সহজে হাল ছাড়তে আমি রাজি নই। স্থানীয় বাসিন্দারা যতরকম কায়দাকানুন জানে সব কিছুই প্রয়োগ করে দেখা হল।
শুনেছিলাম লেপার্ডের কণ্ঠ অনুকরণ করে হাঁক দিলে আসল জানোয়ার অকুস্থলে উপস্থিত হয়। বারংবার চেষ্টা করে আমি ওই জানোয়ারের কণ্ঠস্বর আয়ত্ত করলাম, আমার গলা থেকে বেরিয়ে আসত অবিকল লেপার্ডের গর্জনধ্বনি।
কিন্তু কোথায় কী? নকল গর্জনে সাড়া দিয়ে কোনো লেপার্ড বন্দুকের গুলিতে আত্মবিসর্জন দিতে এগিয়ে এল না।
আর একটি মাত্র উপায় আছে- কুকুর-মাংসের টোপ।
লেপার্ড কুকুরের মাংস খুব পছন্দ করে, তাই কুকুর দিয়ে টোপ ফেললে বোধহয় ওই জানোয়ার আমাদের ফাঁদে পা দিতে পারে। আমাদের সঙ্গে অবশ্য কুকুর ছিল না, তবে শেষ পর্যন্ত হয়তো একটি কুকুর আমরা জুটিয়ে ফেলতাম কিন্তু বাধা দিল টনি।
তার মাথায় চমকে উঠেছে এক অভিনব ফন্দি।
শয়তান লেপার্ডগুলো যখন বেবুনের মাংস ছাড়া আর কিছু খেতে রাজি নয় তখন বেবুন দিয়ে একটা টোপ সাজালে কেমন হয়?
বেবুনের মাংস দিয়ে টোপ ফেললে লেপার্ড নির্ঘাত ফাঁদে পা দেবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বেবুনের সঙ্গে মানবদেহের এত সাদৃশ্য আছে যে বেবুন মারতে গেলেই মনে হয় নরহত্যা করছি। যাই হোক আমরা ঠিক করলাম মনের দুর্বলতাকে প্রশয় দিলে চলবে না, আপাতত দুটো বেবুনকে হত্যা করে আমরা লেপার্ডের টোপ সাজিয়ে ফেলব।
সঙ্কল্প করা সহজ, কিন্তু সেই সঙ্কল্পকে কাজে পরিণত করা সহজ নয়। পরের দিন সমস্ত জঙ্গলে আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু একটাও বেবুন আমাদের চোখে পড়ল না। বেবুনদের পুরোনো আস্তানায় আমরা হানা দিলাম, এমনকি যে গ্রামটার উপর কিছুদিন আগেই তারা অত্যাচার করেছিল সেখানেও খুঁজলাম কিন্তু কোথায় কী? সব ভে-ভ!
মনে হল কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের সাবধান করে দিয়েছে, না হলে এতদিন যাদের অত্যাচারে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, রাতারাতি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সেই শয়তানগুলো কোথায় সরে পড়ল!
