আহত রমণী চিৎকার করে প্রহরীকে ডাকল। প্রহরী সাড়া দিতেই সে জানাল একটা গাছের ছালের ব্যান্ডেজ, কিছু মাকড়সার জাল আর জোই জাতীয় গাছের পাতা তার এখনই দরকার।
প্রহরী তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে ফিরে এল। নজমবাজী যা যা চেয়েছিল সব কিছুই তাকে দেওয়া হল, উপরন্তু সে পেল একটি ধারালো বর্শা। প্রহরী জানাল তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মহারাজ শকা বল্লমটা তাকে উপহার দিয়েছেন।
অস্ত্র হাতে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল মেয়েটি। রক্তাক্ত পা-টিকে সে ভালোভাবে বাঁধল, তারপর প্রহরীর কাছে খাদ্য চাইল। অন্যদিনের মতো আজ সে পরিমিত পানাহার করলে না প্রচুর পরিমাণে মাংস উদরস্থ করে সে বিয়ারের পাত্রে চুমুক দিল। আকণ্ঠ মদ্যপান করে সে সোজা হয়ে বসল, তারপর হুকুম করল কুটিরের বাইরে যেন আগুন জ্বেলে দেওয়া হয়।
অনুরোধ রক্ষিত হল। কুটিরের পাশ থেকে ঘাসের আবরণ সযত্নে আরও কিছুটা সরিয়ে নিল প্রহরী, ফলে বাইরের জ্বলন্ত আগুনের আলোতে কুটিরের আঁধার মাখা অন্তঃপুরে জাগল অস্পষ্ট আলোর বাতাস…
নজমবাজী আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আচম্বিতে সে অনুভব করলে তার আহত পায়ের ওপর তীক্ষ্ণ দন্তের করাল স্পর্শ। হাতের বল্লম তুলে ধরার আগেই মেয়েটির পায়ের ডিম থেকে এক কামড়ে খানিকটা মাংস তুলে নিয়ে সরে গেল হায়না!
ঘরের মধ্যে তখন বিরাজ করছে নিরেট অন্ধকার। বাইরে আর আগুন জ্বলছে না। নজমবাজী চিৎকার করে প্রহরীদের আগুন জ্বালাতে বললে। আদেশ পালিত হল তৎক্ষণাৎ।
জানলার ফাঁকে ফাঁকে জ্বলন্ত মশালের আলোতে নজমবাজী তার ক্ষতবিক্ষত পা-টিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে, তারপর ব্যান্ডেজ বাঁধল খুব নিপুণ হাতে। তখন তার চলার ক্ষমতা আর ছিল না, এক হাতে বর্শা উঁচিয়ে কোনোমতে সে হায়নাটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে। খুব সহজেই উদ্যত বর্শাটাকে এড়িয়ে সরে গেল হায়না। শ্রান্ত অবসন্ন দেহে দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়ল নজমবাজী।
তার পায়ের ক্ষত থেকে বেশ কিছু রক্ত ঝরে এক জায়গায় মাটির ওপর জমেছিল। হায়নাটা সেই রক্ত পান করল, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নজমবাজীর মুখের ওপর ক্ষুধিত দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল। বর্শার খোঁচা মারার উপায় ছিল না, জন্তুটা ভারি শয়তান, উদ্যত বর্শার নাগালের মধ্যে একবারও পা বাড়াল সে কেবল তার দুই জ্বলন্ত চক্ষুর নির্নিমেষ দৃষ্টি ক্ষুধার্ত আগ্রহে লেহন করতে লাগল রমণীর সর্বাঙ্গ..
অকস্মাৎ অন্ধকার রাত্রির স্তব্ধতা ভঙ্গ করে কুটিরের মধ্যে জাগল এক ভয়াবহ অট্টহাস্য হা! হা! হা! হা!
