লড়াই চলল অনেকক্ষণ ধরে–তারপর অত্যধিক রক্তপাতে অবসন্ন পশুরাজ ধীরে ধীরে ধরাশয্যা গ্রহণ করল।
সূর্যের আলোয় আবার ঝলসে উঠল অনেকগুলো শানিত ছুরিকা–নিষ্ঠুর আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেল সিংহের বিশাল মস্তক! সব শেষ!
আহত মাসাইদের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই চোখে পড়ল বীভৎস ক্ষত থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে গল গল করে, কিন্তু তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই! আমি দুজন যোদ্ধার ক্ষতস্থান উঁচসুতো দিয়ে সেলাই করে দিলাম; একজন তো কথাই বলল না, আর একজন তালুতে জিভ লাগিয়ে শব্দ করল স! অর্থাৎ কী আপদ! সামান্য ব্যাপারে এত কেন?
আমি বাজি ফেলতে পারি যেকোনো শ্বেতাঙ্গ এই অবস্থায় পড়লে যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যেত।
মাসাই যোদ্ধাদের বর্শা খুব শক্ত হয় না। স্রোতস্বতী নদীর ধার থেকে মাটি-মেশানো-লোহা দিয়ে স্থানীয় কামাররা বর্শা তৈরি করে, কিন্তু সেই লোহাকে টেম্পার দিয়ে কঠিন করার বিদ্যা তারা আয়ত্ত করতে পারেনি। জোরে আঘাত পেলে বর্শার ফলা বেঁকে যায়। হাঁটুর ওপর রেখে অনায়াসেই ওই বর্শাফলক বাঁকিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মাসাই যোদ্ধা ওই বর্শা চালিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। সেই আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা চোখে না-দেখলে বিশ্বাস হয় না। মাসাইদের দক্ষতার নমুনাস্বরূপ আর একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। এই ঘটনাটি বলার আগে আফ্রিকার লেপার্ড সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা দরকার।
আফ্রিকার মতো ভারতের অরণ্যেও লেপার্ড আছে, বাংলায় তাকে চিতাবাঘ বলে ডাকা হয়। কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে চিতা নামে যে জানোয়ার বাস করে, তার দেহ-চর্মের সঙ্গে লেপার্ডের কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও দেহের গঠনে আর স্বভাব-চরিত্রে চিতার সঙ্গে লেপার্ডের বিশেষ মিল নেই–চিতা এবং লেপার্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন জানোয়ার। চিতা ভীরু প্রকৃতির জীব। লেপার্ড হিংস্র, দুর্দান্ত।
জে. হান্টার, জন মাইকেল প্রভৃতি খ্যাতনামা শিকারি লেপার্ডকে আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক জানোয়ার বলেছেন। সিংহের মতো বিপুল দেহ এবং প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী না হলেও ধূর্ত লেপার্ডের বিদ্যুৎচকিত আক্রমণকে অধিকাংশ শিকারিই সমীহ করে থাকেন।
লেপার্ডের আক্রমণের কৌশল অতি ভয়ংকর। লতাপাতা ও ঘাসঝোপের আড়াল থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে সে যখন বিদ্যুৎবেগে শিকারির ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে, তখন আক্রান্ত ব্যক্তি অধিকাংশ সময়েই হাতের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পায় না। প্রথম আক্রমণেই লেপার্ড তার সামনের দুই থাবার ধারালো নখ দিয়ে শিকারির চোখ দুটোকে অন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে, সঙ্গে সঙ্গে একজোড়া দাঁতালো চোয়ালের মারাত্মক দংশন চেপে বসে শিকারির কাঁধে, আর পিছনের দুই থাবার নখগুলোর ক্ষিপ্র সঞ্চালনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হতভাগ্যের উদর।
