নজমবাজীকে কেউ প্রশংসা করবে না।
বহু মানুষকে সে হত্যা করেছিল; বাঘিনীর মতো হিংসা-কুটিল তার স্বভাব, বাঘিনীর মতোই সে ভয়ংকরী অপরাধের যোগ্য শাস্তি পেয়েছে সে।
কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে সাহস ও বীরত্বের পরিচয় সে দিয়েছিল তার জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন মহারাজ শকা–বাঘিনীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি।
ওই সম্মান তার প্রাপ্য।
বাঘিনীর প্রাপ্য।
[ফাল্গুন ১৩৭৫]
বানর-সেনার বন্দি
ইথিওপিয়ার গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে নিঃশব্দ চরণে যে শ্বেতাঙ্গটি হেঁটে চলেছে তার নাম চার্লস বেনেট রেডমন্ড।
বিড়ালের মতো সতর্ক পদক্ষেপে সে এগিয়ে চলেছে বনের পথে, দুই চোখের তীব্র সন্ধানী দৃষ্টি মেলে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করছে বারংবার। কেন? এই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে কোন মূল্যবান বস্তু খুঁজে খুঁজে ফিরছে এই সুসভ্য শ্বেতাঙ্গ? পরনে তার শিকারির পোশাক, কোমরে ঝুলছে জোড়া রিভলভার- কিন্তু হাতে নেই রাইফেল।
শুধুমাত্র রিভলভারের ভরসায় এই ভয়াবহ শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে কোনো শিকারি পা দেয় না। এখানকার জঙ্গলে বাস করে অসংখ্য লেপার্ড- ওই ধূর্ত জানোয়ারের বিদ্যুৎ-চকিত আক্রমণের বিরুদ্ধে রিভলভার চার্লিয়ে বিশেষ সুবিধা করা যায় না। লেপার্ড ছাড়া অন্য রকম বিপদের ভয়ও আছে– যদিও এই বনভূমি পশুরাজের প্রিয় বাসস্থান নয় তবুও কোনো খামখেয়ালি সিংহ-সন্তান কখনও এদিকে বেড়াতে আসবে না এমন কথা জোর করে বলা যায় না। শিকারির সঙ্গে শুভদৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি পশুরাজ নখদন্তের আপ্যায়নে মানুষটিকে অভ্যর্থনা জানাতে চায় তাহলে কেবলমাত্র রিভলভারের গুলিবৃষ্টি করে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব।
সঙ্গীবিহীন অবস্থায় দুটো রিভলভারের ভরসায় এই ভীষণ অরণ্যে প্রবেশ করার সাহস যার থাকে সে হয় নিরেট মুখ আর নয় তো বদ্ধ উন্মাদ
কিন্তু এই লোকটিকে দেখে তোবোকা কিংবা পাগল মনে হচ্ছে না! তবে? মৃত্যুপুরীর মধ্যে এমনভাবে প্রাণ বিপন্ন করার কারণ কী?
