দ্বীপের সামনে বেলাভুমির কাছে হালকা ঘাসজমি ভিতর দিকে ক্রমশ নিবিড় অরণ্যে পরিণত হয়েছে এবং চতুর্দিকে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ছোটোবড়ো পাথর ও পাহাড়। এক জায়গায় নরম মাটির উপর শূকরের খুরের চিহ্ন বিলের দৃষ্টিগোচর হল। এই দ্বীপে যে শূকরের অস্তিত্ব আছে সে বিষয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ রইল না। একটা পাহাড়ের উপর উঠে বিল চারদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে সব কিছুই ভুলিয়ে দিল।
বেলাভূমির উপর আছড়ে পড়ছিল সাগরের ঢেউ আর মুক্তপ্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে সেই অপুর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করছিল বিল- হঠাৎ একটা পাখির দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল।
পাখিটা হচ্ছে সী-গল নামক এক ধরনের সামুদ্রিক চিল। বালির উপর ধীরে ধীরে পা চালিয়ে ঘুরছিল পাখিটা, তার একটু দূরেই পড়েছিল কয়েকটা বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড। পাখিটা নীচু হয়ে মাটি থেকে কিছু একটা ঠোঁট দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করল আর ঠিক সেই মুহূর্তে পাথরের নীচে ছায়ায়-আচ্ছন্ন অন্ধকার যেন অকস্মাৎ জীবন্ত হয়ে ছুটে এল!
বিল সচমকে দেখল একটা ধূসর বাদামি চতুম্পদ দেহ পাথরগুলোর তলা থেকে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পাখিটার উপর। একটা আর্ত চিৎকার করেই পাখিটা স্তব্ধ হয়ে গেল, এক জোড়া নিষ্ঠুর চোয়াল তাকে সজোরে চেপে ধরেছে।
বিল প্রথমে ভেবেছিল ওটা একটা নেকড়ে কিন্তু একটু পরেই তার ভুল ভেঙে গেল। নেকড়ের মতোই হালকা ছিপছিপে পেশীবহুল দেহ এবং নেকড়ের মতোই বাদামি-ধূসর দেহবর্ণের অধিকারী হলেও জন্তুটা নেকড়ে নয়- শূকর।
শূকরের এমন হিংস্র ভয়ংকর চেহারা বিল কখনো কল্পনা করতে পারেনি। দারুণ বিস্ময়ে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল জনশ্রুতি তা হলে মিথ্যা নয়।
আচম্বিতে বিলের পিছন থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দের তরঙ্গ! খট-খট-খট-খট শব্দে পাথুরে মাটিতে খুর বাজাতে বাজাতে যেন ছুটে আসছে কয়েকটা ঘোড়া তারই দিকে!
বিল পিছন ফিরে চাইল না- শব্দের উৎপত্তির কারণ যে ধাবমান অশ্বখুর নয় এটুকু বুঝতে তার একটুও দেরি হয় নি সামনে যে গাছটা ছিল চটপট হাত-পা চালিয়ে বিল সেটাতেই উঠে পড়ল।
ভালোই করেছিল, কারণ বিল গাছে উঠতে না উঠতেই সেখানে এসে উপস্থিত হল ছয়-ছয়টা শূকর!
একটা গাছের ডালে বসে পা দুটোকে বিল ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কয়েকটা মাংস-লোলুপ বরাহ সেই দোদুল্যমান পা দুটিকে লক্ষ্য করে লাফ দিল। তাদের চেষ্টা অবশ্য ব্যর্থ হল, কারণ গাছটা খুব বড়ো না হলেও বিল শুকর বাহিনীর নাগালের বাইরে অবস্থান করছিল। কয়েকটা জন্তু ব্যর্থ আক্রোশে গাছটাকে আক্রমণ করল, দীর্ঘ দন্তের আঘাতে কয়েক জায়গায় গাছের ছাল উঠে গেল।
দারুণ আতঙ্কে বিলের বুকের ভিতর দপ দপ করছিল, নিজেকে সামলে নিয়ে সে রাইফেল বাগিয়ে ধরল।
গর্জে উঠল রাইফেল, আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল দুটি শূকর। অন্যান্য শুকরগুলি তৎক্ষণাৎ আহত সঙ্গীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, ধারালো দাঁতের আঘাতে আহত জন্তু দুটিকে টুকরো টুকরো করে শূকরগুলি স্বজাতির মাংসে বীভৎস ভোজসভা বসিয়ে দেওয়ার আয়োজন করল।
কিন্তু জন্তুগুলি তাদের ভয়াবহ ক্ষুধা পরিতৃপ্ত করার সুযোগ পেল না, ঘন ঘন গর্জনে বারংবার অগ্নিবৃষ্টি করল শিকারির রাইফেল, একে একে সব কয়টি শুকরই গুলি বিদ্ধ হয়ে প্রাণবিসর্জন দিল।
বিল এইবার গাছের আশ্রয় ছেড়ে মাটিতে অবতীর্ণ হল। তার অ্যাডভেঞ্চার করার শখ মিটে গিয়েছিল, অত্যন্ত সাবধানে ভয়ে ভয়ে সে নৌকোটার দিকে এগিয়ে চলল। ঘন ঘাসঝোঁপ ও জঙ্গলের রাস্তায় সে পা দিল না, যত দূর সম্ভব ফাঁকা জায়গার উপর দিয়েই সে পদচালনা করছিল।
নৌকোটা তার দৃষ্টিপথে আসতেই বিল চমকে উঠল। সাত-সাতটা শূকর হানা দিয়েছে তার নৌকোটার উপর! জন্তুগুলো চিৎকার করছে, গর্জন করছে এবং ধারালো ছোরার মতো দাঁত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলছে নৌকোর উপর অবস্থিত যাবতীয় সামগ্রী!
দারুণ ক্রোধে বিল হাতের রাইফেল তুলে ধরল। কিন্তু ক্রোধ তার চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে দিতে পারে নি, ঠান্ডা মাথায় লক্ষ্যস্থির করে সে গুলি চালাতে লাগল শূকরগুলির উপর।
এক-একটা শূকর গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য জন্তুগুলি আহত সঙ্গীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করতে থাকে।
আবার গর্জে ওঠে রাইফেল, আর একটি শূকরও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে সঙ্গীদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং গর্জিত রাইফেলের অগ্নিবৃষ্টির কল্যাণে একই ঘটনার হয় পুনরাবৃত্তি।
এই ভাবে একে একে সাতটি জানোয়ারই গুলি খেয়ে মারা পড়ল। বিল তখন ছুটে এল নৌকোটার দিকে। নৌকোর দশা দেখে বিলের কান্না পেল। খাবার-দাবার, জিনিসপত্র সব কিছুই হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন, নৌকোটাও অব্যাহতি পায়নি– ধারালো দাঁতের আঘাতে আঘাতে নৌকোটা টুকরো টুকরো কাঠের স্তূপে পরিণত হয়েছে, সেটাকে আর নৌকো বলে চেনা যায় না!
বিল ব্রায়ানট বুঝল, সে ফাঁদে পড়ে গেছে, নৌকো ছাড়া সমুদ্রের বুকে পাড়ি দেওয়ার উপায় নেই। দ্বীপের ভিতর রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যর মতো শুকরের দল এবং তার কাছে রাইফেলের টোটা আছে মাত্র চারটি। একটি টোটা রাইফেলে ভরা ছিল, বাকি তিনটি অবস্থান করছিল তার পকেটের মধ্যে। বিল দাঁড়িয়ে ভাবছে, হঠাৎ তার কানে এল একটা যান্ত্রিক শব্দ মোটর!
