হায়না!
একটা পুরুষ হায়না!
আবার আর্তনাদ করে উঠল নজমবাজী, আবার ছুটে এল প্রহরীরা, সাগ্রহে জানতে চাইল বন্দিনীর ভয়ের কারণটা কী!
আলো, আলো, আরও আলো চেঁচিয়ে উঠল নজমবাজী।
আপনার আদেশ নিশ্চয়ই পালিত হবে, উত্তর এল সসম্ভ্রমে। ছোটো ছোটো জানলাগুলোর উপর ছিল শুষ্ক ঘাসের আবরণ, প্রহরীরা সেগুলো সরিয়ে দিল…
নেমে এল রাতের কালো যবনিকা। নজমবাজীর কুটিরের বাইরে এসে দাঁড়াল আরও কয়েকজন প্রহরী। জানলার ফাঁক দিয়ে বন্দিনিকে আহার্য ও পানীয় সরবরাহ করা হল–প্রচুর মাংসের গ্রিল আর উৎকৃষ্ট বিয়ার জাতীয় সুরা।
পানাহারের রাজকীয় ব্যবস্থা দেখে খুশি হল না বলিনি আসন্ন রাত্রির অন্ধকারের ভয়ে সে বিচলিত। নজমবাজীর ভীতি অমূলক নয়, ঘন অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে জন্তুটা তাকে আক্রমণ করতে পারে।
নজমবাজী আগুন চাইল, কিন্তু এইবার তার অনুরোধ রক্ষিত হল না। প্রহরী সবিনয়ে জানাল আগুন দেওয়া সম্ভব নয়–রাজার নিষেধ।
প্রকৃতির কোলে মানুষ হয়েছে বনবালা নজমবাজী, হায়নার স্বভাবচরিত্র তার অজানা নয়। সে জানত হায়না ভীরু জানোয়ার–যতক্ষণ জন্তুটা ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারবে ততক্ষণ সে আক্রমণ করবে না, কিন্তু শূন্য উদরে যখন ক্ষুধার দংশন অসহ্য হয়ে উঠবে তখনই মানুষের মাংসের লোভে ঝাঁপিয়ে পড়বে ক্ষুধার্ত শ্বাপদ
অন্ধকারের মধ্যে নিরস্ত্র অবস্থায় হায়নার হিংস্র আক্রমণ রোধ করা মেয়েটির পক্ষে অসম্ভব।
নজমবাজী বুঝল হায়নাকে নিজের খাদ্য থেকে কিছু কিছু অংশ যদি দেওয়া যায়, তাহলে জন্তুটা তাকে সহজে আক্রমণ করবে না–একটুকরো মাংস নিয়ে সে ছুঁড়ে ফেলল হায়নার দিকে। হায়না একটুও দেরি করলে না। টপ করে মাংসের টুকরোটা চেপে ধরল দুই চোয়ালের ফকে–কঠিন দন্তের সংঘর্ষে শব্দ উঠল খটাস!
শিউরে উঠল নজমবাজী।
আর তৎক্ষণাৎ বাতায়ন পথে ভেসে এল প্রহরীর কণ্ঠস্বর, ওকে খাদ্য দেওয়ার হুকুম নেই। আপনি যদি আদেশ অমান্য করেন তবে আপনাকেও ভবিষ্যতে আর খাবার দেওয়া হবে না।
নজমবাজী বুঝল প্রহরীর কথা না-শুনলে উপবাস অনিবার্য। অনাহারে দুর্বল হয়ে পড়লে আরও বিপদ–সে মাংসের টুকরোগুলিতে মনোনিবেশ করলে। খাওয়ার পর আকণ্ঠ সুরাপান করলে সে। গুরু ভোজনের পর সুরার প্রভাব তার চোখে এনে দিল নিদ্রার আবেশ। কিন্তু নজমবাজী জানত অন্ধকার কুটিরের মধ্যে ক্ষুধার্ত হায়নার সামনে ঘুমিয়ে পড়লে সেই ঘুম আর ভাঙবে না কোনোদিন–
রমণী প্রাণপণে জেগে থাকার চেষ্টা করতে লাগল…
হঠাৎ তার মনে পড়ল শুধুমাত্র হাড় চিবিয়ে হায়না ক্ষুধানিবৃত্তি করতে পারে। মাংসাশী পশুদের মধ্যে হায়নাই একমাত্র জীব যে মাংসহীন অস্থি থেকে খাদ্যরস সংগ্রহ করার ক্ষমতা রাখে। কুটিরের দেয়াল থেকে নজমবাজী একটু নরমুণ্ড নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল দূরে। একটু পরেই কুটিরের মধ্যে জাগল এক ভয়াবহ শব্দের তরঙ্গ–কটমট! কটমট! কটমট!