বিখ্যাত শিকারি জে. হান্টার একবার তিনজন বর্শাধারী মাসাই-যোদ্ধার সঙ্গে একটা লেপার্ডকে অনুসরণ করেছিলেন। জন্তুটা কয়েকদিন ধরে মাসাই পল্লিতে ছাগল মারছিল। সিংহ ক্ষুধার্ত হলেই শিকার ধরে, অকারণে সে প্রাণীহত্যা করে না। লেপার্ড শুধু হত্যার আনন্দেই হত্যা করে। মাসাই পল্লির হানাদার লেপার্ড অনেকগুলো ছাগল মেরেছিল, কিন্তু একটিরও মাংস খায়নি।
বেশ কিছুক্ষণ পলাতক লেপার্ডের পদচিহ্ন ধরে খোঁজাখুঁজি করার পর একটা ঘাস-জঙ্গলের মধ্যে তার সন্ধান পাওয়া গেল। পায়ের দাগ দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, জন্তুটা ওই ঘাসের জঙ্গলেই ঢুকেছে, তবে ঠিক কোথায় সে অবস্থান করছে সেটা অনুমান করা সহজ ছিল না। লেপার্ডের পরিবর্তে সিংহ হলে আন্দাজে কয়েকটা পাথর ঘাসঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে দিলেই কাজ হত–পশুরাজ ছুটে এসে আক্রমণ করত অথবা তার অস্তিত্ব ঘোষণা করত সগর্জনে। কিন্তু লেপার্ড অতিশয় ধূর্ত, গায়ে ঢিল পড়লেও সে চুপ করে থাকে, শিকারিকে তার অবস্থান নির্ণয় করতে দেয় না। ঘাস-জঙ্গলের মধ্যে অনেকগুলো পাথর ছোঁড়া হল। বৃথা চেষ্টা। লেপার্ডের সাড়া নেই।
হান্টার জানতেন জন্তুটা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। তিনি ভেবেছিলেন ক্রুদ্ধ লেপার্ডের বিদ্যুৎচকিত আক্রমণ মাসাইদের বিভ্রান্ত করে দেবে, তার বর্শা চালানোর সুযোগই পাবে না কিন্তু সাহেব ভুল করেছিলেন, বর্শাধারী মাসাই-যোদ্ধার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল খুবই অস্পষ্ট।
সাহেবের নির্দেশ অনুসারে তার পিছনে দু-পাশে ছড়িয়ে পড়ে তিনটি মাসাই কোমরসমান উঁচু ঘাসের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলল পলাতক শ্বাপদের সন্ধানে। প্রতি পদক্ষেপেই শিকারিরা একবার থমকে দাঁড়াচ্ছিল, তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে আবার পা ফেলছিল অতি সন্তর্পণে। ঘাস-জঙ্গলটা খুব বড়ো নয়, কিন্তু এইভাবে চলা বড়ো কষ্টকর দারুণ উত্তেজনায় স্নায়ু যেন ছিঁড়ে পড়তে চায়।
আচম্বিত হান্টার সাহেবের ডান দিকে সম্মুখভাগে ঘাসের আবরণ ভেদ করে আত্মপ্রকাশ করল এবং লাফ দিল তাকে লক্ষ করে। সাহেব রাইফেল তোলার আগেই তার ডান দিকে দণ্ডায়মান মাসাই-যোদ্ধার বর্শা শ্বাপদের দেহ বিদ্ধ করল। ঘাড় এবং কাঁধের মাঝামাঝি জায়গায় এফোঁড়-ওফোঁড় করে বর্শাটা লেপার্ডকে মাটিতে গেঁথে ফেলেছিল।
মুক্তিলাভের চেষ্টায় জন্তুটার কী আস্ফালন আর গর্জন কিন্তু নিষ্ফল প্রয়াস! এমন শক্ত আলিঙ্গনে বর্শাটা তাকে মাটির সঙ্গে গেঁথে ফেলেছিল যে, প্রাণপণ চেষ্টাতেও সে অস্ত্রটাকে ঝেড়ে ফেলে উঠে আসতে পারছিল না।
