ওলন্দাজ সরকার ক্যামেরার সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অনুমতি দিয়েছিল। তবে সেটা নিতান্তই আত্মরক্ষার জন্য। শর্ত ছিল সন্ধান পেলে ড্রাগনের ফটো তুলবে মাইকেল, কিন্তু জীবন বিপন্ন না হলে কখনোই বন্দুক ব্যবহার করবে না।
একটা ছোটো উপসাগরের বেলাভূমিতে এসে পৌঁছোল মাইকেল তার সঙ্গীদের নিয়ে। বাজোড়াকে নৌকাতে অপেক্ষা করতে বলে মাইকেল ও আমাসি তীরে পদার্পণ করল। সাগরতীরে বহুদূর পর্যন্ত ঘন ঘাসের রাজত্ব। ওই ঘাসজঙ্গল পেরিয়ে চোখে পড়ে পাহাড়ের সারি এবং ওইসব পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো গাছ, লতাগুল্ম ও ঝোঁপঝাড়।
উপসাগরের তীরবর্তী জল ভেঙে ঘাসবনের ভিতর দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে যাওয়ার পর মাইকেল আর আমাসি যখন দণ্ডায়মান পর্বতমালার খুব কাছে এসে পড়েছে, সেইসময় হঠাৎ ঘাসবনের মধ্যে জাগল প্রচণ্ড আলোড়ন! একদল জীব সশব্দে ছুটে চলেছে দুই শিকারির দুধার দিয়ে লম্বা লম্বা ঘসের আড়ালে চলন্ত জীবগুলিকে শিকারিদের চক্ষু আবিষ্কার করতে পারছে না। তারা কেবল দেখছে তাদের দুই পাশের ঘাসবনের ভিতর আলোড়ন তুলে কারা যেন ছুটছে আর ছুটছে এবং সেই ধাবমান জীবগুলির কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছে কর্কশ ঘুৎকারধ্বনি!
আচম্বিতে মাইকেলের সামনে সুদীর্ঘ ঘাসের জঙ্গল ভেদ করে আত্মপ্রকাশ করল এক বিপুলবপু বরাহ! তার মুখের দুইপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে একজোড়া ছুরির মতো একজোড়া শাণিত দন্ত এবং তার লাল চোখদুটো জ্বলে জ্বলে উঠছে ভীষণ আক্রোশে! ক্রুদ্ধ চিৎকার করে জন্তুটা ছুটে এল শিকারিদের দিকে। আমাসি তার বর্শা উঁচিয়ে ধরল, গর্জে উঠল মাইকেলের হাতের রাইফেল। গুলি খেয়ে শুয়োরটা ছিটকে পড়ল মাটির উপর। মাইকেল আবার গুলি ছোঁড়ার আগেই দৌড়ে গিয়ে শুয়োরের গলায় বর্শা বিধিয়ে দিল আমাসি…
মৃত শূকরের একটা ঠ্যাং কেটে নিয়ে আমাসি বলল, এই ঠ্যাংটা দিয়েই আজ রাতে তোফা ভোজের ব্যবস্থা করব। আর শুয়োরের শরীরটা বোধহয় ড্রাগনদের পছন্দ হবে- কী বলে?
