জাহাজের অফিসার বাঘের সান্নিধ্য পছন্দ করলেন না, চটপট খাপ থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে গুলি চালিয়ে দিলেন।
গুলি বাঘের দেহ স্পর্শ করল না বটে কিন্তু ভদ্রলোকের নিশানা একেবারে ব্যর্থ হয়েছে এ কথা বলা যায় না, কারণ ডেকের অপর প্রান্তে অবস্থিত বিড়ালটা গুলি খেয়ে মারা পড়ল তৎক্ষণাৎ!
রিভলভারের গর্জন এবং চকিত অগ্নিশিখার অভ্যর্থনা বাঘের ভালো লাগল না, গম্ভীর ভাবে স্থান ত্যাগ করে সে অন্যদিকে চলে গেল, ভদ্রলোকও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।
ক্যাপ্টেন এবং উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা এইবার জন্তুগুলোকে বন্দি করার উদযোগ করলেন। মি. দেওয়ার নামক জনৈক ইঞ্জিনিয়ার বাঘ-ভালুকদের দড়ির ফাস বা ল্যাসো দিয়ে ধরতে চাইলেন। কিন্তু জাহজের সারেং বাঘ দুটিকে ধরার জন্য যে উপায় অবলম্বন করল সেটা হচ্ছে আরও নিরাপদ আরও সুন্দর। তার পরামর্শ অনুযায়ী জাহাজের ছুতোরকে দিয়ে একটা মজবুত খাঁচা তৈরি করানো হল, তারপর খাঁচার ভিতর রেখে দেওয়া হল ভেড়ার মাংস। কিছুক্ষণের মধ্যে মাংসের লোভে দুটি বাঘই খাঁচার ভিতর প্রবেশ করল এবং নাবিকরা যে সঙ্গে সঙ্গে খাঁচার দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল সেটা অবশ্য বলাই বাহুল্য।
বাঘ দুটিকে যখন বন্দি করা হচ্ছিল তখন দুটি ভালুকই আগ্রহের সঙ্গে নাবিকদের কার্যকলাপ লক্ষ করছিল। জাহাজের ছুতোর এইবার খুব পুরু কাঠের সাহায্যে একটা উঁচু ও মজবুত পাঁচিল তৈরি করে ফেলল এবং সেই কাষ্ঠ প্রাচীরের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে নাবিকরা সবাই মিলে প্রাচীরটাকে ঠেলতে ঠেলতে অধিকাংশ জন্তুকেই কোণঠাসা করে ফেলল। সেখান থেকে জানোয়ারগুলিকে তাড়িয়ে খাঁচায় বন্ধ করতে বিশেষ অসুবিধা হয় নি। কিন্তু একটা ভালুক কাষ্ঠ প্রকারের উপর দিয়ে প্রকাণ্ড লাফ মেরে পাঁচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল।
পলাতক ভালুকটাকে বন্দি করার জন্য দড়ির ফাস হাতে এগিয়ে এলেন মি. দেওয়ার। কিন্তু গলায় ফাস পড়তেই ভালুকটা ছুটতে শুরু করল এবং দড়ি হাতে মি. দেওয়ার হলেন ডেকের উপর লম্বমান!
