অরণ্যের বৃক্ষগুলি যেন অকস্মাৎ বানর প্রসব করতে শুরু করলে, গাছে গাছে ডালে ডালে যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই চোখে পড়ে খালি বেবুন আর বেবুন।
রেডমন্ডের সর্বাঙ্গ ঘর্মাক্ত।
প্রায় শ-খানেক বেবুনের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে তার দিকে। বৃক্ষশাখা থেকে মাটির উপর লাফিয়ে পড়ল কয়েকটা বেবুন, শব্দহীন পদসঞ্চারে এগিয়ে এল তারা, কাছে, কাছে আরও কাছে…
রাইফেলটাকে পেয়ে রেডমন্ড খুব উৎফুল্ল হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন অস্ত্রটাকে নিতান্ত তুচ্ছ মন হল।
কলের কামান থাকলে হয়ত এই বিপুল বানর-বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা চলত, কিন্তু একটি মাত্র রাইফেলের সাহায্যে এতগুলি বেবুনের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়।
হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ড শক্তিশালী দোনলা রাইফেল। কিন্তু দুবার গুলি চার্লিয়ে আবার রাইফেলের শূন্য গর্ভে টোটা ভরতে হয়- বেবুনের দল তাকে সে সুযোগ দেবে না। বড়োজোর দুটো জানোয়ারকে সে গুলি করে মারতে পারে, তারপরই তার রাইফেল হবে নীরব এবং অস্ত্রের শূন্য উদর বুলেট দিয়ে পূর্ণ করে আবার গুলি চালাবার আগেই ক্রুদ্ধ বেবুন-বাহিনীর নখদন্তে তার দেহ হবে ছিন্ন-ভিন্ন।
রাইফেল রেখে রেডমন্ড রিভলভার দুটো টেনে নিলে। রাইফেলের দুখানা শক্তিশালী বুলেটের চাইতে রিভলভারের বারোটা কম-জোরি গুলি তার বেশি কাজে লাগবে- ধারের চেয়ে ভার, শক্তির চাইতে সংখ্যার প্রয়োজনই এখন বেশি।
রেডমন্ডকে কেন্দ্র করে অর্ধবৃত্তাকারে এগিয়ে এল বেবুন-বাহিনী। ওদের অস্বাভাবিক নীরবতা সন্দেহজনক। অন্য সময় তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে কান হয়ে যায় বধির, কিন্তু এখন তাদের গর্জিত কণ্ঠ সম্পূর্ণ স্তব্ধ- শুধু কোটরগত চক্ষুগুলিতে জ্বলে জ্বলে উঠছে জান্তব হিংসা।
একটু পরেই বেবুনের হিংস্র স্বভাবের পরিচয় পেল রেডমন্ড। একটা পুরুষ-জাতীয় বেবুন হঠাৎ এসে পড়ল একটা স্ত্রী-বেবুনের কাছে। মেয়ে-বেবুনটা একটা অস্ফুট শব্দ করে জানিয়ে দিলে, পার্শ্ববর্তী পুরুষটিকে তার পছন্দ হয়েছে।
পুরুষটি ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে আদর করতে লাগল।
মেয়েটির পিছনে যে পুরুষ-বেবুনটি দাঁড়িয়ে ছিল সে হঠাৎ সগর্জনে প্রতিবাদ জানাল। এই বেবুনটা সম্ভবত মেয়েটার আইনসঙ্গত স্বামী, পরপুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর মাখামাখি সে পছন্দ করেনি।
পূর্ববর্তী বেবুনটি এবার রুখে দাঁড়াল। হিংস্র দন্ত বিকাশ করে গর্জে উঠল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। কয়েকটি মুহূর্ত নিশ্চল হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল দুই যোদ্ধা, তারপরই ঝাঁপিয়ে পড়ল পরস্পরের উপরে- তীক্ষ্ণ দন্তের নির্মম দংশনে ছিঁড়ে পড়ল খণ্ড-খণ্ড মাংস দুই যোদ্ধার শরীর থেকে।
দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল যুদ্ধের উত্তেজনা। প্রায় দশ বারোটা পুরুষ-বেবুন হঠাৎ নিজেদের ভিতর মারামারি শুরু করলে। এই লড়াইটা পূর্বতন যোদ্ধাদের সমর্থনে দুই পক্ষের যুদ্ধ, না নিছক হিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য শুরু হল সে কথা বলা মুশকিল, তবে সেই বন্য হিংসার রক্তাক্ত নিষ্ঠুরতাকে ভাষার সাহয্যে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যোদ্ধাদের রক্তে লাল হয়ে উঠল রণভূমি। পূর্ব বর্ণিত স্ত্রী-বেবুনটা প্রথমেই মারা পড়ল। তবে এটা বোধহয় অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা, কারণ পুরুষ-বেবুন সহজে মেয়ে-বেবুনকে আক্রমণ করে না– যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি ছিল বলেই বোধহয় মেয়ে-বেবুনটা মারা পড়ল। আরও চার-চারটে পুরুষ বেবুনের প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির উপর– তারপর হঠাৎ যেমনভাবে লড়াই শুরু হয়েছিল তেমনি হঠাৎ শেষ হয়ে গেল সেই রক্তারক্তি কাণ্ড।
মৃত মেয়ে-বেবুনটাকে কাঁধে তুলে তার বিজয়ী স্বামী (?) গর্বভরে প্রস্থান করলে।
অন্যান্য বেবুনগুলি হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রেডমন্ডের দিকে। রেডমন্ড বুঝতে পারল তার জীবন এখন সত্যিই বিপন্ন। যুদ্ধের উন্মাদনা বেবুনদের হিংস্র স্বভাবকে করে তুলেছে আরও হিংস্র আরও ভয়ানক হত্যার নেশায় তারা পাগল হয়ে উঠেছে, এখনই তারা আক্রমণ করবে রেডমন্ডকে।
দুহাতে দুটো রিভলভার নিয়ে সে প্রস্তুত হল। একটা বেবুন তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল- একটানা কর্কশ চিৎকার। আক্রমণের সঙ্কেত।
আচম্বিতে রেডমন্ডের কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে এল এক উৎকট শব্দ-তরঙ্গ।
মানবকণ্ঠের চিৎকার নয়– লেপার্ডের গর্জন।
লেপার্ডের কণ্ঠ অনুকরণ করে গর্জে উঠেছে রেডমন্ড।
অগ্রবর্তী বেবুনগুলো থমকে দাঁড়িয়ে তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করলে, তারপর চটপট কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
রেডমন্ডের সাহস ফিরে এল, উৎসাহিত হয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে সে চিৎকার করে বললে, যাও, যাও, তফাত যাও।
কোনো ফল হল না। জন্তুগুলো একটুও নড়ল না। রেডমন্ড আবার লেপার্ডের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে গর্জে উঠল– সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত তীব্র আর্তনাদে বন কাঁপিয়ে বেবুনবাহিনী ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করতে শুরু করলো।
কতকগুলো লাফিয়ে উঠে বৃক্ষশাখার অন্তরালে আত্মগোপন করলে, আবার কতকগুলো মাটির উপর দিয়েই দৌড় মারলে তিরবেগে। প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যেই বেবুন বাহিনী বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল, ঘটনাস্থলে পড়ে রইল শুধু যুদ্ধে নিহত চারটে বেবুনের মৃতদেহ।
রেডমন্ড কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থেকে রাইফেলটাকে মাটি থেকে তুলে নিল, তারপর পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল।
