একশো গজও সে যায়নি, হঠাৎ তার পিছনে শোনা গেল রাইফেলের গর্জন।
চমকে পিছন ফিরতেই সে দেখল, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে একটা চতুষ্পদ দেহ জন্তুটার গায়ে হলুদ চামড়ার উপর বসানো আছে কৃষ্ণবর্ণ চক্রচিহ্ন। লেপার্ড!
রেডমন্ড তৎক্ষণাৎ রাইফেলের ট্রিগার টিপল।
মাটি থেকে ছিটকে ধাবমান দেহটা শুন্যে ডিগবাজি খেয়ে আবার মাটির উপরেই লুটিয়ে পড়ল।
রেডমন্ড ভাবল প্রথম শব্দটা এসেছে টনির রাইফেল থেকে। খুব সম্ভব লেপার্ডকে লক্ষ্য করে টনি রাইফেল ছুঁড়েছিল এবং ভীত জন্তুটা এদিকে দৌড়ে আসতেই মারা পড়েছে রেডমন্ডের গুলিতে।
চার্লি, একটু দূর থেকে ভেসে এল টনির কণ্ঠস্বর, এদিকে এস তাড়াতাড়ি।
রেডমন্ড ঠিক করলে তার সাফল্যের কথা সে প্রথমে টনিকে জানাবে না। উনি যখন উত্তেজিতভাবে তাকে বলবে কেমন করে একটুর জন্য তার লক্ষ্য ব্যর্থ করে লেপার্ড পালিয়ে গেছে তখন সে চুপচাপ শুনবে টনির কাহিনি– তারপর লেপার্ডের মৃতদেহটাকে দেখিয়ে বন্ধুকে চমকে দেবে।
কিন্তু টনিকে চমকে দেবার আগে সে নিজেই হয়ে পড়ল হতবাক- একটা ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে টনি।
রেডমন্ড দেখলে সেখানে পড়ে আছে আর একটা লেপার্ডের মৃতদেহ।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো রেডমন্ড শুনতে লাগল টনির কথা।
চার্লি, তোমার বরাত ভালো। আমি জঙ্গলের একটা ছোটো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি তোমায় অনুসরণ করছে একটা লেপার্ড। আমি যখন ওটাকে দেখলাম তখন জন্তুটা তোমাকে আক্রমণের উদ্যোগ করছে। গুলি ছুঁড়তে যদি আমার একটু দেরি হত, তাহলে আর তোমার রক্ষা ছিল না– ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছি।
হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে টনি একটা ফ্লাস্ক বার করলে—
চার্লি! এটাতে চুমুক দাও! হঠাৎ তুমি এমন কাগজের মতো সাদা হয়ে গেলে কেন? এখন। আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
সত্যি কথা এখন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
একটু আগেই তাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে এসেছিল দুদুটো লেপার্ড– কিন্তু তার সজাগ চক্ষু কর্ণ একবারও দুই শত্রুর অস্তিত্বকে আবিষ্কার করতে পারেনি।
টনি যদি ঠিক সময়ে এসে না পড়ত তাহলে বোধহয় তার দেহটা এতক্ষণে তীক্ষ্ণ নখদন্তের আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেত…
তবে হ্যাঁ, এখন আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
রেডমন্ডের মনে প্রশ্ন দেখা দিল- বেবুনরা পালিয়ে গেল কেন? তারা কি নকল গর্জন শুনে ভয় পেয়েছিল?
– নাকি, তার পিছনে আসল লেপার্ডকে দেখেই তারা প্রাণভয়ে পলায়ন করলে?
