গাছের ওপরে ও নীচে আহারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় হিংস্র কুকুরমুখো বেবুন-বাঁদরের দল, আর তাদের ওপর হানা দিতে সতর্ক পায়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে আরও হিংস্র এক অতিকায় মার্জার গাছের ছায়ায় ছায়ায় অস্পষ্ট আলো-আঁধারিতে তার গায়ের গোল গোল দাগগুলো মিশে যায়, শুধু পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঘাসের আড়ালে জ্বলতে থাকে একজোড়া ক্ষুধিত চক্ষু–
লেপার্ড!
অকস্মাৎ সমগ্র বনভূমির বুকে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে জেগে ওঠে এক ভৈরব-কণ্ঠের হুংকার-সংগীত! পশুরাজ সিংহ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে সগর্বে!
হ্যাঁ, এই হল আফ্রিকা! শিকারির স্বর্গ!
এখানকার নদী আর জলাভূমিও অতিশয় বিপজ্জনক। জলের মধ্যে এবং জলের ধারে ঝোপের ভিতর স্থির হয়ে পড়ে থাকে যেসব কুমির, নরমাংসে তাদের মোটেই অরুচি নেই; এবং দৈত্যাকৃতি হিপোপটেমস বা জলহস্তীরা যদিও মাংসভোজী নয়, কিন্তু মেজাজ খারাপ হলে মানবদেহের ওপর দাঁতের ধার পরখ করতে তারা আপত্তি করে এমন কথা কেউ কখনো শোনেনি।
এমন চমৎকার জায়গায় যারা বাস করে তাদের আকৃতি ও প্রকৃতি যে আদর্শ ভদ্র সন্তানের উপযুক্ত হবে না এ-কথা অনুমান করতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না; তবু ভীষণের মধ্যেও আরও-ভীষণ আছে–তাই আফ্রিকার যোদ্ধা অধিবাসীদের মধ্যেও মাসাই জাতির নাম সর্বাপেক্ষা খ্যাতিলাভ করেছে।
আজ এই মাসাইদের কথাই বলব।
পৃথিবীতে বহু ধরনের খেলা আছে, কিন্তু শিকারের মতো উত্তেজনা কোনো খেলাতেই নেই। আর সব শিকারের সেরা শিকার–সিংহ-শিকার!
এই সিংহের চামড়ার লোভে দেশ-বিদেশের শিকারিরা এসে ভিড় জমায় আফ্রিকার বনে-জঙ্গলে। ইউরোপ আর আমেরিকায় নিজের সুসজ্জিত বৈঠকখানায় লম্বমান সিংহ-চর্মের স্বপ্ন দেখেন না এমন শিকারি নেই বললেই চলে।
কিন্তু সিংহ-শিকার সহজ নয়, তাই এই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করতে গিয়ে অনেক ভদ্রলোকই আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে প্রাণ হারিয়েছেন, অথবা বিকলাঙ্গ দেহ নিয়ে ফিরে গেছেন স্বদেশে, সর্বাঙ্গে বহন করেছেন শিকারি জীবনের তিক্তস্মৃতি–বীভৎস ক্ষতচিহ্ন!
