জাহাজের বাবুর্চি!
সামনে মানুষ দেখে বাবুর্চি একটু আশ্বস্ত হল, মুখে কেবল তার একটি শব্দ ভূত! ভূত!
মি. দেওয়ার ও তার সঙ্গীটিকে বাবুর্চি যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে প্রতিদিনের মতো সেই দিনও সে প্রাতরাশ তৈরি করার জন্য রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল।
হঠাৎ অন্ধকারের ভিতর থেকে যে জীবটি আত্মপ্রকাশ করল সেটা যে একটা আস্ত ভূত সে বিষয়ে বাবুর্চির বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ভূতটা ঠিক ভূতের মতোই ব্যবহার করেছিল অর্থাৎ তেড়ে এসেছিল বাবুর্চির দিকে এবং বলাই বাহুল্য যে বাবুর্চিও তিরবেগে পা চালিয়ে দিতে একটুও দেরি করেনি। ভূত আর মানুষের দৌড় প্রতিযোগিতায় বাবুর্চিই জয়ী হয়েছে, তাই এ যাত্রা তার প্রাণটা বেঁচে গেছে কোনো রকমে।
মি. দেওয়ারের সঙ্গী অফিসার রাঁধুনির বিবরণী শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। মি. দেওয়ারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভূতটাকে যে দিকে দেখা গেছে সেই দিকে পদচালনা করলেন তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল পূর্বোক্ত রাঁধুনি।
একটু পরেই অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যে তাদের দৃষ্টিগোচর হল একটা ছায়ামূর্তি এবং এক জোড়া জ্বলন্ত চক্ষু। ছায়ামুর্তিটা এক লাফ মেরে ডেকের উপর গিয়ে পড়ল, তারপর তরতর করে একটা মাস্তুল বেয়ে একেবারে ডগার উপর আশ্রয় গ্রহণ করল। মি. দেওয়ার বুঝলেন জীবটি মোটেই অশরীরী নয়, সে হচ্ছে অত্যন্ত নিরেট দেহের অধিকারী একটি বাঁদর! এই জন্তুটাই নাবিকদের ফাঁকি দিয়ে নিজের স্বাধীনতা এত দিন পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে। মি. দেওয়ার এই পলাতক আসামীকে গ্রেপ্তার করার জন্য উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। ডেকের উপর ছড়ানো কয়েকটা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে মি. দেওয়ার মাস্তুল বেয়ে খানিকটা উপরে উঠে গেলেন, তারপর সেই টুকরোগুলো ছুঁড়তে লাগলেন বাঁদরটার উদ্দেশ্যে। প্রথম টুকরোটা লাগল না, দ্বিতীয় বারের চেষ্টাও হল ব্যর্থ, কিন্তু তৃতীয় বারে নিক্ষিপ্ত কাষ্ঠখণ্ডটা অব্যর্থ লক্ষ্যে গিয়ে পড়ল বানরটার দেহের উপর! আঘাতটা বেশ জোরেই লেগেছিল, কারণ জন্তুটা মাস্তুলের উপর থেকে স্থানচ্যুত হয়ে পড়তে লাগল নীচের দিকে।
মি. দেওয়ার ভেবেছিলেন অত উঁচু থেকে পড়ে নিশ্চয়ই বাঁদরটার সর্বাঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, কিন্তু জন্তুটা পড়তে পড়তে মাস্তুলের গায়ে জড়ানো একটা দড়ির সঙ্গে লেজটাকে জড়িয়ে দিয়ে আত্মরক্ষা করল!
