তীরের খুব কাছাকাছি এসে হঠাৎ কাদার মদ্যে আটকে গেল মোটরবোট।
দুই বন্ধু তাড়াতাড়ি বোট ছেড়ে নেমে পড়ল।
প্রায় দশ ফুট দূরেই রয়েছে মৃত্তিকার আশ্রয়, এইটুকু ব্যবধান কোনোরকমে পার হতে পারলে তারা নিরাপদ–হাঁটু পর্যন্ত জল ভেঙে দুই বন্ধু তীরভূমির দিকে অগ্রসর হল।
হঠাৎ হার্মান শুনতে পেল তার পিছনেই জেগে উঠেছে একটা আলোড়ন-ধ্বনি–সঙ্গেসঙ্গে ফোয়ারার মতো জল ছিটকে এসে তার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিলে। হার্মান পিছন ফিরে চাইল না, সে তখন ব্যাপারটা অনুমানেই বুঝে নিয়েছে এক লাফ মেরে সে এগিয়ে গেল। পরক্ষণেই পিছন থেকে ভেসে এল কর্কশ শব্দ
একটা প্রকাণ্ড লোহার সিন্দুকের ডালা যেন সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল!
হার্মান বুঝল পিছন থেকে এক পাষণ্ড কেম্যান তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু শিকার করতে না-পেরে দন্তসজ্জিত দুই চোয়াল ব্যর্থ দংশনে পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে!
অগভীর জল ঠেলে সে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে লাগল প্রাণপণে…
শক্ত মাটির উপর পা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল হার্মান আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার পায়ের উপর চেপে বসল বিকট একজোড়া দাঁতালো চোয়ালের বজ্র-দংশন!
হার্মানের কণ্ঠ ভেদ করে নির্গত হল কাতর আর্তনাদ!
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে জন দেখল কেম্যান তার বন্ধুর পা কামড়ে ধরে গভীর জলে টেনে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে।
একলাফে এগিয়ে এসে সে চেপে ধরলে হার্মানের দুই হাতের কবজি। শুরু হল যমে মানুষে টানাটানি!…
হঠাৎ একটা পাথরের উপর হোঁচট খেয়ে পড়ে রইল জন, সঙ্গীর হাতের উপর থেকে খুলে গেল তার বজ্রমুষ্টির বন্ধন–হার্মান বুঝল আর রক্ষা নেই, নক্ৰদানব তাকে এইবার নিয়ে যাবে গভীর জলের মধ্যে।
আর ঠিক সেই সঙ্গিন মুহূর্তে তার কানে এল অপরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর। কথাগুলোর অর্থ সে বুঝতে পারল না–কারণ কণ্ঠস্বরের মালিক যে-ভাষায় কথা কইছে সেই ভাষা হার্মানের পরিচিত নয়।
..কেম্যান এতক্ষণ শিকারকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল জলসিক্ত ভূমির ওপর দিয়ে হঠাৎ হার্মান অনুভব করলে তার পায়ের উপর শিথিল হয়েছে কুম্ভীরের দংশন, সরীসৃপ আর তাকে আকর্ষণ করছে না!