গর্জনে আকাশ কাঁপিয়ে পশুরাজ সিংহ যখন শিকারির দিকে ছুটে আসে, তখন তার সমস্ত দেহ সংকুচিত হয়ে বৃত্তাকার ধারণ করে দূর থেকে মনে হয় এক দন্ত-ভয়াল ধূসর চর্মগোলক মাটির ওপর দিয়ে বিদ্যুৎবেগে উড়ে আসছে শূন্যকে বিদীর্ণ করে! সেই ধাবমান বিভীষিকার দেহের ওপর লক্ষ স্থির করে গুলি চালানো অত্যন্ত কঠিন কাজ, আর একেবারে মর্মস্থানে আঘাত হানতে না-পারলে আহত সিংহ ধরাশায়ী হতে চায় না শত্রুর দেহের ওপর পড়ে তাকে দাঁতে-নখে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।
কিন্তু এই ভয়ংকর খেলাকে পেশা হিসাবে নিয়েছে এমন পেশাদার শিকারিও আছে। ওদেশে তাদের বলে হোয়াইট হান্টার বা শ্বেত শিকারি।
এই সাদা শিকারিদের সকলেই ক্ষিপ্রহস্তে গুলি চালিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারে, আক্রমণোদ্যত হিংস্র পশুর সামনে তারা কখনো আতঙ্কে আত্মহারা হয়ে পড়ে না, মাত্র সাত-আট গজ দূর থেকে নির্ভুল নিশানায় গুলি চালিয়ে মারমুখী ধাবমান সিংহকে এরা মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।
এহেন সাদা শিকারিরাও মাসাই যোদ্ধাদের নামে মাথার টুপি খুলে শ্রদ্ধা জানাতে লজ্জা পায় না।
নিম্নলিখিত বিবরণী পড়লেই বোঝা যাবে তাদের শ্রদ্ধা নেহাত অপাত্রে ন্যস্ত হয়নি।
একজন বিখ্যাত শ্বেত শিকারির রোজনামচা থেকে এই কাহিনি তুলে দিচ্ছি–
ভোর হতেই আমরা সিংহের পায়ের চিহ্ন খুঁজে বার করলাম। আগের রাত্রে সিংহ যে ষাঁড়টা মেরেছে, তার মৃতদেহ পাওয়া গেল না। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ও রক্তমাখা পায়ের চিহ্ন ধরে দশজন বর্শাধারী মোরান এগিয়ে চলল (মাসাই যোদ্ধাদের মোরান নামে ডাকা হয়)।
আমি রাইফেল হাতে তাদের অনুসরণ করলাম। আজকের শিকারে আমি দর্শক মাত্র, মোরানরা জানিয়ে দিয়েছে আমার সাহায্য তাদের প্রয়োজন নেই।
কিছুক্ষণ পরে জানোয়ারটার সন্ধান পাওয়া গেল। ফাঁকা জায়গায় বসে সিংহ সারারাত ধরে আকণ্ঠ ভোজন করেছে, তারপর ষণ্ডমাংসে পরিপূর্ণ উদর নিয়ে ঢুকেছে একটা ঘাসঝোপের ভিতর বিশ্রামের উদ্দেশ্যে।
ঘন ঘাসঝোপের মধ্যে সিংহের সঙ্গে লড়াই চলে না। মাসাইরা ঝোপের বাইরে থেকে পাথর ছুঁড়তে লাগল। একটু দূরেই শোনা গেল ক্রুদ্ধ কণ্ঠে অস্ফুট গর্জন–পশুরাজ ক্রোধ প্রকাশ করছে! ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, মাসাই যোদ্ধারা দ্বিগুণ উৎসাহে পাথর ছুঁড়তে শুরু করল। সেই প্রচণ্ড পাথর বৃষ্টির মধ্যে স্থির হয়ে বসে থাকা সিংহের পক্ষেও অসম্ভব; ঝোপজঙ্গল কাঁপিয়ে আমাদের থেকে প্রায় এক-শো গজ দূরে পশুরাজ বেরিয়ে এল ফাঁকা জমির ওপর এবং পরক্ষণেই লাফের পর লাফ মেরে পালাতে শুরু করল।
তৎক্ষণাৎ ভীষণ চিৎকার করে মাসাইরা তার পিছু নিল। লম্বা লম্বা হলুদ রং ঘাসের ভিতর দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে চলল দশটি দীর্ঘাকার মনুষ্যমূর্তি–শিকার হাতছাড়া করতে তারা রাজি নয়।
ছুট, ছুট, ছুট।
সিংহের স্ফীত ও শিথিল উদর সবেগে দুলতে লাগল, একবার এদিক, একবার ওদিক।
কিন্তু ভরপেট খাওয়ার পর এত ছুটোছুটি তার বেশিক্ষণ ভালো লাগল না, হঠাৎ থেমে পশুরাজ রণং দেহি মূর্তিতে ঘুরে দাঁড়াল।
বর্শাধারী যোদ্ধারা সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তাকে গোল হয়ে ঘিরে ফেলল, আর বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গর্জাতে লাগল পশুরাজ সিংহ।
