বিচার শুরু হল। নজমবাজীর বিরুদ্ধে রয়েছে নরহত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। একটি নয়, দুটি নয়–ত্রিশটি মানুষকে নাকি হত্যা করেছে নজমবাজী! শুধু হত্যা করেই সে খুশি হয়নি, নিহত লোকগুলির মুণ্ড নিয়ে সে ঝুলিয়ে দিয়েছে তার কুটিরের দেয়ালে দেয়ালে!
বন্দিনী অভিযোগ অস্বীকার করল না। দৃপ্তকণ্ঠে সে বললে, হ্যাঁ, আমি ওদের হত্যা করেছি, ওদের মুণ্ডগুলো নিয়ে আমার ঘর সাজিয়েছি।
শকা প্রশ্ন করলেন, কেন? উত্তর এল, ক্ষমতা লাভ করার জন্য। আমি ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধ হয়েছি। ওই মুণ্ডগুলি আমার দরকার।
শকা গম্ভীর স্বরে বললেন, ভালো, ভালো। কিন্তু ওহে ডাইনি!–বলো দেখি, তোমার ডাকিনীবিদ্যা কি তোমাকে বাঁচাতে পেরেছে?… পারেনি। কারণ তোমার মন্ত্রের চাইতে আমার অস্ত্রের ক্ষমতা অনেক বেশি আর সেইজন্যই আজ তুমি আমার বন্দি। বুঝেছ?
বুঝেছি, বন্দিনীর ওষ্ঠাধরে ফুটল বিদ্রুপের হাসি, কিন্তু মহামান্য ডিশিংওয়ের মুণ্ডুটা তাহলে আমার দেয়ালে ঝুলছে কেন? বলো?
সমবেত জনতা স্তব্ধ নির্বাক। ডিশিংওয়ে রাজার প্রিয় বন্ধু। তাকে হত্যা করেছে নজমবাজী এবং রাজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কথা জানিয়ে বিদ্রূপ করতে সে ভয় পায় না–কী স্পর্ধা!
শকা গম্ভীর স্বরে বললেন, ওই মানুষটির মৃত্যু নিয়ে উপহাস করে তুমি খুব বুদ্ধির পরিচয় দাওনি। ডিশিংওয়ে ছিল ভালো মানুষ সে তোমার স্বামী জোয়েদি ও তোমার প্রতি উদারতা দেখিয়েছিল, তাই তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হল প্রাণ দিয়ে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। হায়নার মতো নিকৃষ্ট জীবকে যদি কেউ ভালোবাসে, বিশ্বাস করে তবে সেই হায়নার আক্রমণেই হতভাগ্যের মৃত্যু নিশ্চিত; তোমরাও হায়নার চাইতে উন্নত ধরনের জীব নও… ভালো কথা, নজমবাজী–শুনেছি হায়নাগুলি ডাকিনীদের অনুচর, ওরা নাকি ডাকিনীর আদেশ পালন করে ভৃত্যের মতো–কথাটা কি সত্যি?
–নিশ্চয়, সত্যি বই কী!
নজমবাজী ভাবল, ওই উত্তর শুনেই রাজা ঘাবড়ে যাবে।
জুলুরা সাহসী জাতি, দাঙ্গাহাঙ্গামায় ভয় পায় না কিন্তু ভৌতিক ক্রিয়াকলাপের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা, অশেষ ভীতি!
কিন্তু রাজা শকা অন্য ধরনের মানুষ, স্থির দৃষ্টিতে নজমবাজীর দিকে তাকিয়ে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি তো ডাইনি–তাহলে বনের হায়নারা তোমার অনুচর? তারা তোমার কথা শুনবে?
দৃঢ়স্বরে নজমবাজী বললে, শুনবে। সব কথা শুনবে।
বাঃ! বাঃ! খুব ভালো কথা, শান্ত স্বরে বললেন শকা, খুব ভালো! খুব ভালো! তাহলে তুমি তোমার কুটিরে ফিরে যাও। নরমুণ্ড সাজিয়ে যেখানে তুমি ক্ষমতার অধিশ্বরী হয়েছ, সেখানেই তুমি নিশ্চিন্তে বাস করো। আমার দেহরক্ষীরা তোমাকে খাদ্য ও পানীয় দিয়ে আসবে। একা একা তোমার খারাপ লাগতে পারে, তাই তোমাকে একটি উপযুক্ত সঙ্গীও দেওয়া হবে। আমার ভৃত্যরা কখনো তোমার কোনো ক্ষতি করবে না, তবে
-তবে?
