কিছুক্ষণ পরেই তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল নীচের দিকে।
জলের উপর আত্মপ্রকাশ করেছে অনেকগুলি কুম্ভীর।
কুমিরদের মনোভাব অনুমান করা কঠিন নয়- দৈবাৎ যদি দুএকটা বেবুন হাত ফসকে জলের মধ্যে পড়ে তাহলেই ভোজের উপকরণ জোগাড় হয়ে যায়।
কুমিরদের আশা সফল হল না। বেবুনগুলো তাদের দেখেই ক্রুদ্ধ স্বরে চিৎকার করে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে নিক্ষিপ্ত হল রাশি রাশি ডালপালা ভাসমান নকুলের উপর।
বেবুনদের অভদ্র ব্যবহারে বিরক্ত হ কুমিরের দল আবার জলের তলায় আত্মগোপন করলে…
আমরাও সেই ডালপালার সেতু আঁকড়ে নদী পার হলাম। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি শূন্যপথে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যাই নদীর জলে– ওই কুম্ভীর-সঙ্কুল নদীতে পড়লে আর নিস্তার নেই, মুহূর্তের মধ্যে শরীরটা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে জলবাসী দানবের দংশনে। ভাগ্যক্রমে সেরকম কিছু ঘটল না, আমরা দুজনে নির্বিঘ্নে নদী পার হলাম।
নদীর বিপরীত দিকে পৌঁছে দেখলাম, পথটা দুদিকে ভাগ হয়ে চলে গেছে। এবার আর বুঝতে পারলাম না বেবুনগুলো কোন পথ ধরে এগিয়ে গেছে অতএব ঠিক করলাম আমরা দুজনে দুই পথ ধরে এগিয়ে যাব, এবং রাইফেল পাই না পাই এক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক এই জায়গায় এসে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হব।
আমার সঙ্গে ছিল মাত্র ৩৮ রিভলভার। টনির সঙ্গে রাইফেল ছিল বটে, কিন্তু এখন একা পথ চলার সময়ে যদি কোনো হিংস্র পশুর দ্বারা আক্রান্ত হই তাহলে টনির রাইফেল আমাকে সাহায্য করতে পারবে না– ভরসা শুধু কোমরের ৩৮ রিভলভার।
টনি তার কোমরবন্ধ থেকে নিজস্ব একটা ৪৫ কোল্ট রিভলভারটা আমায় খুলে দিলে। তবু ভালো~ রাইফেলের মতো শক্তিশালী অস্ত্র হাতে না থাকলেও দুটো রিভলভারের ভরসায় নিজেকে কিছুটা নিরাপদ মনে করলাম। পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমরা দুজনে এগিয়ে চললাম দুই রাস্তা ধরে…
আমি ভয় পাইনি, কিন্তু অস্বস্তি বোধ করছিলাম। প্রতি মুহূর্তে দলবদ্ধ বেবুনের আক্রমণের ভয় তো আছেই, তা ছাড়া অন্যান্য হিংস্র জানোয়ারের অভাব নেই।
বিশেষ করে লেপার্ডগুলিকে বিশ্বাস করা যায় না যে-কোনো মুহূর্তে ঝোপের আড়াল থেকে ওই ধূর্ত জানোয়ার আমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তে পারে।
ভাগ্যের কি পরিহাস!
