সকাল বেলা নাবিকরা যখন দেখল ব্যাজারের শূন্য পিঞ্জর অটুট অবস্থায় বিরাজ করছে এবং কোয়েল পাখির ভাঙা খাঁচার ভিতর রাশি রাশি পালক ছাড়া একটি পাখিরও অস্তিত্ব নেই, তখনই তারা সমস্ত ব্যাপারটা অনুমান করে নিল খুব সহজেই।
হত্যাকারীদের খোঁজ পড়ল তৎক্ষণাৎ কিন্তু ব্যাপারটা যত সহজ বলে প্রথমে মনে হয়েছিল, পরে দেখা গেল সেটা তত সহজ নয়। ব্যাজার নামক জটিকে অত্যন্ত হিংস্র না বলতে পারলেও তাকে নিতান্ত নিরীহ বলা চলে না। এই ছোটোখাটো মাংসাশী জানোয়ারটিকে শ্বপদ-গোষ্ঠীর মধ্যে গণ্য করলে খুব ভুল হয় না এবং নখদন্তে সজ্জিত এই জীবটি তার অস্ত্র সম্বন্ধে অতিশয় সচেতন। অতএব ব্যাজার খুঁজতে গিয়ে নাবিকরা যে খুব অস্বস্তি বোধ করছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এরইমধ্যে জনৈক নাবিক একটা ব্যাজারকে কোণঠাসা করে ফেলল কিন্তু শয়তান জানোয়ারটা নাবিকটির মুখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাঁসকরে উঠতেই লোকটি চমকে উঠে পথ ছেড়ে দিল এবং পরক্ষণেই তিরবেগে ব্যাজারটা স্থানত্যাগ করে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।
নাবিকটি আর ব্যাজারের পিছনে ছুটতে রাজি হল না, সে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিল যে ব্যাজার-শিকার নাবিকের কর্তব্য নয়।
যখন এই ঘটনা ঘটে জাহাজ তখন ভূমধ্যসাগরের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে। পরবর্তী ঘটনার সূত্রপাত হল ভারত মহাসাগরের বুকে।
ফোর্সডেল জাহাজ যখন ভারত সাগরের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে, তখন দেখা গেল ভালুক দুটি হঠাৎ খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
ভারত সাগরের উষ্ণ আবহাওয়া জানোয়ার দুটি পছন্দ করল না, খেপে গিয়ে তার বারবার আঘাত হানতে লাগল খাঁচার উপর। জাহাজের অফিসাররা জাহাজ পরিচালনার কার্যে খুবই নিপুণ ছিলেন, কিন্তু ভাল্লুকের শক্তি ও খাঁচার দৃঢ়তা সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান ছিল নিতান্তই সীমাবদ্ধ। অতএব বারংবার আঘাতের ফলে দুর্বল খাঁচাটা যে আরও-দুর্বল হয়ে এক সময়ে ভেঙে যেতে পারে এমন ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা তাদের মনেই হয় নি…
অবশেষে এক রাত্রে ভালুকদের মিলিত আক্রমণের মুখে খাঁচা গেল ভেঙে এবং বন্দিরা মুক্তিলাভ করে পরম-আনন্দে জাহাজের বিভিন্ন স্থানে টহল দিতে শুরু করল।
জনৈক নাবিক ওই সময়ে ডেকের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, আচম্বিতে তার সম্মুখে আবির্ভূত হল দুটি চলমান ছায়া!
রাত্রির অন্ধকার যাদের ছায়ার রূপ দিয়েছে তাদের দেখে নাবিকটি ভুল করল না– ওই ছায়ার সঙ্গে দু-দুটি ভাল্লুককে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অত্যন্ত নিরেট দুটি কায়ার অস্তিত্ব অনুমান করে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে।
ক্যাপ্টেনের এক সহকারী উপরের ডেকে বসে কফির পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিলেন, হঠাৎ নীচের ডেক থেকে ঝড়ের বেগে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এসে হাজির হল পূর্বোক্ত নাবিক। সহকারীটি নাবিকের মুখে ভাল্লুক-ঘটিত সমাচার শ্রবণ করলেন; তৎক্ষণাৎ তার মনে পড়ল জাহাজের দিক-নির্ণয় যন্ত্র বা কম্পাসটা এই মুহূর্তে পরিদর্শন না করলে কর্তব্যের হানি হবে এবং ভালুকদের খবরে কিছুমাত্র কৌতূহল প্রকাশ না করে যথাসম্ভব দ্রুতবেগে তিনি কম্পাসের প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করতে বলে গেলেন।
ইতিমধ্যে নাবিকটিকে অনুসরণ করে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে একটি ভালুক। খুব সম্ভব লোকটির সঙ্গে সে আলাপ করতেই চেয়েছিল, কারণ ভালুকের আচরণে নির্দোষ কৌতূহল ছাড়া কোনো বিরূপ-ভাব প্রকাশ পায় নি। নাবিকটি কিন্তু চতুস্পদ সহযাত্রীর সদিচ্ছায় বিশ্বাস করতে পারল না, তার চোখে-মুখে ফুটল দারুণ আতঙ্কের আভাস।
ভালুকটা বোধহয় নাবিকের ভাবভঙ্গিতে তার মনোভাব অনুমান করতে পেরেছিল; সে বুঝে নিল এই ভীরু অসামাজিক মানুষটা তার বন্ধুত্বের যোগ্য নয়। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাবিকের সান্নিধ্য ত্যাগ করে ভাল্লুক সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল সঙ্গীর কাছে।
ইতিমধ্যে বেজে উঠেছে জাহাজের বিপদ-জ্ঞাপক ঘণ্টা এবং নাবিকরা সকলেই এসে উপস্থিত হয়েছে অকুস্থলে। ভালুক দুটিকে দেখে নাবিকরা বিশেষ ভয় পায়নি, বরং তাদের মধ্যে একটা মজা দেখার মনোভাবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এমন গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হল যে আনন্দের পরিবর্তে নাবিকদের মধ্যে সঞ্চারিত হল অস্বস্তি ও আতঙ্ক।
একটি ভালুক হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বাঘের খাঁচার উপর আক্রমণ চালাল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খাঁচা ভেঙে গেল এবং ডোরাকাটা জানোয়ার দুটি জাহাজের সর্বত্র পায়চারি করতে লাগল। মনে হল সমুদ্রের মুক্ত বায়ু তারা দস্তুর মতো উপভোগ করছে। কিন্তু এক জোড়া ভালুক এবং দু-দুটি বাঘের সাহচর্য নাবিকদের কাছে মোটেই উপভোগ্য হয় নি শাপদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের নীতিতে তারা আদৌ বিশ্বাসী নয়।
ক্যাপ্টেনের আদেশে অফিসাররা বন্দুক-রিভলভার নিয়ে নাবিকদের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হলেন।
বাঘদের মুক্তি দিয়ে ভালুকরা ক্ষান্ত হল না, চটপট আরও কয়েকটা খাঁচার উপর আক্রমণ চালিয়ে তারা অনেকগুলো জানোয়ারকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়ে জাহাজটাকে করে তুলল বন্য পশুদের বিচরণ ভূমি!…
একটা বাঘ হঠাৎ তার আশে-পাশে অবস্থিত দ্বিপদ জীবদের বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠল। ডেকের উপর দণ্ডায়মান এক অফিসার সচমকে দেখলেন তার দিকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে এক বিপুলবপু ব্যাঘ্র!
