবা বুকে গুলি চার্লিয়ে যদি তাকে মাটিতে পেড়ে ফেলতে না পার তাহলে আর তোমার নিস্তার নেই– উন্মত্ত জাগুয়ার তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তোমাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়বে। ভেনেজুয়েলায় শিকার করতে গিয়ে কয়েকজন জাগুয়ার শিকারির দুর্দশা আমি নিজের চোখে দেখেছি। অভিজ্ঞ শিকারিদের কাছে শুনেছি এই অঞ্চলের জাগুয়ারগুলি নাকি আরও হিংস্র, আরও ভয়ংকর।
ডেল-এর কথাটাকে সমর্থন জানিয়ে দুর জলার বুকে এক দানবকণ্ঠে গর্জন উঠল—
অন্ হা! অন্ হা! অন্ হা!
ডেল অস্ফুটস্বরে বললে, জাগুয়ার!
ক্লে কথা বললে না, শুধু চুপ করে শুনতে লাগল।
সেই কর্কশ ধ্বনি-তরঙ্গ স্তব্ধ হওয়ার আগেই জলার অন্য দিক থেকে ভেসে এল আর এক ভৈরব-কণ্ঠের হুঙ্কার সংগীত।
আর একটা জাগুয়ার।
ডেল ভাইয়ের পিঠে সশব্দে চপেটাঘাত করলে, শুনছ ক্লে, শুনছ? এই জলাটায় অনেকগুলো জাগুয়ার ডেরা বেঁধেছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছে এখনই রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
