মৃত শুয়োরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে দুটি অদ্ভুত দানবাকৃতি সরীসৃপ; তাদের ওজন আনুমানিক ২০০ পাউন্ড, শরীরের দৈর্ঘ্য ১২ ফুটের মতন এবং চারটি পায়ে রয়েছে লম্বা লম্বা ধারাল নখ! লম্বা ঘাড়ের উপর বসানো মাথা দুটি গিরগিটির মত বাস্তব জগতে এমন অবিশ্বাস্য শরীরী বিভীষিকার অস্তিত্ব কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি মাইকেল!
শিকারিদের স্তম্ভিত দৃষ্টির সম্মুখে একটা ড্রাগন শুয়োরের দেহটাকে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল এবং কুকুর যেমন ইঁদুরকে ধরে ঝাঁকায়, তেমনিভাবেই ঝাঁকাতে শুরু করল। শক্ত চামড়া ভেদ করে ধারাল দাঁতের সারি মাংসের মধ্যে প্রবেশ করতেই নাড়িভুঁড়িগুলো ছিটকে পড়তে লাগল বিদীর্ণ দেহের ভিতর থেকে। ড্রাগন এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে গিলে ফেলল, তারপর আবার কামড়ে ধরল শুয়োরটাকে। দ্বিতীয় ড্রাগনটাও এগিয়ে এসে শূকর-মাংসের ভোজে যোগ দিল…
ভোজে মত্ত ড্রাগন দুটির চোখের আড়ালে ঝোঁপঝাড়ের ভিতর আত্মগোপন করে ঘেরা জায়গাটার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল মাইকেল আর আমাসি। ওই ঘেরা জায়গাতেই রাতের আহারের জন্য তারা রেখে গিয়েছিল শুয়োরের একটি পা। কোনোরকমে পাথর আর গাছ দিয়ে ঘেরা ওই জায়গাটার ভিতরে ঢুকে পড়তে পারলেই কিছুক্ষণের জন্য তারা নিরাপদ। যখন তারা ওই জায়গাটার পাঁচ গজের মধ্যে এসে পড়েছে, সেই সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়াল আমাসি এবং তিরবেগে দৌড়ে গিয়ে এক লাফে বড়ো বড়ো পাথরগুলো ডিঙিয়ে ঘেরা জায়গাটার ভিতর মাইকেলের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভোজে লিপ্ত ড্রাগনদের। দৃষ্টিসীমার অন্তরালে তাড়াতাড়ি আত্মগোপন করার জন্যই ওইভাবে ছুটে গিয়েছিল আমাসি। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হল না- ঘেরা জায়গাটার ভিতর থেকে একটা তীব্র আর্তনাদ ও ঘন ঘন চাপা গর্জনধ্বনি ভেসে আসতেই মাইকেল বুঝতে পারল তার চোখের আড়ালে ঘেরা-জায়গাটার ভিতর কি ঘটেছে– আমাসি ছুটে গিয়ে পড়েছে তিন নম্বর ড্রাগনের মুখে! তৃতীয় ড্রাগনটা গোপন স্থানে শুয়োরের ঠ্যাংটাকে আবিষ্কার করে মনের আনন্দে ভোজনপর্ব সমাধা করছিল, অজ্ঞাতসারে তার কবলেই গিয়ে পড়েছে বেচারা আমাসি।
ভয়ের ধাক্কা সামলে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেলল মাইকেল। পৃথিবী যেন তার চোখের সামনে পিছিয়ে গেল কয়েক লক্ষ বৎসর, সেই আদিম পৃথিবীর প্রস্তরযুগে এক আদিম মানবযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে এক দানব-সরীসৃপের বিরুদ্ধে হাতে তার রাইফেলের পরিবর্তে রয়েছে মুগুর! আদিম মানুষের মতোই হাতের রাইফেলকে মুগুরের মতন বাগিয়ে ধরে পাথরের সারির উপর লাফিয়ে উঠল মাইকেল এবং দেখতে পেল ড্রাগনের গ্রাসে ছটফট করছে আমাসি!