এতদিন পর্যন্ত লেপার্ডের সন্ধান করছি পাগলের মতো, আর এখন তার সাহচর্য আমার কাছে দস্তুরমতো ভীতিজনক।
শুধুমাত্র রিভলভার হাতে ওই ভয়াবহ মার্জারের সম্মুখীন হওয়ার ইচ্ছা ছিল না বিন্দুমাত্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক পর্যবেক্ষণ করতে করতে জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে চললাম।
পথের দুধারে অরণ্য ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে, দু-পাশের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে নানারকম স্পষ্ট ও অস্পষ্ট ধ্বনি। জানি ওই শব্দের জন্য দায়ী হচ্ছে কতকগুলি নিরীহ জন্তুর কণ্ঠস্বর, কিন্তু নির্জন আরণ্যক নীরবতার মধ্যে সেই ধ্বনিতরঙ্গগুলি আমার স্নায়ুর উপর চাপ দিতে লাগল।
আচ্ছা, এইখানে আমার ডায়েরির পাতা বন্ধ করছি। আমরা বুঝতে পারছি চার্লস বেনেট রেডমন্ড নামক মানুষটি কি কারণে পদার্পণ করেছে এই গভীর অরণ্যে আর কেনই বা রাইফেলের পরিবর্তে তার কোমরে ঝুলছে দুটো রিভলভার।
এবার আমরাও এগিয়ে চলি রেডমন্ড-এর সঙ্গে, দেখা যাক সে অপহৃত রাইফেলটাকে আবার উদ্ধার করতে পারে কি না।
ঘন জঙ্গলের শেষে খানিকটা ফাঁকা জায়গা।
সেখানে এসেই রেডমন্ড দেখল তার হারিয়ে-যাওয়া রাইফেল পড়ে আছে ফাঁকা জমিটার উপরে।
তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রেডমন্ড অস্ত্রটাকে তুলে নিলে।
সত্যি কথা বলতে কি রাইফেলটা আবার ফিরে পাবে এমন আশা সে করেনি। এতক্ষণ পরে তার আত্মবিশ্বাস ফিরে এল, অস্ত্রটাকে স্পর্শ করতেই নিজেকে নিরাপদ বোধ করল রেডমন্ড।
ভালোভাবে পরীক্ষা করে সে দেখল অস্ত্রটা ব্যবহারের উপযুক্ত আছে, তার কলকবজা কিছুই খারাপ হয়নি। কিন্তু রাইফেলটা এখন শূন্যগর্ভ তার দুটো নলের একটাতেও বুলেট নেই। সে বুঝল কোনো বানর-সন্তানের অঙ্গুলি-স্পর্শে ভরা রাইফেল আওয়াজ হয়ে গুলি ছুটে গেছে। কারণ, তাঁবু থেকে যখন রাইফেল চুরি যায় তখন তার দুটো ঘরেই গুলি ভরা ছিল। মনে মনে রেডমন্ড আশা করল ভরা রাইফেল ফায়ার হয়ে নিশ্চয়ই কয়েকটা বেবুন হতাহত হয়েছে শয়তান জানোয়ারগুলোর দুর্দশা কল্পনা করে রেডমন্ড একটু খুশি হল।
পকেটে রাইফেলের টোটা ছিল, অস্ত্রটাকে সে লোড করে নিলে। রাইফেলে টোটা ভরতে ভরতে হঠাৎ তার মনের মধ্যে জেগে উঠল এক অস্বস্তিকর অনুভূতি।
সে ফিরে দাঁড়াল, সঙ্গেসঙ্গে তার দৃষ্টিপথে ধরা দিল একটা মস্ত মেয়ে-বেবুন।
প্রায় ১২ গজ দুরে একটা গাছের উপর বসে আছে জন্তুটা এবং তার জ্বলন্ত চক্ষুর লক্ষ্যবস্তু। হচ্ছে রেডমন্ড।
দারুণ আক্রোশে রেড়মন্ডের চৈতন্য যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল- গত কয়েকটা দিনের তীব্র উৎকণ্ঠা আর অমানুষিক পরিশ্রমের জন্য দায়ী এই কুকুরমুখো জন্তুগুলি নিজের অজ্ঞাতসারে রাইফেল তুলে সে স্ত্রী-বেবুনটার বুকের উপর নিশানা স্থির করলে।
কয়েক মুহূর্ত পরেই তার হিতাহিত জ্ঞান ফিরে এল। স্ত্রী-পশুকে হত্যা করা উচিত নয়– সে রাইফেল নামিয়ে রাখল। ভালোই করলে– বনানীর সবুজ যবনিকা ভেদ করে তার চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করল অনেকগুলি বেবুন।
রেডমন্ড অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। অস্বস্তি পরিণত হল আশঙ্কায়।
