সেই সচল বৃত্ত ক্রমশ ছোটো হয়ে এল; সিংহের চেহারাও হয়ে উঠল ভয়ংকর। তার দুই চোখ জ্বলতে লাগল, উন্মুক্ত মুখবিবরের ফাঁকে ফাঁকে আত্মপ্রকাশ করল নিষ্ঠুর দাঁতের সারি, আর তার সুদীর্ঘ লাঙ্গুল দারুণ আক্রোশে মাটিতে আছড়ে পড়ল একবার, দু-বার, তিনবার।
পরমুহূর্তে সিংহ আক্রমণ করল।
সঙ্গেসঙ্গে শূন্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল উড়ে এল এক ঝাঁক বর্শা সিংহের দিকে।
একটা বর্শা তার স্কন্ধ ভেদ করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে এল, কিন্তু সিংহের গতি রুদ্ধ হল না, সামনে যে লোকটিকে পেল তার উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। আক্রান্ত মাসাই একটুও নড়ল না, ঢালের আড়াল থেকে বর্শা বাগিয়ে প্রস্তুত হল চরম মুহূর্তের জন্য।
থাবার এক আঘাতে সিংহ ঢালটাকে ফেলে দিল, তারপর পিছনের দু-পায়ে দাঁড়িয়ে সামনের থাবার সাহায্যে লোকটিকে টেনে আনতে চেষ্টা করল নিজের দিকে।
কিন্তু সেই শরীরী মৃত্যুর আলিঙ্গনে ধরা পড়ার আগেই মাসাই-যোদ্ধা ক্ষিপ্রহস্তে বর্শা চালিয়ে সিংহের বক্ষ ভেদ করে ফেলল, তবু শেষ রক্ষা করতে পারল না–পশুরাজের গুরুভার দেহের সংঘাতে ভূমিপৃষ্ঠে লম্ববান হয়ে পড়ে গেল। আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম ধারালো বর্শার ফলা বুকের পিচ্ছিল মাংসপেশি ভেদ করে অন্তত তিন ফুট ভিতরে ঢুকে গেছে এবং ক্ষতস্থান থেকে গল গল করে বেরিয়ে আসছে গরম রক্তের ফোয়ারা।
এমন দারুণ মার খেয়েও সিংহ পরাজয় স্বীকার করল না।
বজ্ৰদংশনে শত্রুর কাঁধ চেপে ধরে সিংহ পিছনের দুই থাবার সবগুলো নখ বিধিয়ে দিল শত্রুর পেটে পরক্ষণেই সনখ থাবার প্রচণ্ড আকর্ষণে বিদীর্ণ হয়ে গেল ভূপতিত যোদ্ধার উদর, রক্তাক্ত পাকস্থলীটা কাঁপতে কাঁপতে ছড়িয়ে পড়ল মাটির উপর।
বীভৎস দৃশ্য!
এবার আর বর্শা নয়–কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে দ্বি-ধার ছুরিকা খুলে যোদ্ধারা ছুটে এল এবং বারংবার আঘাত করতে লাগল সিংহের মাথায় উন্মাদের মতো।
মাত্র কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে নাকের ডগা থেকে করোটি পর্যন্ত বিরাট কেশরযুক্ত মাথাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
মাসাইদের বিশ্বাস সিংহের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় যে-ব্যক্তি সিংহের লেজ ধরে টেনে রাখতে পারবে, সে-ই সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা। ব্যাপারটা বড়ো সহজ নয় অন্যান্য যোদ্ধারা যখন সিংহের দেহের ওপর বর্শা ও ছোরার সদ্ব্যবহার করবে, তখন একজন মাসাই সেই ক্রোধোন্মত্ত সিংহের লাঙ্গুল সজোরে টেনে রাখবে। যে-যোদ্ধা পর পর চারবার এইভাবে সিংহের লেজ ধরতে পারে, মাসাইরা তাকে মেমবুকি উপাধি দেয়। মেলমবুকি উপাধি মাসাইদের কাছে বিরাট সম্মানজনক ব্যাপার এবং এই সম্মানের লোভে বহু মোরান যুবক অকালে প্রাণ হারায়।
আমার জীবনে এমন ভয়ংকর নাটকের দর্শক হওয়ার সৌভাগ্য একবার হয়েছিল, সে-কথাই বলছি।