মি. দেওয়ার সবিস্ময়ে দেখলেন তিনি মাস্তুলের যে অংশে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার একটু দুরেই ইংরেজি ক্রস চিহ্নের মতো মাস্তুলের অপর অংশে আশ্রয় নিয়েছে বাঁদরটা।
জন্তুটা এবার প্রতিআক্রমণ করল। বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে এসে মাস্তুলের গায়ে আটকানো এক টুকরো কাঠ খুলে নিয়ে সজোরে নিক্ষেপ করল মি. দেওয়ারের দিকে।
বাঁদুরে হাতের নিশানা ভুল হয় নি—
ঠাস করে মি. দেওয়ার সাহেবের মাথার উপর এসে পড়ল কাঠের টুকরোটা।
মি. দেওয়ার আঘাতটা সামলে নিয়ে কিছু করার আগেই বাঁদরটা সাঁৎ করে এগিয়ে এসে শত্রুর গণ্ডদেশে করল এক চপেটাঘাত।
দারুণ ক্রোধে মি. দেওয়ার সাহেবের চৈতন্য যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল, তিনি বানরটার গালের উপর বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড চড়!
তারপর কিছুক্ষণ ধরে চলল নর ও বানরের মধ্যে চপেটাঘাতের আদান-প্রদান।
নীচে ততক্ষণে নাবিকরা প্রায় সকলেই এসে উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু এই বিচিত্র দৃশ্যটি তারা বেশিক্ষণ উপভোগ করতে পারল না। মি. দেওয়ারের সঙ্গী অফিসারটি বানরের অগোচরে মাস্তুল বেয়ে উঠে তাকে চট করে জড়িয়ে ধরলেন তারপর দুজন মিলে জন্তুটাকে নামিয়ে আনলেন ডেকের উপর। তারপর আর কি? খুব সহজেই বানরটাকে একটা খাঁচার মধ্যে ভরে দেওয়া হল। জাহাজের নাবিকরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল..
কয়েক ঘণ্টা পরের কথা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ফ্রি-ম্যান্টল বন্দরে প্রবেশ করল ফোর্ডস ডেল নামক জাহাজটি।
আশা করি আপনাকে কোনো অস্বাভাবিক অবস্থায় পড়তে হয় নি?ক্যাপ্টেনকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলেন শুল্ক ভবনের জনৈক কর্মচারী।
নাঃ, তেমন আর কি! কয়েকটা জানোয়ার অবশ্য খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছিল, তবে সেগুলোকে আমরা আবার আটকে ফেলেছিলাম।
খুব শান্ত ও স্বাভাবিক স্বরেই উত্তর দিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন।
মরণ খেলার খেলোয়ার
সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আজ নবজাগ্রত আফ্রিকা। যাঁরা রাজনীতির চর্চা করেন, তাদের কাছে আজ আফ্রিকা তীব্র কৌতূহল ও উদ্দীপনার বিষয়, কিন্তু শুধু আজ নয়
যুগ যুগ ধরে এই অরণ্যাবৃত মহাদেশের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে আর এক ধরনের মানুষ, যারা রাইফেল হাতে বারংবার হানা দিয়েছে আফ্রিকার বনভূমির বুকে–
আফ্রিকা!
বলতেই শিকারির মনশ্চক্ষে ভেসে ওঠে এক বিশাল অরণ্যভূমি যেখানে মদগর্বে সর্বত্র পদচারণা করে বেড়ায় বিপুলবপু হস্তিযূথ, গাছের ডালে ডালে এবং ঝোপঝাড়ে শিকারের অপেক্ষায় লুকিয়ে থাকে মহাকায় অজগর, তৃণ-আচ্ছাদিত প্রান্তরে ছুটোছুটি করে হরিণ-জাতীয় অ্যান্টিলোপ আর জেব্রার দল, লম্বা গলা তুলে গাছের মগডালের পাতা ছিঁড়ে খায় বেঢপ জিরাফ। সর্বাঙ্গ বর্মে ঢেকে নাকের ডগায় দু-দুটো খঙ্গ উঁচিয়ে হঠাৎ ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে প্রান্তরের মাঝখানে আত্মপ্রকাশ করে দ্বি-খড়গী গণ্ডার এবং মাথায় শিঙের সঙিন চড়িয়ে নির্ভয়ে বিচরণ করে যেসব ভয়ংকর কেপ বাফেলো শক্তির দম্ভে তারা দুনিয়ার কাউকে পরোয়া করে না।
