আমার নিজস্ব ফ্ল্যাশ লাইটটা জ্বালিয়ে এক হাতে ধরে রাখলাম। দলে দলে বেবুন তখনও ভিতরে ঢুকছে, তাদের গায়ের দুর্গন্ধে দূষিত হয়ে উঠেছে তাঁবুর হাওয়া। একহাতে আলো জ্বালিয়ে আর এক হাতে রাইফেল নিয়ে আমি ইতস্তত করতে লাগলাম।
নেহাত যদি তারা আমাকে আক্রমণ করে তাহলেই গুলি ছুড়ব, অকারণে রাইফেল চার্লিয়ে এই বানর বাহিনীকে খেপিয়ে তুলতে আমি রাজি নই…
তাবুর ভিতরে বেবুনের চিৎকার আর গর্জন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল… অকস্মাৎ হুড়মুড় করে তবু ভেঙে পড়ল আমাদের মাথার উপর, অনেকগুলো বানরকণ্ঠে জাগল গর্জন, আর্তনাদ… সশব্দে ছিঁড়ে গেল তাবুর আচ্ছাদন। ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ এসে লাগল গণ্ডদেশে… বানর বাহিনী অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারের গর্ভে…
ঘটনাস্থলে পড়ে রইল শুধু ছিন্নভিন্ন তাবুর ভগ্নাবশেষ এবং দুটি বেবুন।
প্রথমটি তো আগেই আমার গুলি খেয়ে মারা পড়েছিল, দ্বিতীয়টি বোধহয় তার সঙ্গিনী। দুনম্বর বেবুনটা তখনও তার সঙ্গীকে উৎসাহ দিচ্ছে, সান্ত্বনা দিচ্ছে নিশ্চিত বিপদের মুখেও সে সঙ্গীকে ফেলে পলায়ন করল না। অন্য সময় হলে এমন করুণ দৃশ্য দেখলে নিশ্চয় দুঃখিত হতাম, কিন্তু দারুণ ক্রোধ তখন আমাদের কোমল অনুভূতিগুলোকে মুছে দিয়েছে..
পরের দিন সকালেও দেখলাম বেবুন তার মৃত সঙ্গীর কাছে বসে আছে— কোনও কারণেই সে স্থান ত্যাগ করতে রাজি হল না। উপায়ান্তর না দেখে আমরা তাকে হত্যা করতে বাধ্য হলাম। অবশ্য স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে এ কাজটা আমরা নিজেদের হাতে করতে পারিনি পথ-প্রদর্শক গোবোর উপরে এই অপ্রিয় কাজের ভার দিয়ে আমরা সরে পড়েছিলাম।
এবার তাবুটাকে পরীক্ষা করে দেখলাম যে সেটাকে আর কোনমতেই সারিয়ে নেওয়া যাবে না, বানর বাহিনীর নখদন্তে জিনিসটা একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সেজন্য বিশেষ দুঃখিত হইনি, কিন্তু আমার নতুন রাইফেলটা যখন কোথাও খুঁজে পেলাম না তখন মনটা বড়ো খারাপ হয়ে গেল। রাইফেলটা একেবারে নতুন-হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ড অস্ত্রটার জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম প্রায় দুবছর, আর দামও পড়েছিল অনেক, প্রায় ২০০০ ডলার। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যখন রাইফেলটার পাত্তা পাওয়া গেল না তখন বুঝলাম বেবুনগুলোই অস্ত্রটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।
রাইফেল হারিয়ে মহা মুশকিলে পড়লাম। জিনিসপত্রের ওজন কমাবার জন্য আমরা প্রত্যেকেই এক-একখানা রাইফেল নিয়েছিলাম। আমার অস্ত্রটা চুরি গেছে, এবং যেহেতু রাইফেল ছাড়া শিকার করা সম্ভব নয় অতএব আমাকে এখন আদ্দিসআবাবায় গিয়ে একটা নতুন রাইফেল কিনতে হবে।
নাঃ! আমি ঠিক করলাম এত সহজে রাইফেলটাকে ছাড়ব না, যেমন করেই হোক বেবুনদের হাত থেকে অস্ত্রটা উদ্ধার করব।