এক লাফে ঘেরা জায়গাটার ভিতর নেমে এসে সমস্ত শক্তি দিয়ে রাইফেলের বাঁট ঘুরিয়ে ড্রাগনের মাথায় সজোরে আঘাত হানল মাইকেল। তৎক্ষণাৎ ভয়ংকর চোয়াল দুটি ফাঁক হয়ে ঝকঝক করে উঠল ধারাল দাঁতের সারি এবং সামনের একটা নখরযুক্ত থাবা বিদ্যুৎবেগে ছোবল মারল– রক্তাক্ত হয়ে গেল মাইকেলের বাঁ দিকের কাঁধ। সেই আঘাত সামলে ওঠার আগেই আবার আক্রমণ করল ড্রাগন, তার সুদীর্ঘ লাঙ্গুল চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মাইকেলের দেহে, সঙ্গে সঙ্গে মাইকেল হল ধরাপৃষ্ঠে লম্বমান। মুহূর্তের মধ্যেই ধরাশয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল মাইকেল; শূন্যগর্ভ রাইফেল ফেলে দিয়ে কটিবন্ধ থেকে আমাসির ছোরাটাকে টেনে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল ড্রাগনের পরবর্তী আক্রমণে জন্য।
ড্রাগন তখনই আক্রমণ করল না, তার ভাবভঙ্গি দেখে মাইকেল বুঝল রাইফেলের বাঁট সাময়িকভাবে জন্তুটাকে বিহ্বল করে দিয়েছে। ছোরা বাগিয়ে ধরে প্রস্তুত হল মাইকেল, ড্রাগন আক্রমণ করলেই সে ছোরা চালাবে মনে মনে সে প্রার্থনা করতে লাগল হতচ্ছাড়া জন্তুটা যেন পালিয়ে যায়।
কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল, তার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিল না মাইকেল। আমাসি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাতের বর্শাটাকে সজোরে ঢুকিয়ে দিল ড্রাগনের পাঁজরে! জন্তুটা লাফিয়ে উঠল, তার সুদীর্ঘ লাঙ্গুল প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ল আমাসির দেহে ছিটকে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল আমাসি।
ছোরা তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাইকেল, অন্ধের মতো আঘাত করতে লাগল ড্রাগনের ঘাড়ে, পাঁজরে এবং একসময়ে দু-হাতে ছোরাটাকে ধরে সজোরে বসিয়ে দিল দানবের মাথার খুলিতে– পরমুহূর্তেই মাইকেলের শরীরটা একটা ক্ষুদ্র পাথরের টুকরোর মতো ঠিকরে উঠে গেল শুন্যে, তারপর সশব্দে শয্যাগ্রহণ করল ধরাপৃষ্ঠে!
নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মাইকেল, আমাসির একটা পা ধরে তাকে তাড়াতাড়ি টেনে নিয়ে এল নিরাপদ দূরত্বে মরণাহত সরীসৃপ তখন ছটফট করছে মৃত্যুযাতনায়।
কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে পেল আমাসি। দুজনে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত শরীরে টলতে টলতে ফিরে চলল নৌকোর দিকে…
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাসির খোঁজ নিয়েছিল মাইকেল, কিন্তু তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভন ইভেনের মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গিয়েছিল। বাজোড়া হয়ত আজও বেঁচে আছে, তবে কোথায় আছে কে জানে!….
অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনও মাঝে মাঝে ড্রাগনের স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মধ্যে হানা দেয় ঘুম ভেঙে উঠে বসে টেরি মাইকেল, দারুণ আতঙ্কে ঘর্মাক্ত হয়ে যায় সর্বাঙ্গ।
বিভীষিকার দ্বীপ
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত একটি ছোটো নাম-না-জানা দ্বীপের কাছেই সমুদ্রের উপর দেখা দিল একটি মাছ-ধরা জাহাজ। দ্বীপের মধ্যে একটা বড়ো পাথরের উপর হঠাৎ লাফিয়ে উঠল একটি মানুষ, হাতে তার রাইফেল। শূন্যে গুলি ছুঁড়ে লোকটি জাহাজের আরোহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। মনে হল জাহাজের গতি একটু মন্থর হয়েছে। উৎসাহিত হয়ে লোকটি এইবার হাত তুলে চিৎকার করতে লাগল। হঠাৎ লোকটি শুনতে পেল তার পিছনে একটা অস্পষ্ট গর্জনধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শক্ত পাথুরে মাটির উপর জেগে উঠেছে ধাবমান খুরের খট খট শব্দ!