বিকাল পর্যন্ত অনুসন্ধান-পর্বচার্লিয়ে আমরা যখন রীতিমত হতাশ হয়ে পড়েছি ঠিক সেই সময় নতুন আশার বাণী পরিবেশন করলে আমাদের পথ-প্রদর্শক, মধুর লোভ দেখালেই বেকুন আসবে।
আমাদের সম্মতি পেয়ে সে লম্বা লম্বা পা ফেলে অন্তর্ধান করল এবং ঘণ্টাখানেক পরে তিন তিনটে মৌচাক হাতে নিয়ে ফিরে এল।
তরল আঠার মতো মধু গড়িয়ে পড়ছে তিনখানা মৌচাক থেকে।
আমরা বললাম, আচ্ছা গোনরা, কাল সকাল পর্যন্ত ওটা তোমার কাছেই রেখে দাও।
না না, সাহেব! ঘন-ঘন মুণ্ড নেড়ে সে তার আপত্তি জানিয়ে দিলে। তার কণ্ঠস্বরেও ছিল ভীতির আভাস।
নোকটাকে আর প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না, টপ করে মৌচাকগুলিকে টেবিলের উপর রেখে সে দ্রুতপদে প্রস্থান করলে।
আমি অবাক হয়ে তাকালুম টনির মুখের দিকে। টনি বললে, এসব নেটিভদের নানা ধরনের কুসংস্কার থাকে। হয়ত গোরা মনে করে মৌচাকটাকে কাছে রাখলে তার অমঙ্গল হবে।
…সেদিন রাতে তাঁবুর মধ্যে ক্যানভাসের খাটে শুয়ে চিন্তা করছি। যতই ভাবছি আমাদের অবস্থাটা ততই হাস্যকর মনে হচ্ছে। প্রথমে আমরা চাইলুম একটা লেপার্ড, সেটাকে বাগাবার জন্য দরকার হল একটা বেবুন; আবার বেবুনটাকে ধরতে গিয়ে দেখছি টোপ হিসাবে একটা মৌচাক না হলেই নয়। সুখের কথা এই যে মৌচাকটাকে ধরবার জন্য আর কিছুর দরকার হচ্ছে না, কারণ একটার বদলে তিন-তিনটে মৌচাক আমার টেবিলের উপরেই বর্তমান।
সেই মৌচাকই হল যত অনর্থের মূল… মধ্যরাত্রে আমার ঘুম ভাঙল টনির কণ্ঠস্বরে—
কে? চার্লি?
নিশ্চয়ই। আবার কে আসবে?
তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমি উত্তর দিলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করলাম তাঁবুর মধ্যে আমরা। ছাড়াও তৃতীয় প্রাণী আছে– ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম বিছানার উপরে।
টনি তার ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়ে দিলে।
অন্ধকারের বুকে জ্বলে উঠল তীব্র আলোক-রেখা– সেই আলোতে আমরা দেখলাম একটা বেবুন টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে বাচ্চা ছেলেরা যেভাবে আইসক্রিম খায় ঠিক সেই ভঙ্গিতে একটা মৌচাক চাটছে।
অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ জ্বলন্ত আলোক রশ্মি তার চোখে আঘাত করল। চক্ষুরত্নকে তীব্র আলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সে ঠিক মানুষের মতোই একটা হাত তুলে ধরল চোখের সামনে।
গুলি চালাও চার্লি! টনি চিৎকার করে উঠল, লেপার্ডের টোপ তোমার সামনেই রয়েছে।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে একটা বেবুনকে তাঁবুর মধ্যে দেখে আমি হয়ে পড়েছিলাম হতভম্ব, টনির চিৎকারে আমার সম্বিত ফিরে এল।
মুহূর্তের মধ্যে রাইফেল টেনে নিয়ে আমি জন্তুটার বুক লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লাম।
এক হাত দিয়ে রক্তাক্ত বুকটা চেপে ধরে বেবুন ভূমিশয্যা গ্রহণ করল। ধরাশায়ী জন্তুটার কণ্ঠ ভেদ করে নির্গত হল অবরুদ্ধ আর্তস্বর- পরক্ষণেই তাঁবুর মধ্যে শুরু হল তাণ্ডব নৃত্য। তাঁবুর আচ্ছাদন ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করলে একপাল বেবুন।
টনির চিৎকার শুনলাম। একটু পরেই তার কণ্ঠ হল অস্পষ্ট বুঝলাম বেবুনগুলো তার গায়ের উপর এসে পড়েছে। প্রথমে মনে করেছিলাম জন্তুগুলো বোধহয় আমাদের মেরে ফেলতে চায়; কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম তাদের দৃষ্টি শুধু আহত সঙ্গীর উপরেই নিবদ্ধ। আমাদের হত্যা করার মতো ভয়ঙ্কর উদ্দেশ্য বেবুনদের নেই।
আহত বেলুনের শায়িত দেহটাকে দলের বানরগুলো ধরাধরি করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে লাগল, কর্কশ কণ্ঠের বিচিত্র স্বরলহরী জাগল তাবুর মধ্যে বেবুনরা তাদের মুমূর্ষ সঙ্গীকে উৎসাহ দিচ্ছে।
