তারা তিনজনেই তাঁবু খাটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পকেট থেকে পাইপ বার করে ডেল ধূমপানে মন দিল..
এই বুঝি সিনেগা গ্র্যান্ডি?
ডেল চমকে উঠল। শেতাঙ্গ যুবকটি তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ডেল বললে, হ্যাঁ। এই হল সিনেগা গ্র্যান্ডি মেক্সিকোর বিশাল জলাভূমি। তোমার কেমন লাগছে ক্লে?
ক্লে ভ্রূকুঞ্চিত করলে, জঘন্য! চারদিকে খালি জল আর কাদা, কাদা আর জল। এর মধ্যে এই জায়গাটাই একটু শুকনো। কিন্তু কি মশা! উঃ! একেবারে পাগল করে দিল!
কথাটা সত্যি। ঝাঁকে ঝাকে মশা উড়ছে।
তাদের মিলিত আক্রমণে এর মধ্যেই ক্লে-র কপাল ও মুখ ফুলে উঠেছে। ডেল-এর মুখও অক্ষত নয়, কিন্তু সে সম্পূর্ণ নির্বিকার।
শূন্যে খানিকটা ধোঁয়া উড়িয়ে ডেল পাইপটা নামিয়ে নিল। গম্ভীরভাবে বললে, ট্রাকের ভিতর মশার প্রতিষেধক তেল আছে। ওই তেল মুখে আর হাতে লাগিয়ে নিলে মশার কবল থেকে নিষ্কৃতি পাবে। তবে, যে কাজে এসেছি তাতে কিছুটা সহ্য করতেই হবে। আমরা তো এখানে বনভোজন করতে আসিনি, আমাদের–
ঝপ! ঝপাস!
ডেল-এর বাক্যস্রোতে বাধা দিয়ে অকস্মাৎ জলের বুকে জেগে উঠল এক প্রচণ্ড আলোড়ন-ধ্বনি।
ও কী? ও কিসের শব্দ?
ক্লে চমকে উঠল। কিন্তু সন্ধ্যার আলো আর অন্ধকারের মধ্যে সে জলের উপর কিছুই দেখতে পেল না।
সঙ্গীর মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লে প্রশ্ন করলে, ওটা কিসের শব্দ?
ডেল-এর মুখে হাসির রেখা ফুটল, সে কথা বললে না।
ঝপ! ঝপাস!
আবার সেই শব্দ। কিন্তু শব্দটা এবার আসছে জলার অন্য দিক থেকে।
বুঝেছি, ক্লে হেসে উঠল, জায়গাটা দেখছি ভারি চমৎকার!
হ্যাঁ, চমৎকার, একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ডেল বললে, শুধু কুমির নয়ওই ঘন ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে জলের উপর ছড়িয়ে আছে বিষাক্ত মোকাসিন সাপও।
ক্লে বললে, বাঃ! খুব চমৎকার জায়গায় নিয়ে এসেছ তো! একেবারে যমের দক্ষিণ দুয়ার!
