হার্মান উত্তর দিলে না। মোটরবোটের গলুই-এর উবু হয়ে শুয়ে সে জলের ভিতরটা শ্যেনদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল… প্রথমে কয়েকটা বুদ্বুদ ভেসে উঠল, তারপরই নদীর জলে জাগল গাঢ় লাল রং-এর আভাস রক্ত?
লাল রং-এর তরল ধারা যেখানে জলের উপর ভেসে উঠেছে সেই জায়গায় একটা আঙুল ডুবিয়ে দিলে হার্মান–তারপর সিক্ত অঙ্গুলিটিকে সে চোখের সামনে তুলে ধরলে…হ!রক্তই বটে!
জন! হার্মান চেঁচিয়ে উঠল, আমরা কোনো জীবন্ত প্রাণীর দেহে আঘাত করেছি। এই দেখো রক্ত!
সে জনের দিকে তার আঙুল বাড়িয়ে দিলে।
জন বন্ধুর রক্তমাখা আঙুল পরীক্ষা করার চেষ্টা করলে না, তার দৃষ্টি এখন মোটরবোটের পিছনদিকে নিবদ্ধ
জলের উপরিভাগে আত্মপ্রকাশ করেছে একটা ধূসর গাছের গুঁড়ি।
হ্যাঁ, গাছের গুঁড়ি বটে কিন্তু নিশ্চল নয়!
সেই জীবন্ত বৃক্ষকাণ্ড প্রচণ্ড বেগে আলোড়ন তুলেছে নদীর বুকে–তপ্ত রক্তধারায় লাল হয়ে উঠেছে নদীর জল!
কেম্যান!
ব্রিটিশ গায়নার জলরাজ্যের বিভীষিকা এই কেম্যান হচ্ছে কুম্ভীরবংশের সবচেয়ে হিংস্র, সবচেয়ে ভয়ংকর জীব!
স্তম্ভিত নেত্রে দুই বন্ধু কেম্যান-কুম্ভীরের মৃত্যুযাতনা দেখতে লাগল। প্রপেলারের ঘূর্ণিত শেয়ার-পিন কুমিরের মাথার পিছনে ঠিক ঘাড়ের উপর আঘাত করেছে
সরীসৃপের স্থূল ও কঠিন স্কন্ধদেশ ভেদ করে গ্রীবা পর্যন্ত কেটে বসেছে প্রপেলার এবং তারপরই প্রবল সংঘাতে ভেঙে গেছে যন্ত্র।
দুই বন্ধুই বুঝল কুমিরটা বেশিক্ষণ বাঁচবে না।
শেষ দৃশ্যের জন্য তারা অপেক্ষা করলে না, কোনোরকমে প্রপেলারে নতুন শেয়ার-পিন লাগিয়ে তারা অকুস্থল ত্যাগ করে সবেগে মোটরবোট চালিয়ে দিলে…
মোটরবোট চলছে, চলছে আর চলছে। দুই বন্ধু বসে আছে বোবার মতো। কেউ কথা কইছে না। হঠাৎ চলমান মোটরবোটের উপর থেকে নদীর ধারে একটি জায়গায় তাদের চোখ পড়ল, সঙ্গেসঙ্গে তাদের মেরুদণ্ড বেয়ে ছুটে এল আতঙ্কের শীতল স্রোত
কর্দমাক্ত তীরভূমির উপর শুয়ে আছে অনেকগুলো কেম্যান-কুম্ভীর।
মোটরবোটের শব্দে আকৃষ্ট হল কুমিরগুলো–দুই বন্ধু দেখল তীরবর্তী নকুলের চোখে চোখে জ্বলে উঠেছে হিংস্র ক্ষুধিত দৃষ্টি!
একটা মস্ত বড়ো কেম্যান হঠাৎ জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোট লক্ষ করে সাঁতার কাটতে লাগল দ্রুতবেগে।
খুব সম্ভব তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না, হয়তো নবাগত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে চেয়েছিল সে, কিন্তু দুই বন্ধু আতিথ্যের মর্যাদা রাখল না, এত জোরে তারা মোটরবোট ছুটিয়ে দিলে যে প্রাণপণে সাঁতার কেটেও কেম্যান তাদের নাগাল পেল না..
