সেই শয্যাই হল তার মৃত্যুশয্যা। প্রিন্স ফেসিনোর প্রধান চিকিৎসক যথাসাধ্য চেষ্টা করেও আমার ভাইকে বাঁচাতে পারলেন না। ফিলিপের মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গে আমি ইটালি ছেড়ে মাতৃভূমি ইংল্যান্ডে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলাম।
প্রিন্স ফেসিনো প্রচুর ধনদৌলত নিয়ে আমায় সাধাসাধি করলেন, বললেন, রোডেরিক, যদি তুমি আমার জন্য লড়াই করো তাহলে এই ধনদৌলত তোমার হবে। ভবিষ্যতে আমি তোমাকে আরও অর্থ দেব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
অভিবাদন জানিয়ে বললাম প্রিন্স ফিলিপ! আমি আর কোনোদিন লড়াই করব না। ভাই-এর মৃতদেহ স্পর্শ করে আমি অস্ত্রত্যাগ করার শপথ গ্রহণ করেছি। বিদায়!
সেখান থেকে এসে পৌঁছোলাম ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে একদিন উপস্থিত হলাম আলসফোর্ড শহরের সরাইখানায়, তারপর যা ঘটেছে তা তুমি জানো।
রবিনহুড হেসে বলল, কিন্তু রোডেরিক, তোমার শপথ ভঙ্গ হল যে!
রোডেরিক বলল, সেজন্যে আমি কিছুমাত্র দুঃখিত নই। মহৎ কারণেই আমি শপথ ভঙ্গ করেছি। অর্থোপার্জনের জন্যে যুদ্ধের নামে নরহত্যা করা অনুচিত, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাই প্রকৃত যোদ্ধার কর্তব্য।
রবিনহুড সঙ্গীর কাঁধে হাত রেখে বলল, আমাদের দলে এসে সেই কর্তব্য করার সুযোগ তুমি নিশ্চয়ই পাবে, রোডেরিক।
অস্তায়মান সূর্য যখন পৃথিবীর কাছে বিদায় গ্রহণ করছে, সেই সময় রবিনহুড ও বোডরিক প্রবেশ করল শেরউড বনের অভ্যন্তরে।
রবিনহুডের কাছে সমস্ত ঘটনা শুনে আর রোডেরিকের প্রকৃত পরিচয় পেয়ে উচ্ছ্বসিত আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল শেরউড বনের মুক্তিবাহিনী। উচ্ছ্বাসের কারণ ছিল; রোডেরিকের মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকে দলে পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। কেবলমাত্র ফ্রায়ার টকের আচরণে উত্তেজনার চিহ্নমাত্র দেখা গেল না, দাড়িতে হাত বুলিয়ে শান্তস্বরে সে বলল, আমি তো আগেই বলেছিলাম।
বাঘিনী
মানুষখেকো বাঘিনীকে মানুষ ভয় করে, ঘৃণা করে। কিন্তু সেই ভয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক ধরনের শ্রদ্ধা–এ-কথাও সত্যি।
মানুষ চিরকালই বীরত্বের পূজারি–তাই নরভুক বাঘিনীর হিংস্র স্বভাবের মধ্যেও সে যখন বীরত্বের সন্ধান পায় তখন নিজের অজান্তে তার মনে শ্রদ্ধার উদয় হয়।
আমি আজ কোনো চতুষ্পদ ব্যাঘ্রীর গল্প বলব না; আমার কাহিনির নায়িকা একটি দ্বিপদ রমণী যার সঙ্গে অনায়াসে বনচারিণী বাঘিনীর তুলনা করা যায়। শৌর্যে, সাহসে ও স্বভাবের ভীষণতায় এই মেয়েটি বাঘিনীর চাইতে কোনো অংশেই কম ছিল না।
আজকের কথা নয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে আমাদের নায়িকার কাহিনি। তবে এই কাহিনি শুরু করার আগে জুলুদের কথা একটু বলা দরকার। আফ্রিকার অধিবাসী এই জুলুজাতি সাহস ও বীরত্বের জন্য বিখ্যাত। কেবলমাত্র বর্শা ও তরবারি সম্বল করে জুলুরা আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বারংবার। রাইফেল ও মেশিনগানের কল্যাণে শ্বেতাঙ্গরা যুদ্ধে জয়লাভ করেছে বটে, কিন্তু তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে জুলুদের মতো নির্ভীক যোদ্ধা ইউরোপেও নিতান্ত দুর্লভ।
এই জুলুজাতির একটি মেয়েকে নিয়েই আমাদের কাহিনি। জোয়েদি নামক এক জুলু সর্দারের গৃহিণী ছিল নজমবাজী–আমাদের বর্তমান কাহিনির নায়িকা…
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে জুলুজাতির ইতিহাসে আবির্ভূত হলেন এক প্রচণ্ড পুরুষ–রাজা উ-শকা!