যোদ্ধাদের দলটা বেশ বড়ো ছিল এবং এবারও আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হল কোনো কারণেই গুলি চালাতে পারব না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ছোটো ঝোপের ভিতর সিংহের সাড়া পাওয়া গেল। মাসাই যোদ্ধারা সঙ্গেসঙ্গে ঝোপটাকে ঘিরে ফেলল।
ঝোপটা খুব ঘন ছিল না। মাসাইরা বৃত্তাকারে এগিয়ে চলল চিৎকার করতে করতে। হঠাৎ ঝোপের মাঝখান থেকে একাধিক সিংহের গর্জন শুনতে পেলাম। তারপরই দেখলাম একটা সিংহ তিরবেগে ছুটে এসে একজন মাসাইয়ের ঢালের উপর সজোরে চপেটাঘাত করে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিল এবং অন্যান্য যোদ্ধারা কিছু করার আগেই সকলের মাথার উপর দিয়ে লম্বা লাফ মেরে অদৃশ্য হয়ে গেল পাশের জঙ্গলের মধ্যে। সমস্ত ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে, কেউ হাতের বর্শা তোলার সময় পেল না।
যাই হোক, যে-লোকটি পড়ে গিয়েছিল সে আহত হয়নি, এটাই সান্ত্বনা।
ঝোপের ভিতর সিংহের চাপা গর্জন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠল।
এগিয়ে গিয়ে দেখলাম মাসাইরা আর একটা সিংহকে ঘিরে ফেলেছে। কোণঠাসা পশুরাজ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর থেকে থেকে গর্জে উঠছে, যেন বলতে চাইছে–সাবধান, আর এগিয়ো না।
সিংহের থেকে প্রায় দশগজ দূরে মাসাইরা দাঁড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই বর্শা ছুটতে লাগল ঝাঁকে ঝাকে। কয়েকটা বর্শা সিংহের দেহ বিদ্ধ করে মাটিতে পড়ে গেল, কেবল একটা বর্শা দেখলাম সিংহের পেটে গম্ভীর হয়ে বসে গেছে। ভীষণ গর্জন করে জানোয়ারটা লাফিয়ে উঠল আর সঙ্গেসঙ্গে একজন মাসাই হাতের বর্শা মাটিতে ফেলে ছুটে এসে সিংহের লম্বা লেজটা দুই হাতের বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরল। (মাসাইরা কখনো সিংহের লেজের আগায় রোমশ অংশে হাত দেয় না, তারা গোড়ার দিকটা চেপে ধরে। কারণ, সিংহ তার লেজটাকে লোহার ডান্ডার মতো শক্ত করতে পারে এবং সেই আড়ষ্ট ও কঠিন লাঙ্গুলের একটি আঘাতে ঠিকরে মাতা ধরিত্রীকে আলিঙ্গন না-করে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এমন বলিষ্ঠ মানুষ দুনিয়ায় আছে কি না সন্দেহ।)
লেজ ধরামাত্র অন্যান্য যোদ্ধারা ছোরা হাতে ছুটে এসে সিংহকে আক্রমণ করল। এই চরম মুহূর্তে মাসাই যোদ্ধাদের দেহে কোনো অনুভূতি থাকে না, তারা যন্ত্রের মতো আঘাত করতে থাকে এবং যন্ত্রের মতোই নখ ও দাঁতের আঘাত গ্রহণ করে নিজেদের শরীরের ওপর ভীষণ উত্তেজনায় কিছুক্ষণের জন্য তাদের শারীরিক অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়।
আমি স্বচক্ষে দেখলাম সিংহ যখন নিজেকে মুক্ত করতে পারল না, তখন পিছনের দুই পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে দক্ষ মুষ্টিযোদ্ধার মতো ডাইনে-বামে থাবা চালাতে শুরু করল। প্রায় প্রতিটি আঘাতেই তার থাবার নখগুলো একাধিক শত্রুর দেহে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করল বটে, কিন্তু আমি কোনো যোদ্ধার মুখে যন্ত্রণার অভিব্যক্তি দেখতে পেলাম না। পরে শুনেছিলাম এই সময় তারা বেদনা বোধ করে না।