অনেক দূর এসে একটা বাঁকের মুখে নোঙর ফেলল তারা। দুই দুইবার ব্যর্থ চেষ্টার পর তৃতীয়বার ভাগ্যদেবতার কৃপা লাভ করলে হার্মান, একটা সোনালি রেখা বিদ্যুচ্চমকের মতো জল থেকে লাফিয়ে উঠে আবার নদীগর্ভে অদৃশ্য হল–গোল্ডেন ডোরাডো!
স্বর্ণখচিত দেহের অধিকারী ডোরাডো মৎস্য কেবল অসাধারণ রূপবান নয়, সে বিলক্ষণ শক্তিশালীও বটে। ছিপের সুতো টেনে সে ছুটতে লাগল তিরবেগে হার্মান তাকে খেলিয়ে তুলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল।
উত্তেজিত জন বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে উৎসাহ দিতে লাগল–
এতক্ষণে তাদের চেষ্টা সফল হল, সোনা-রং-মাখা ডোরাডো মাছ এখনই এসে পড়বে তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে…
হঠাৎ হার্মান অনুভব করলে ছিপের সুতো শিথিল হয়ে পড়েছে, ডোরাডো বুঝি সুতো কেটে তাদের ফাঁকি দিলে! হার্মান তাড়াতাড়ি ছিপ ধরে টান মারল। বঁড়শির দিকে দৃষ্টিপাত করেই দুই বন্ধুর চক্ষুস্থির!
মাছের দেহহীন মুণ্ডটা ঝুলছে বঁড়শির মুখে! গলার তলা থেকে বাকি অংশটা কে যেন কেটে নিয়েছে।
বন্ধুর দিকে ফিরে শুদ্ধস্বরে হার্মান প্রশ্ন করলে, আমি যা ভাবছি তুমিও কি তাই ভাবছ?
অবসন্নকণ্ঠে উত্তর এল, দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি তোমার অনুমান নির্ভুল।
জন বঁড়শি থেকে মাছের মুণ্ডটা খুলে নিয়ে নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলল। তৎক্ষণাৎ জল তোলপাড় করে আবির্ভূত হল একজোড়া দন্ত-ভয়াল বীভৎস চোয়াল!
চোয়াল দুটো মুহূর্তের মধ্যেই আবার জলের ভিতর অদৃশ্য হল; হার্মানের প্রথম শিকার সোনালি ডোরাডোর দেহহীন মুণ্ডটা জলে পড়তে-না-পড়তেই সেই চোয়াল দুটির ফাঁকে অন্তর্ধান করলে! বীভৎস দৃশ্য!
মাছ ধরার উৎসাহ আর রইল না, হার্মান নোঙর খুলে বোট চালিয়ে দিলে..
..আচম্বিতে এক প্রকাণ্ড ধাক্কা খেয়ে মোটরবোট লাফিয়ে উঠল। বোটের প্রপেলার জল ছেড়ে শূন্যে উঠেও তার কর্তব্য করতে ভুলল না–প্রপেলারের পাখা বাতাস কেটে ঘুরতে লাগল প্রচণ্ড শব্দে।
মোটরবোটের দুই আরোহী আছড়ে পড়ল পাটাতনের উপর।
ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হল না তাদের জলের নীচে কোনো একটি কেম্যানের গায়ে ধাক্কা মেরেছে মোটরবোট এবং তার ফলে এই বিপর্যয়!
হার্মান তাড়াতাড়ি মোটর থামিয়ে দিলে।
প্রপেলারের আর্তনাদ বন্ধ করল, শান্তভাবে মোটরবোট ভাসতে লাগল নদীর জলে।
সঙ্গেসঙ্গে আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল জন, আরে! আরে! করছ কী! ভগবানের দোহাই বোট চালাও!
বোটে তখন জল উঠছে।
এই ভয়ংকর জায়গায় বোট ডুবলে আর নিস্তার নেই–সাঁতার কেটে তীরে ওঠার আগেই কেম্যানের আক্রমণে তাদের মৃত্যু অবধারিত
নিকটস্থ তীরভূমি লক্ষ করে বোট চালাল হার্মান।
অসংখ্য ছিদ্রপথে তখন হুহু করে জল উঠছে বোটের মধ্যে…