…. হ্যাঁ, যমের দক্ষিণ দুয়ার বটে।
মেক্সিকোর ভাষায় সিনেগা গ্র্যান্ডি কথাটার অর্থ হচ্ছে বিশাল জলাভূমি।
এই বিশাল জলাভূমিকে কেউ যদি যমের দক্ষিণ দুয়ার আখ্যা দেয় তবে বিশেষ ভুল হবে না।
চারদিকে খালি জল আর জল- মাঝে মাঝে কর্দমাক্ত ভূমি– তারপর আবার জল। জলের গভীরতা সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও হয়ত এক-মানুষ জল, আবার কোথাও হয়ত হাঁটুও ডোবে না। এই বিশাল জলরাশির ধারে ধারে জল এবং মাটিকে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছে অজস্র বুনো লতা ও ঘাসের ঝোঁপ, আর সেই জলজ ঘাস-জঙ্গল ভেদ করে সুর্যের আলো দেখার জন্যে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ছোটো বড়ো বিভিন্ন গাছের সারি।
গাছের ডালে ডালে কলরব করে ভিড় জমিয়েছে নানা জাতের নানা রং-এর পাখি। এই রং-বেরং-এর পাখির ঝাকের দিকে তাকিয়ে কেউ ভাবতে পারবে না যে নীচে ওত পেতে আছে সাক্ষাৎ মৃত্যু। ঘাস-ঝোপের আড়ালে অনেক সময় আত্মগোপন করে শুয়ে থাকে ভয়াবহ কুম্ভীর। এখানকার জলে মাছের অভাব নেই, কিন্তু কুমিরগুলো শুধু মৎস্যভোজী নয়, তারা মাংসাশীও বটে।
যে ছোটো ছোটো হরিণগুলো ডাঙার উপর ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই হিংস্র সরীসৃপ তাদের ঠ্যাং কামড়ে ধরে জলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অধিকাংশ বন্যজন্তু মানুষকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। কিন্তু এই কুমিরগুলো মৃগমাংসের পরিবর্তে নরমাংস পেলে একটুও আপত্তি করে না।
শুধু কুমির নয় এখানকার জলে-স্থলে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মোকাসিন সর্প। তাদের বিষাক্ত চুম্বন গ্রহণ করলে যে-কোনো মানুষ মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হবে।
এমন চমৎকার স্থানটিকে কেউ যদি যমের দক্ষিণ দুয়ার আখ্যা দেয় তবে তাকে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে, পৃথিবীতে অনেক ভালো ভালো জায়গা থাকতে এমন নরকুণ্ডে বেড়াতে আসার দরকার কী?
-হ্যাঁ, দরকার আছে।
পৃথিবীতে এক শ্রেণির লোক আছে যারা জীবনটাকে বাজি রেখে ভাগ্যের সঙ্গে জুয়া খেলতে একটুও ভয় পায় না।
কাছেই সুদূর আরিজোনা থেকে ডেল লী নামধারী মানুষটি যদি পশ্চিম মেক্সিকোর ভয়াবহ জলাভূমির উপর ছুটে আসে তাতে খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তবে, বিনা প্রয়োজনে কেউ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে চায় না।
ডেল-এর একটা উদ্দেশ্য অছে বইকি। জাগুয়ারের চামড়া সংগ্রহের জন্য সিনেগা গ্রান্ডির ভয়াবহ অঞ্চলে হানা দিয়েছে সে।
এইখানে জাগুয়ার নামক জন্তুটির একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। স্থানীয় অধিবাসীরা বলে El Tigre, কথাটার বাংলা অর্থ– বাঘ।
এই El Tigre বা জাগুয়ার বিড়াল জাতীয় প্রাণী।
তবে, বাঘের চাইতে প্যান্থার বা লেপার্ডের সঙ্গেই তার সাদৃশ্য বেশি। গাঢ় কমলা-হলুদ জমির উপর কালো কালো ছাপ মারা জাগুয়ারের চামড়াটা দেখতে অনেকটা বৈষ্ণবের নামাবলীর মতো।
এই চামড়ার লোভে অনেক সময় দুঃসাহসী শিকারিরা জাগুয়ারের ডেরায় হানা দেয়। তবে El Tigre বা জাগুয়ার মোটেই নিরীহ জন্তু নয়, তাকে হত্যা করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। দেহচর্মের সঙ্গে নামাবলীর যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকলেও স্বভাব-চরিত্রে তার সঙ্গে বৈষ্ণবের কোনো মিলই নেই, বরং প্রাচীনপন্থী শাক্তদের মতোই তার প্রকৃতি অতিশয় উগ্র ও ভয়ঙ্কর।
অধিকাংশ বিড়াল-জাতীয় প্রাণী জলে নামতে চায় না। জাগুয়ার সম্বন্ধে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এই বিপুলবপু মার্জার ঠিক অলিম্পিকের দক্ষ সাঁতারুর মতো সাঁতার কাটতে পারে এবং শিকারিকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যে সে বারংবার জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এমন উদাহরণও নিতান্ত বিরল নয়। এই ধূর্ত জানোয়ার যে শুধু সাঁতারেই দক্ষ তা নয়- গাছে উঠতেও সে সমান পটু। গাছের ডালে ডালে যে-সব বাঁদর ঘুরে বেড়ায় তারাও জাগুয়ারের কবল থেকে রক্ষা পায়না।