–তবে তোমার সঙ্গীর জন্য কোনো আহার্য বা পানীয় দেওয়া হবে না। তার খাদ্যের ব্যবস্থা সে নিজেই করে নেবে।
নজমবাজী অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। রাজা কথা কইছেন খুব শান্তভাবে, কিন্তু সেই শীতল শান্ত স্বরে যেন এক ভয়াবহ ইঙ্গিত!
নজমবাজী প্রশ্ন করলে, তাহলে, তাহলে আমার শাস্তির কী ব্যবস্থা হল?
মৃদুকণ্ঠে উত্তর এল, যথাসময়ে তুমি জানতে পারবে…
.
নজমবাজীর পিছনে বন্ধ হয়ে গেল কুটিরের দরজা। হঠাৎ আলো থেকে অন্ধকারের মধ্যে এসে পড়লে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে ফেলে তার দৃষ্টিশক্তি নজমবাজীরও সেই অবস্থা হল।
বদ্ধদ্বার কুটিরের অন্ধকার তার চক্ষুকে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দিল বটে, কিন্তু নাসিকার ঘ্রাণশক্তি অন্ধকারের কাছে পরাজিত হল না–একটা তীব্র দুর্গন্ধ তার নাকে এসে ধাক্কা মারল! পশুর গায়ের গন্ধ!
নজমবাজী সাহসী মেয়ে। কিন্তু এইবার সে ভয় পেল। যে অজানা জীবটা ঘরের মধ্যে রয়েছে। তার জান্তব চক্ষু নিশ্চয়ই অন্ধকারের মধ্যেও সব কিছু দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু নজমবাজীর দৃষ্টিশক্তি এখনও আঁধারের যবনিকা ভেদ করে তাকে আবিষ্কার করতে পারছে না–ভয়ের কথা বই কী!
পাথরের মূর্তির মতো বদ্ধ দরজায় সে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইল… নিশ্চল, নীরব…
কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে উঠল রমণীর দৃষ্টিশক্তি, আর তখনই তার নজরে পড়ল কুটিরের শেষপ্রান্তে প্রায় বিশগজ দূরে মিট মিট করে জ্বলছে একজোড়া অগ্নিময় চক্ষু! তার কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে এল তীব্র আর্তনাদ, কী! কী! কী ওটা?
কুটিরের বাইরে ঘন ঘাসের আবরণ সরিয়ে প্রহরীরা জানতে চাইল কী হয়েছে। ভীত ত্রস্তস্বরে নজমবাজী বার বার প্রশ্ন করলে, কী আছে? কী আছে ঘরের মধ্যে? দপ দপ করে ওই যে জ্বলছে আর জ্বলছে–ও দুটো কার চোখ?
প্রহরীরা সবিনয়ে জানিয়ে দিল কুটিরের মধ্যে একমাত্র নজমবাজী ছাড়া অন্য কোনো বস্তু বা ব্যক্তির অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা সচেতন নয়।
কথা বলার সময়ে প্রহরীরা কুটিরের দেয়াল থেকে ঘাসের আবরণ সরিয়ে দিয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো কিছুটা এসে পড়ল অন্ধকার কুটিরের মধ্যে। আবছা আলো-আঁধারিতে এবার নজমবাজীর দৃষ্টিপথে ধরা পড়ল একজোড়া জ্বলন্ত চোখের নীচে একজোড়া বীভৎস চোয়াল!
দুই চোখের তীব্র দৃষ্টি সঞ্চালন করলে রমণী–অস্পষ্ট আলোছায়ার মধ্যে দেখা গেল লালা গড়িয়ে পড়তে পড়তে ফঁক হয়ে গেল সেই চোয়াল দুটি ঝক ঝক করে উঠল দুই চোয়ালের ফাঁকে অনেকগুলো তীক্ষ্ণধার দন্ত!