টনি বুদ্ধি দিলে, এক কাজ করা যাক। মরা বেবুন দুটোকে জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় ফেলে রাখি, দলের বানরগুলো নিশ্চয়ই সেখানে এসে জুটবে। তারপর যখন বেবুনের দল স্থানত্যাগ করবে তখন তাদের অনুসরণ করলেই হয়ত আমরা রাইফেলটাকে উদ্ধার করতে পারব।
ভালো যুক্তি– আমি বরাবরই দেখেছি টনির মাথাটা বেশ পরিষ্কার। তার বুদ্ধিমত কাজ করেই রাইফেলটাকে হারিয়েছি, আবার এখন তার মতে সায় দিয়ে আমি পড়লাম এক নতুন বিপদের মধ্যে–
যাক, সে কথা ক্রমশ প্রকাশ্য।
মরা বেবুন দুটোকে জঙ্গলের ভিতর ফেলে রেখে পরপর দুদিন আমরা অপেক্ষা করলাম কিন্তু বানরের দল না-পাত্তা। সন্ধ্যার পরে আবার মৃতদেহ দুটিকে ফিরেয়ে আনতে হত, কারণ রাত্রিবেলা যদি বেবুনের দল মৃত সঙ্গীদের বহন করে নিয়ে যায় তবে জঙ্গলের পথে অন্ধকারের কালো যবনিকা ভেদ করে তাদের অনুসরণ করা সম্ভব হবে না।
দুদিন পরে বেবুন দুটোর শরীর থেকে পচা মাংসের দুর্গন্ধ ছাড়তে লাগল। খুব সম্ভব সেই দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হয়েই তৃতীয় দিনে বেবুনের দল মরা পশু দুটোর কাছে এল। খানিকক্ষণ সঙ্গীদের প্রাণহীন দেহ দুটির চারধারে ঘুরে ঘুরে তারা ঘ্রাণ গ্রহণ করল। তারপর ঘটনাস্থল ছেড়ে সরে পড়ল।
আমরা তাদের পিছু নিলাম দূর থেকে।
অনেক সময় ঘন জঙ্গলের মধ্যে বেবুনগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পরিত্যক্ত মলমূত্রের দুর্গন্ধে তাদের গমন-পথ নির্ণয় করতে আমাদের কোনো অসুবিধা হল না। অনেকক্ষণ ধরে চলল অনুসরণ পর্ব।
জন্তুগুলোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইতিমধ্যেই আমাদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে ফেলেছে, তবে তাদের হাব-ভাব দেখে মনে হল দুটো তুচ্ছ মানুষকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। মাঝে মাঝে জঙ্গলের পথে মাটি থেকে পোকা-মাকড় তুলে তারা মুখে দিচ্ছিল অথবা বড়ো বড়ো পাথরের তলা থেকে কিসব কুড়িয়ে চর্বণ করছিল পরম আনন্দে। অত দূর থেকে সব সময় তাদের খাদ্যবস্তুটা আমরা দেখতে পাইনি; তবে গাছপালা, কচি ঘাস, গাছের ফল থেকে শুরু করে পোকা-মাকড়, গিরগিটি, বৃশ্চিক প্রভৃতি অনেক কিছুই বেবুনের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ উদ্ভিদভোজী হলেও বেবুন খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি খুঁতখুঁতে নয়- সে যাহা পায় তাহাই খায়।
বেবুনদের ভোজন এবং ভ্রমণপর্ব চলল অনেকক্ষণ ধরে অবশেষে তারা এসে উপস্থিত হল একটা ছোটো নদীর ধারে।
নদীর দুই তীরে অসংখ্য মহীরূহ পরস্পরের দিকে শাখাময় বাহু প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে এবং কোথাও কোথাও দুই পারের বৃক্ষশাখা দৃঢ় আলিঙ্গনে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে। বেবুনের দল সেই ঝুলন্ত গাছের ডাল ধরে নদী পার হতে লাগল।