হায়নার হাসি! কুটিরের মধ্যে নজমবাজীর অঙ্গে অঙ্গে ছুটে গেল আতঙ্কের বিদ্যুৎপ্রবাহ! এমনকী কুটিরের বাইরে মহারাজের নির্ভীক প্রহরীর মাথার চুলও আতঙ্কে খাড়া হয়ে উঠল! জুলু সৈনিক হাতে অস্ত্র থাকলে কারুকে ভয় পায় না, কিন্তু সেই জান্তব অট্টহাস্য তাদের অন্তরেও ভীতির সঞ্চার করলে।
হি! হি! হি! হি! কুটিরের ভিতর থেকে জাগল এবার নারীকণ্ঠে তীব্র হাস্যধ্বনি!
স্নায়ুর ওপর এতখানি চাপ সহ্য করতে পারল না নজমবাজী, সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ল…
অতর্কিত আক্রমণ করলে হায়না। বিদ্যুৎবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মেয়েটির পায়ে কামড় বসাল।
সজোরে বর্শা চালনা করল নজমবাজী। সাঁৎ করে সরে গিয়ে জন্তুটা আত্মরক্ষা করলে এবং মেয়েটি সাবধান হওয়ার আগেই দুই চোয়ালের বর্জ-দংশনে চেপে ধরলে বর্শাফলক–
পরক্ষণেই এক টান মেরে হায়না অস্ত্র ছিনিয়ে নিল। নজমবাজী বুঝল নিরস্ত্র অবস্থায় আর সে আত্মরক্ষা করতে পারবে না, মৃত্যু তার নিশ্চিত। সে তার আর্তনাদ করলে না, দৃঢ় স্বরে হাঁক দিল, প্রহরী!
উত্তর এল, আদেশ করুন।
–আমি আর একে ঠেকিয়ে রাখতে পারছি না। শয়তানটা এখনই আমাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। রাজাকে জানিয়ো নজমবাজী জীবনে কখনো কাঁদেনি। আজও সে হাসিমুখে মরতে চায়। আমার অন্তিম অনুরোধ এই কুটিরে যেন আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। শত্রুকে যদি পুড়ে মরতে দেখি তাহলে আমিও হাসতে হাসতে মরতে পারব। যাও প্রহরী, তাড়াতাড়ি যাও।
রাজার অনুমতি আনতে একটু দেরি হল। ওই সময়ের মধ্যেই বার বার আক্রমণ চালিয়েছে হায়না। কোনোমতে দুই হাত দিয়ে জন্তুটার আক্রমণ ঠেকিয়েছেনজমবাজী। হায়নার নিষ্ঠুর দাঁত তার শরীরের মারাত্মক স্থানগুলিকে স্পর্শ করতে পারেনি বটে, কিন্তু রাজার আদেশ নিয়ে প্রহরী যখন ফিরে এল তখন হতভাগিনী মেয়েটির দুখানি পায়ের বেশির ভাগ অংশই হায়নার উদরস্থ হয়েছে।
হায়না বুঝেছে তার শিকার দুর্বল হয়ে পড়েছে। হিংস্র দন্ত বিস্তার করে সে আবার আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কুটিরের শুষ্ক আবরণ ভেদ করে উঁকি দিল জ্বলন্ত অগ্নিশিখা!
নজমবাজীর প্রার্থনা পূরণ করেছেন রাজা, প্রহরীরা আগুন লাগিয়েছে কুটিরে…।
দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন, সভয়ে আর্তনাদ করে উঠল হায়না, কুটিরের অভ্যন্তরে জাগল নারীকণ্ঠে তীব্র হাস্যধ্বনি–হি! হি! হি! হি!
কুটিরের ছাতের ওপর, দেয়ালের ওপর সগর্জনে লাফিয়ে উঠল শত শত লেলিহান অগ্নিশিখা–প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল ছাত। অগ্নিদেবের জ্বলন্ত আলিঙ্গনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল শ্বাপদ ও রমণী…