এই প্রশ্নের উত্তর রেডমন্ডের জানা নেই।
যতই কৌতূহল হোক, সত্যি সত্যি কি ঘটেছিল সেটা আর কোনোদিনই সে জানতে পারবে না।
বিংশ শতকে রূপকথার ড্রাগন
জাভা বা যবদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে ড্রাগন নামে এক বিশালাকৃতি দানব-গিরগিটির সন্ধান পাওয়া যায় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। ওই সময় জাভা দ্বীপপুঞ্জ ছিল ওলন্দাজ সরকারের অধীন। শিকারিরা সন্ধান পেয়ে ড্রাগন-শিকারে উৎসাহী হলে ধরাপৃষ্ঠ থেকে এই বিরল প্রাণীটির অবলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে বুঝেই ওলন্দাজ সরকার ওই সরীসৃপ-জাতীয় জীবটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট হল। ওইসব শিকার হল নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সমগ্র পৃথিবী যখন আসন্ন সর্বনাশের সংকেত পেয়ে প্রস্তুত হচ্ছে, সেইসময় যবদ্বীপের বোগর শহরে উপস্থিত হল টেরি মাইকেল নামে জনৈক মার্কিন শিকারি। মাইকেল পূর্ব আফ্রিকাতে শিকার করতে গিয়েছিল, সেখান থেকে ম্যানিলা যাওয়ার পথে সে নেমেছিল যবদ্বীপে। ম্যানিলাতে যাওয়ার পথে ভ্যান এফেন নামে এক ওলন্দাজ চা-বাগানের মালিকের সঙ্গে তার আলাপ হয় এবং পূর্বোক্ত ওলন্দাজ ভদ্রলোকের অনুরোধে তারই অতিথি হয়ে তার অতিথি নিবাসে আশ্রয় গ্রহণ করে মাইকেল। একদিন সন্ধ্যার সময়ে গৃহস্বামীর সঙ্গে গল্প করতে করতে সে হঠাৎ জানতে পারল সভ্য জগতের। অজ্ঞাতসারে যবদ্বীপ বা জাভা দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে আজও বিচরণ করে ড্রাগন নামক অতিকায় গিরগিটির দল। ড্রাগন মাংসাশী এবং অতিশয় হিংস্র। স্থানীয় মানুষ ড্রাগনের ভয়ে ওইসব দ্বীপে নামতে চায় না। ভ্যান এফেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে ড্রাগন নামক প্রাণীটির অস্তিত্ব ছিল মাইকেলের অজানা। যে-কোনো শিকারির পক্ষেই এমন আশ্চর্য শিকার অতিশয় লোভনীয়– যদি বন্দুকের শিকার না হয়, তবে ক্যামেরার শিকার হলেও চলবে– অতএব জাভা দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম দ্বীপ কোমোডোতে অভিযান চালাতে বদ্ধপরিকর হল টেরি মাইকেল।
কিন্তু শিকার করার জন্য ওলন্দাজ সরকারের অনুমতি দরকার। আসন্ন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত ওলন্দাজ সরকার তখন ড্রাগনের নিরাপত্তার চাইতে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে অধিকতর বিব্রত– অতএব কোমোডো দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পেল মাইকেল খুব সহজেই। পালো বেসর নামে একটি দ্বীপ থেকে দুজন স্থানীয় অধিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কোমোডো দ্বীপের উদ্দেশে নৌকা ভাসাল মাইকেল। প্রচুর অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় মানুষ দুটি মাইকেলকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছিল। ওই দুজনের একজন হল আমাসি– খর্বকায়, বৃষস্কন্ধ, বলিষ্ঠ। অপর ব্যক্তির নাম বাজোড়া। সে আমাসির মতন বলবান পুরুষ নয়।
কথায় কথায় আমাসি মাইকেলকে জানাল সে কোমোডো দ্বীপে ড্রাগনদের কথা শুনেছে, তবে তাদের সে ভয় করে না। বিশেষত বন্দুকধারী সাহেব যখন সঙ্গী, তখন আর কীসের ভয়? তবে বাজোড়াকে নৌকায় রেখে যাওয়াই ভালো, কারণ ড্রাগন নামে ওই মাংসাসী সরীসৃপ সম্পর্কে বাজোড়ার আতঙ্ক অপরিসীম। ভীতু লোককে সঙ্গে না নেওয়াই ভালো। তাই বাজোড়াকে নৌকায় রেখে মাইকেল আর আমাসি কোমোডো দ্বীপে পদার্পণ করল।