কঠিন শ্বদন্তের নিষ্পেষণে ভেঙে যাচ্ছে অস্থিসার নরমুণ্ড!
ভয়ে ভয়ে জেগে রইল নজমবাজী, একবারও সে চোখ বন্ধ করলে না। হায়না অবশ্য একবারও আক্রমণের চেষ্টা করেনি, শুকনো হাড় চিবিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকল। ভোররাতের দিকে চক চক করে জলপানের আওয়াজ শোনা গেল–কুটিরের একধারে যে কাঠের গামলাতে জল ছিল সেইখানে এসে জন্তুটা তৃষ্ণা নিবারণ করছে…
একটা দিন কাটল। দুপুর এগারোটার সময়ে প্রহরী নিয়ে এল মাংস ও সুরা। নজমবাজী যখন বড়ো বড়ো মাংসের টুকরো চিবিয়ে খেতে শুরু করলে, তখন হায়না হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল।
মাংসের গন্ধ তার নাকে গেছে
মুখ তুলে সে ঘ্রাণ গ্রহণ করতে লাগল সশব্দে!
নজমবাজী কয়েকটা নরমুণ্ড দেয়াল থেকে তুলে নিল। এবার সে মুণ্ডগুলি নিক্ষেপ করতে লাগল জন্তুটাকে লক্ষ করে। বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে মেয়েটির নেশা চড়ে গেল।
সে চিৎকার করে হায়নার দিকে ধেয়ে গেল। জন্তুটা ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করলে। কুটিরের চারপাশে হায়না তাড়িয়ে ছুটতে লাগল নজমবাজী এবং একসময়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হল। শুষ্ক করোটিগুলিতে মেয়েটি মাংসের ঝোল মাখিয়ে দিয়েছিল, এমন লোভনীয় খাদ্য ফেলে হায়না নিশ্চয়ই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়বে না–এই ছিল তার আশা…।
সূর্য অস্ত গেল। প্রহরীরা খাদ্য নিয়ে ডাকাডাকি করতে লাগল। একটি লম্বা ঘুম দিয়ে উঠে বসল নজমবাজী। এবার কিন্তু খুব বেশি খাদ্যগ্রহণ করলে না সে, সুরাপান করল খুব অল্প পরিমাণে–তারপর প্রস্তুত হল রাত্রি জাগরণের জন্য।
রাত কাটল। শুষ্ক অস্থিসার নরমুণ্ড ভোজন করলে হায়না। বিনিদ্র চোখে জেগে রইল নজমবাজী। মাঝে মাঝে মেয়েটি চিৎকার করে উঠছিল, কিন্তু হায়না সম্পূর্ণ নীরব–শুধু নিক্ষিপ্ত কঙ্কাল-করোটির ওপর তার দাঁতের বাজনা বেজেছিল কড়মড় শব্দে…
পরের দিনটাও কেটে গেল এবং পার হয়ে গেল আরও একটি রাত। তার পরের দিন সকালবেলা খুব বেশি পরিমাণেই মাংস ভোজন করলে নজমবাজী, তারপর প্রচুর সুরাপান করে নিদ্রাকাতর দেহে লম্ববান হল মাটির ওপর।
সূর্য অস্ত গেল। নজমবাজীর ঘুম ভাঙল না। কুটিরের মধ্যে ঘন হয়ে এল অন্ধকার। নজমবাজী তখনও গভীর নিদ্রায় মগ্ন…
অসহ্য যাতনায় আর্তনাদ করে জেগে উঠল নজমবাজী! এক লাফে শিকারের সামনে থেকে সরে গেল হায়না, তার মুখ থেকে ঝুলছে শ্রীমতী নজমবাজীর একটি পদপল্লবের অর্ধেক অংশ!