আচ্ছা আমরা বরং লোকটির ডায়েরির পাতা উল্টে দেখি–
আমি আর আমার বন্ধু টনি ঠিক করলাম যে একজোড়া লেপার্ডের চামড়া আমাদের নিতান্তই প্রয়োজন। ইথিওপিয়ার বনভূমিতে বাস করে অসংখ্য লেপার্ড। অতএব আমরা দুজনে সেদিকে যাত্রা করলাম মহা উৎসাহে। আদ্দিস আবাবা ছেড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যে জায়গায় এসে আমরা উপস্থিত হলাম তার নাম মোগর।
এই মোগর অঞ্চলের বনভূমি হচ্ছে যাবতীয় বন্য পশুর প্রিয় বাসস্থান। সমগ্র আফ্রিকার মধ্যে বোধহয় আর কোথাও এত ভয়ানক জঙ্গল নেই, এমনকি কিনিয়ার বিখ্যাত বনভূমিও মোগরের কাছে একেবারেই নগণ্য।
চারদিকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রোদে-পোড়া ছোটো বড়ো পাথর, কঠিন পাথুরে জমি থেকে কি কৌশলে জানি না রস আহরণ করে দাঁড়িয়ে আছে এক সুবিশাল বনভূমি। অসংখ্য উপত্যকা, গহুর ও বৃষ্টিধারার সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত গভীর নালাতে পরিপূর্ণ সেই মহারণ্য।
আমরা এসে উপস্থিত হলাম এই সবুজ অরণ্যের অন্তঃপুরে।
পূর্ব আফ্রিকার কিনিয়া অঞ্চলে যেমন শিকার অভিযানের সুবিধা আছে এদিকে তেমন নেই। লোকজন নিয়ে দল বেঁধে শিকারে যাওয়ার পদ্ধতি এখানে প্রচলিত হয়নি। তাই এখানকার জঙ্গলে শিকার করতে এলে নতুন শিকারিকে নির্ভর করতে হয় তার একক ক্ষমতার উপরে পেশাদার শিকারিদের সাহায্য এদিকে পাওয়া যায় না।
আমরা স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম। তাদের জানিয়ে দিলাম যে যদি কোনো লেপার্ড গ্রামবাসীদের গোরু ছাগল মারতে থাকে তবে আমাদের যেন খবর দেওয়া হয়- আমরা আগ্রহের সঙ্গে হত্যা করব সেই দুরাত্মাকে।
নানারকম সংবাদ আসতে লাগল। অধিকাংশই গুজব। আমাদের শুধু ছুটোছুটি সার।
যে-সব আপত্তি ও গোলমালের খবর আমাদের কানে আসতে লাগল সেজন্য কোনো মাংসাশী পদ দায়ী নয় গ্রামবাসীদের শান্ত জীবনে মূর্তিমান অভিশাপের মতো হানা দিয়েছে একদল বানর জাতীয় জীব- হামাড্রায়াড বেবুন।
এই জন্তুগুলোর চেহারা যেমন বিশ্রী, প্রকৃতিও তেমনই ভয়ংকর। বেবুনরা বাস করে দলবদ্ধভাবে, তাদের সংখ্যাও গ্রামবাসীদের চেয়ে অনেক বেশি। বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো আচম্বিতে হানা দেয় ছ-সাতশো বেবুন গাঁয়ের মধ্যে, বেপরোয়াভাবে লুটপাট করে জিনিসপত্র ভেঙে-চুরে চলে যায় দলবদ্ধ জন্তুগুলি।
গ্রামবাসীদের তারা মোটেই ভয় করে না, উদ্যত বর্শার আক্রমণকে তারা খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারে।
গ্রামের কাছাকাছি জঙ্গলে বেবুনরা আস্তানা বাঁধে। শুধু শস্যক্ষেত্রগুলি ধ্বংস করেই জন্তুগুলি ক্ষান্ত হয় না- কুঁড়েঘরের ভিতর প্রবেশ করে তারা জিনিসপত্র লুটে নেয়, এমনকি অনেক সময় ছোটো-ছোটো শিশুদের তুলে নিয়ে তারা পালিয়ে যায় বনের মধ্যে।
কোনো মানুষই এই কদাকার জন্তুগুলিকে পছন্দ করে না। আমরাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাম বেবুনবাহিনীর উপর, শুধু তাদের জন্যই হয়তো এ-যাত্ৰা আমাদের শূন্য হাতে ফিরতে হবে। আমাদের রাগের কারণও ছিল।
চারদিকে খালি বেবুন আর বেবুন, তাই কোনো লেপার্ডের লুব্ধ দৃষ্টি গ্রামবাসীদের ছাগল ভেড়ার দিকে আকৃষ্ট হয় না কারণ বেলুনের মাংস লেপার্ডের প্রিয় খাদ্য।
লেপার্ড যদি গ্রামের মধ্যে আসতে না রাজি হয় তবে আমাদেরই ঢুকতে হবে জঙ্গলের ভিতর দিনের পর দিন ঝোপে ঝোপে হানা দিয়ে ঘুরলাম আমি আর টনি, কিন্তু লেপার্ডের চিহ্ন পর্যন্ত কোথাও চোখে পড়ল না।
