শব্দটা বিলের খুবই পরিচিত, নিকটবর্তী সমুদ্রের বুকে ধাবমান মোটর-চালিত ক্রুজারের ইঞ্জিন থেকেই যে ওই শব্দটা ভেসে আসছে এ বিষয়ে বিলের কিছুমাত্র সন্দেহ ছিল না। সে তাড়াতাড়ি ছুটে একটা বড় পাথরের উপর উঠে দাঁড়াল, তারপর রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে আর চিৎকার করে ক্যাপ্টেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে লাগল।
এই সময় হঠাৎ পিছন থেকে অতর্কিতে আক্রান্ত হয়ে বিল যে পাথরের উপর থেকে নীচের জমিতে পড়ে যায় সে কথা বর্তমান কাহিনির গোড়ার দিকেই বলা হয়েছে। পরবর্তী অবস্থায় আক্রমণকারী বরাহ বিলের রাইফেলের গুলিতে আহত হয়েও যখন তার দিকে তেড়ে আসে, তখন দ্বিতীয়বার গুলি চালানোর সুযোগ না পেয়ে বিল যে রাইফেলটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করেছিল এবং অস্ত্রটার যে বাঁট ভেঙে গিয়েছিল একথাও কাহিনির প্রথম দিকেই বলা হয়েছে।
এইবার দেখা যাক নিরস্ত্র শিকারি ও আহত বরাহের দ্বযুদ্ধের পরিণাম কি হয়।
শূকরটা এগিয়ে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু সামনের দুটি পা জখম হওয়ায় ভারসাম্য রাখতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। অবশ্য তৎক্ষণাৎ সে আবার উঠে দাঁড়াল। ইতিমধ্যে বিলের মনে পড়ে গেছে কোমরের খাপে আটকানো ছোরার কথা, চট করে খাপ থেকে হান্টিং নাইফ খুলে সে প্রস্তুত হল।
শুকর আবার আক্রমণ করল। তার প্রকাণ্ড মুখটা সবেগে এগিয়ে এল শত্রুর দিকে কিন্তু ভয়ংকর চোয়াল দুটো নরদেহের পরিবর্তে শূন্যতাকেই আবিষ্কার করল।
বিল তখন বরাহের পিঠের উপর দিয়ে এক প্রকাণ্ড লাফ দিয়েছে এবং শূন্যের উপরেই শরীরটা ঘুরিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে শুকরের পৃষ্ঠদেশে!
বিল যেন হঠাৎ পাগল হয়ে গেল। এক হাতে জন্তুটাকে আঁকড়ে ধরে অন্যহাতে সে উন্মাদের মতো ছুরি চালাতে লাগল শূকরের গলায়, পাঁজরে, বুকে…
প্রাণহীন রক্তাক্ত মৃতদেহটা ফেলে দিয়ে বিল উধশ্বাসে ছুটল সমুদ্রের দিকে। দারুণ উত্তেজনায় তার সমগ্র চৈতন্য তখন আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, প্রায় কোমর-জল পর্যন্ত পৌঁছে সে অনুভব করল, এক জোড়া বলিষ্ঠ বাহু তাকে জড়িয়ে ধরেছে।
ক্রুজারের আরোহীরা বিলের রাইফেলের শব্দ শুনতে পেয়েছিল এবং তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজ থামিয়ে একটা ডিঙি ভাসিয়ে আসছিল দ্বীপের দিকে। ওইডিঙি থেকে নেমে এক জন ধীবর প্রায়-অচেতন বিল ব্রায়ান্টকে জড়িয়ে ধরেছিল। পূর্বোক্ত ক্রুজার মাছ ধরার কার্যে নিযুক্ত ছিল, বিলকে তুলে নিয়ে মাছধরা ক্রুজারটি আবার তার নির্দিষ্ট পথে যাত্রা করল।
ভাসমান চিড়িয়াখানা
১৯২৮ সাল।
এস এস ফোর্সডেল নামক জাহাজটি ছুটে চলেছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দিকে।
জাহাজের খোলা ডেকের উপর প্রকাশ্য স্থানে কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই, কিন্তু একটু নজর করলেই দেখা যায় বিভিন্ন গোপনীয় স্থানে গা-ঢাকা দিয়ে নাবিকরা চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আতঙ্কের আভাস।
আতঙ্কের কারণ খুব স্পষ্ট। জাহাজের সর্বত্র পদচালনা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ভাল্লুক-দম্পতি এবং একজোড়া ভীষণ-দর্শনবাঘ! শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখেও নাবিকরা আশ্বস্ত হতে পারছে না, তারা দূর থেকেই উঁকিঝুঁকি মারছে কাছে এসে শ্বাপদের অহিংসায় বিশ্বাস স্থাপন করতে তারা রাজি নয়!