মাইকেল বিবেচনা করে দেখল প্রস্তাবটা মন্দ নয়। পাহাড়ের উপর এক জায়গায় দুজনে মিলে টেনে নিয়ে এল শূকরের মৃতদেহ। তারপর ছুরি দিয়ে জন্তুটার পেট চিরে ফেলল তারা। বিদীর্ণ পাকস্থলী থেকে নির্গত দুর্গন্ধ মাংসলোলুপ ড্রাগনদের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে তাদের অকুস্থলে আকর্ষণ করবে- এই ছিল শিকারিদের আশা। মৃতদেহের খুব কাছেই ঝোঁপঝাড় সমেত পাথর-ঘেরা একটা জায়গা দেখেছিল তারা। ডাগনরা যদি শূকরমাংসের লোভে আকৃষ্ট হয়, তাহলে খুব সহজেই ওই ঘেরা জায়গাটার ভিতর লুকিয়ে বসে ক্যামেরার সাহায্যে তাদের আলোকচিত্র গ্রহণ করতে পারবে মাইকেল।
মাংসের টোপ ফেলে এবার জঙ্গলের কিনারাগুলি পরিদর্শন করতে গেল মাইকেল আর আমাসি। কিছুদূর গিয়ে বনের মধ্যে এক জায়গায় বালির উপর প্রকাণ্ড একটা পায়ের ছাপ দেখতে পেল তারা। পদচিহ্নের সঙ্গে একটা ভারি শরীর টেনে নিয়ে যাওয়ার ছাপও তাদের দৃষ্টিগোচর হল। পৃথিবীর বিভিন্ন অরণ্যে বিভিন্ন হিংস্র পশু শিকার করেছে মাইকেল, কিন্তু ইতিপূর্বে ওই ধরনের কোনো পদচিহ্ন মাইকেলের চোখে পড়েনি। পায়ের ছাপটা দেখলে বোঝা যায় জন্তুটার পায়ে বড়ো বড়ো নখ আছে। মাইকেল বুঝল এটা একটা ড্রাগনের পদচিহ্ন এবং উক্ত চিহ্নের সুগভীর বিস্তার জানিয়ে দিচ্ছে পদচিহ্নের মালিক বিশাল দেহের অধিকারী এক ভয়াবহ দানব!
জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে কখনও কখনও ভাঙাচোরা গাছের ডালের খোঁচা থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য নিচু হয়ে, কখনও বা হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল মাইকেল সেইসময় তার পকেট থেকে কয়েকটা রাইফেলের টোটা নিঃশব্দে পড়ে গেল স্যাৎসেঁতে মাটির উপর। তখন বুঝতে না পারলেও পরে ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছিল সে। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মাইকেল ও আমাসির গতিরুদ্ধ হল– গাছের উপর থেকে লতা বেয়ে তাদের সম্মুখে অবস্থিত ফাঁকা জমির উপর অবতীর্ণ হল এক অতিকায় অজগর!
মাইকেলের রাইফেল ঘন ঘন অগ্নিবৃষ্টি করে সর্পদানবকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল। রাইফেলের শূন্যগর্ভ আবার টোটা দিয়ে পূর্ণ করতে গিয়েই মাইকেল টের পেল তার পকেট ফাঁকা। সেখানে আর একটিও টোটা নেই। এই অবস্থায় আর অগ্রসর না হয়ে তারা নৌকায় ফিরে যাওয়াই উচিত বলে মনে করল। বনের পথে হাঁটতে হাঁটতে নিহত শূকরের মৃতদেহ থেকে প্রায় একশো গজ দুরে তারা যখন এসে পড়েছে সেইসময় আমাসি তার প্রকাণ্ড ছোরাটা খাপ থেকে খুলে মাইকেলের দিকে বাড়িয়ে ধরল। আমাসির মুখের দিকে তাকিয়ে মাইকেল বুঝল তার সঙ্গী ভয় পেয়েছে টোটা নেই, অতএব রাইফেলের অগ্নিবর্ষী মহিমা এখন তাদের রক্ষা করতে পারবে না।
মাইকেল নিজেও ভয় পেয়েছিল, অজানা পায়ের ছাপটা তাকে যথেষ্ট চিন্তায় ফেলেছিল, কিন্তু মুখে সাহস দেখিয়ে সে বলল, আমরা এখন নৌকাতেই ফিরে যাচ্ছি। তবে শুয়োরের ঠ্যাংটা ওখান থেকে নিয়ে যাওয়া দরকার। আমার দারুণ খিদে পেয়েছে।
রক্তাক্ত শুয়োরটা যেখানে পড়েছিল, সেই জায়গাটা থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে এসেই থমকে দাঁড়াল মাইকেল এবং পশ্চাৎবর্তী আমাসিকে একটানে শুইয়ে ফেলে নিজেও শুয়ে পড়ল একটা ঝোপের আড়ালে। মাইকেলের মনে হল জাগ্রত অবস্থাতেই সে দেখছে একটা মারাত্মক দুঃস্বপ্ন