ভালুকের প্রবল আকর্ষণে ডেকের উপর শায়িত অবস্থায় গড়াতে লাগলেন মি. দেওয়ার। ডেকের উপর গড়াগড়ি দিতে মি. দেওয়ারের ভালো লাগেনি বলাই বাহুল্য, এমন অবস্থায় পড়লে যে কোনো ভদ্রলোক যা করে তিনিও তাই করলেন অর্থাৎ দড়িটা হাত থেকে ছেড়ে দিলেন। বন্ধনমুক্ত হয়েই ভাল্লুক চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল এবং একটু দূরেই জাহাজের রাঁধুনিকে দেখে তার দিকেই তেড়ে গেল। রাঁধুনি-বেচারা মজা দেখতে এসেছিল, ভালুকটা যে মি. দেওয়ারের দড়ির ফাঁস থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে একথা তার মনেই হয়নি। রাঁধুনির হাতে ছিল এক হাঁড়ি তরল ও উত্তপ্ত সিদ্ধ চর্বি। ভালুককে তেড়ে আসতে দেখেই সে আর্তনাদ করে চর্বির হাঁড়ি ফেলে চম্পট দিল। ভালুক রাঁধুনিকে নিয়ে মাথা ঘামাল না, জাহাজের ডেকের উপর যেখানে হাঁড়ির থেকে গরম চর্বি গড়িয়ে পড়ছিল তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল সেই দিকে। জন্তুটার বোধ হয় খুব খিদে পেয়েছিল, সে এক হাঁড়ি চর্বি উদরস্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ইতিমধ্যে মি. দেওয়ার নিজেকে সামলে নিয়েছেন এবং দড়ির ফঁসটা নিয়ে আবার অগ্রসর হয়েছেন ভালুকের দিকে। এইবার তিনি যথেষ্ট সাবধান হয়েছিলেন, তাই ভাল্লুকটা প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজেকে মুক্ত করতে পারল না। জন্তুটা অত্যন্ত ভীষণভাবে মি, দেওয়ারকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সমবেত নাবিকদের সাহায্যে মি. দেওয়ার তাকে খাঁচার ভিতর বন্দি করে ফেললেন।
বাঘ-ভালুক প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগুলো আবার বন্দি হল বটে কিন্তু বানরের দল তখনও ধরা পড়েনি। অনেক কষ্টে বাঁদরগুলিকেও নাবিকরা বন্দি করল বটে কিন্তু একটা হতচ্ছাড়া বাঁদর সবাইকে ফাঁকি দিয়ে জাহাজের উপর মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। কোনো রকমেই তাকে ধরতে না পেরে ক্যাপ্টেন সাহেব ঘোষণা করলেন অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পৌঁছোনোর আগেই বাঁদরটাকে জীবিত অথবা মৃত যে কোনো অবস্থাতেই তোক ধরতে হবে। আদেশটা খুব নিষ্ঠুর মনে হলেও ক্যাপ্টেনকে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ কোনো বন্য প্রাণীকে মুক্ত অবস্থায় জাহাজের উপর বিচরণ করতে দেখলে অস্ট্রেলিয়ার আইন জাহাজের কর্তৃপক্ষকে ক্ষমা করবে না এবং সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সবচেয়ে বেশি দায়ী হবেন স্বয়ং ক্যাপ্টেন।
অতএব দেখা যাচ্ছে ক্যাপ্টেন বাঁদরটার সম্বন্ধে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে জন্তুটা অবশ্য ধরা পড়েছিল, তাকে গুলি করে মারার দরকার হয়নি। বাঁদরটাকে ধরতে গিয়ে যে সব ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ একটি ঘটনার বিবরণী দিয়ে এই কাহিনিটি আমি শেষ করব…
সবে ভোর হয়েছে। অন্ধকার তখনও পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় গ্রহণ করেনি, আকাশের পূর্ব প্রান্তে জেগে উঠেছে রক্তিম আলোকের আভাস…
সূর্য উঠতে তখনও বেশ দেরি আছে।
এমন সময়ে ডেকের উপর এসে দাঁড়ালেন মি. দেওয়ার এবং একজন অফিসার। তারা দুজনে নিজেদের মধ্যে নিম্নস্বরে কথাবার্তা বলছিলেন, অকস্মাৎ জাহাজের অপর প্রান্ত থেকে এল এক নিদারুণ আর্তনাদ!
কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে একটু এগিয়ে যেতেই তাদের চোখে পড়ল দ্রুতবেগে ধাবমান একটা সাদা টুপি এবং সাদা অ্যাপ্রন! প্রথমটা চমকে গেলেও খানিক পরেই তারা বুঝলেন একটি মানুষ তাদের দিকে ছুটে আসছে। লোকটির দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্ধকারের গর্ভে আদৃশ্য, দৃষ্টিগোচর হচ্ছে কেবল সাদা টুপি আর সাদা অ্যাপ্রন। ধাবমান মানুষটি নিকটবর্তী হতেই মি. দেওয়ার ও তার সঙ্গী তাকে চিনতে পারলেন।