দানবটার ভাবান্তরের কারণ অনুসন্ধান করার জন্য মুখ তুলল হার্মান, সঙ্গেসঙ্গে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিস্ময়কর দৃশ্য–
কেম্যানের পিঠের উপর বসে আছে একটি প্রায়-কৃষ্ণবর্ণ মানুষ।
পরক্ষণেই কুম্ভীর হার্মানের দেহটাকে সজোরে শূন্যে নিক্ষেপ করলে
শক্ত মাটির উপর আছড়ে পড়ল হার্মান, কঠিন মৃত্তিকার সংঘাতে এক মুহূর্তের জন্যে সে অনুভব করলে তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে তার সর্বাঙ্গে
তারপরই লুপ্ত হয়ে গেল তার চৈতন্য…
চোখ মেলে হার্মান দেখল একটা নৌকার পাটাতনে দেহ ছড়িয়ে সে শুয়ে আছে এবং দাঁড় বেয়ে নৌকাটিকে চালনা করছে দুটি রেড-ইন্ডিয়ান। জন কাছেই ছিল, বন্ধুর জ্ঞান হয়েছে দেখে সে সামনে এগিয়ে এল।
জনের মুখ থেকেই সমস্ত ঘটনা শুনল হার্মান :
এই অঞ্চলের রেড-ইন্ডিয়ানরা কুমিরের সঙ্গে হাতাহাতি করতে অভ্যস্ত। এটা তাদের কাছে। একধরনের খেলা।
কেম্যান যখন হার্মানকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়েই অকুস্থলে আবির্ভূত হয়ে দুজন রেড-ইন্ডিয়ান শিকারি। হার্মানের অবস্থা দেখে তারা চিৎকার করে ওঠে (অজ্ঞান হওয়ার আগে তাদের কণ্ঠস্বর হার্মান শুনেছিল), তারপর মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেম্যানের উপর। একজন রেড-ইন্ডিয়ান কুমিরের চোখে বর্শা বিধিয়ে দেয়। আহত কেম্যান মুখের শিকার ছুঁড়ে ফেলে নবাগত শত্রুদের আক্রমণ করার চেষ্টা করে।
প্রায় পনেরো ফুট দূরে ছিটকে পড়ে হার্মান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
ইতিমধ্যে বর্শার খোঁচা খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল কেম্যান। এই অঞ্চলের রেড ইন্ডিয়ানরা জলবাসী ওই দানবকে মোটেই ভয় পায় না–জলের মধ্যে কেবল বর্শা ও ছোরার সাহায্যে তারা কুমিরগুলোকে হত্যা করে থাকে।
এমন আশ্চর্য কৌশলের সঙ্গে তারা কেম্যানের পিঠের উপর উঠে বসে যে নক্ৰদানবের দাঁতালো চোয়াল এবং লোহার চাবুকের মতো সাংঘাতিক লাঙ্গুল কিছুতেই তাদের শরীর স্পর্শ করতে পারে না–
কিন্তু পৃষ্ঠদেশে উপবিষ্ট শিকারির তীক্ষ্ণ অস্ত্র বারংবার বিদ্ধ হয় কেম্যানের দেহে অবশেষে রক্তপাতের ফলে অবসন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করে কেম্যান।
অদ্ভুত সাহস! আশ্চর্য বীরত্ব!…
না, ও-রকম অদ্ভুত সাহস বা বীরত্বের পরিচয় দিতে পারবে না হার্মান আর জন। ব্রিটিশ গায়নার নদীতে আর কখনো তারা মাছ ধরতে যায়নি।
জলে নেমে জলের রাজা কুমিরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করার শখ তাদের নেই।
[শ্রাবণ ১৩৭৭]
মার্জারের অপমৃত্যু
পশ্চিম মেক্সিকোর বিশাল জলাভূমি সিনেগা গ্র্যান্ডির বুকের উপর দাঁড়িয়ে যে লোক বলতে পারে, আমি একটুও ভয় পাইনি- সে হয় ডাহা অন্ধ আর নয় তো বদ্ধ পাগল।
ডেল লী সাহসী ছেলে কিন্তু সে অন্ধও নয় পাগলও নয়। চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করেই সে বুঝে নিল– জায়গাটা মোটেই সুবিধের নয়, একটু অসাবধান হলেই প্রাণপাখি হঠাৎ খাঁচাছাড়া হতে পারে।
সামনে ঝুঁকে পড়ে ডেল বললে, গাড়ি থামাও।
ট্রাক থামল।
ডেল লী গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল, আদেশ করলে, তবু লাগাও।
তাঁবু খাটাবার সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে ট্রাক থেকে নামল দুজন স্থানীয় অধিবাসী এবং একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক।