একাধিক পুস্তকে তার নামটিকে সংক্ষিপ্ত করে শকা নামে অভিহিত করা হয়েছে, আমরাও তাই বলব।
এই রাজা শকার কোপদৃষ্টিতে পড়ল জোয়েদি সর্দার এবং তার স্ত্রী নজমবাজী। জোয়েদি পালিয়ে বাঁচল, কিন্তু নজমবাজীকে শকার সৈন্যরা গ্রেপ্তার করে ফেলল।
রাজা শকার তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ। যুদ্ধের পর যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন শকা। রণডঙ্কা বাজিয়ে যেদিক দিয়ে ছুটে গেছে তার সেনাবাহিনী, সেইদিকেই ধরিত্রীর বুকে লম্বমান হয়েছে অগণিত মানুষের রক্তাক্ত মৃতদেহ।
এমন একটি মানুষের সম্মুখীন হলে অনেক সাহসী পুরুষের বুকের রক্ত জল হয়ে যায়, কিন্তু নজমবাজীকে যখন বিচারের জন্য শকার সামনে নিয়ে আসা হল তার চালচলনে ভয়ের আভাস ছিল না কিছুমাত্র!
গর্বিত পদক্ষেপে রাজার সম্মুখে এসে দাঁড়াল রমণী। তার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টিতে নেই আতঙ্কের ছায়া–রুদ্ধ আক্রোশ ও ঘৃণায় দপদপ করে জ্বলছে বন্দিনীর দুই চক্ষু
রাজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল নজমবাজী। জুলুজাতি এবং তাদের রাজা শকাকে উচ্চৈঃস্বরে সে অভিশাপ দিতে লাগল বারংবার।
সমবেত জুলুদের মধ্যে অনেকেই ভীত হল। মারামারি কাটাকাটি করতে জুলুরা ভয় পায় না, কিন্তু ভূত প্রেত মন্ত্রতন্ত্র সম্পর্কে তাদের আতঙ্ক অপরিসীম। নজমবাজী ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধ, তাই সকলেই তাকে ভয় করত যমের মতো।
কিন্তু রাজা শকা অন্য ধরনের মানুষ আততায়ীর তরবারি এবং ডাকিনীর মন্ত্র তার কাছে সমান উপহাসের বস্তু। শরীরী বা অশরীরী কোনো জীবকেই তিনি পরোয়া করতেন না।
শকা বন্দিনীকে চুপ করতে বললেন। তিক্তস্বরে নজমবাজী বললে, বিচারের রায় আগে দিয়ে দাও রাজা পরে না হয় বিচার কোরো! ফলাফল কী হবে তা তো জানা আছে, মিছামিছি সময় নষ্ট করে লাভ কী?
রাজা শান্তস্বরে বললেন, আমি তোমার বিচার করছি বটে, তবে তোমার কথাগুলো আমায় শুনতে হবে। আমি ন্যায়বিচার করতে চাই। তোমার একটি সাধারণ ছোট্ট কথার জন্য হয়তো আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারি।