বাঘ-ভালুক ছাড়া আরও যে-সব জন্তু জাহাজের উপর এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একদল বাঁদর, কয়েকটি ব্যাজার নামক ভোঁদড় জাতীয় প্রাণী এবং একটি তুষার-চিতা।
সমুদ্রের উপর ভাসমান জাহাজের উপর হঠাৎ এতগুলো বন্যপশুর আবির্ভাবের কারণ জানতে হলে আমাদের পাঠ করতে হবে জনৈক প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতার কাহিনি…
উক্ত প্রত্যক্ষদর্শীর লিখিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, এস এস ফোর্সডেল নামক জাহাজটি লন্ডনের চিড়িয়াখানা থেকে অনেকগুলো বন্য পশু নিয়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাত্রা করে। বন্দি পশুদের মধ্যে ছিল একজোড়া বিশাল ভালুক, একটি অজগর সাপ, একটি প্যান্থার, তুষার-চিতা, কয়েকটি ব্যাজার, একদল বাঁদর, বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং এক জোড়া ভীষণ দর্শন বাঘ।
পিঞ্জর-আবদ্ধ পশুদের পর্যবেক্ষণ করে জাহাজের ক্যাপ্টেনের ধারণা হল জন্তুগুলোকে ধরে রাখার পক্ষে খাঁচাগুলো যথেষ্ট মজবুত নয়। ক্যাপ্টেনের প্রধান সহকারীও তাঁর সঙ্গে একমত হল কিন্তু অভিজ্ঞ নাবিকরা ক্যাপ্টেনের সন্দেহ অমূলক বলে তাকে আশ্বস্ত করল। নাবিকরা ক্যাপ্টেনকে জানাল যে এই ধরনের খাঁচায় বড়ো বড়ো জানোয়ার তারা ইতিপূর্বে বহু বার চালান দিয়েছে, খাঁচা ভেঙে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে তারা কখনো দেখেনি, অতএব ক্যাপ্টেন সাহেবের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
পরবর্তীকালে অবশ্য প্রমাণ হয়েছিল যে ক্যাপ্টেনের সন্দেহ নিতান্ত অমূলক ছিল না।
গোলমাল শুরু হল প্রথমে ব্যাজারদের নিয়ে। ভোঁদড়ের মতো আকৃতিবিশিষ্ট এই ক্ষুদ্রাকায় মাংসাশী প্রাণীগুলো এক রাতে হঠাৎ খাঁচার ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং কোয়েল পাখির খাঁচার উপর আক্রমণ চালিয়ে খাঁচা ভেঙে অসহায় পাখিগুলোকে উদরস্থ করে ফেলল।
ব্যাজারগুলো পাখির খাঁচা ভেঙেছিল বটে, কিন্তু নিজেদের খাঁচা তারা ভাঙতে পারে নি। লোহার গরাদের ভিতর দিয়ে শরীর গলিয়ে তারা মুক্তিলাভ করেছিল। এই ঘটনা থেকেই বোঝ যায় যারা খাঁচাগুলি তৈরি করিয়েছিল, তারা সমস্ত ব্যাপারটার গুরুত্ব উপলব্ধি করেনি।
