সেদিন প্রভাতে প্রিন্স ফেসিনো নগর আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে প্রধান সেনানায়কদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন, এমন সময়ে হঠাৎ নগরীর সিংহদ্বার খুলে লোগি রাজ্যের রাজদূত অশ্বারোহণে সর্বসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করল, হাতে তার শান্তির প্রতীক শ্বেত পতাকা!
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সন্ধির প্রস্তাব করার পাত্র তো রাজা নিকোলো নন। প্রিন্স ফেসিনো ক্রুদ্ধস্বরে বললনে, নিকোলো নিশ্চয়ই কোনো শয়তানি মতলব করেছে।
সেনানায়করাও প্রিন্সের কথায় সায় দিয়ে কয়েকটি মন্তব্য প্রকাশ করলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ কারও মাথা ঘামাতে হল না, অশ্বারোহী রাজদূত বজ্রগম্ভীর স্বরে ঘোষণা করল, লোগি রাজ্যের অধিপতি রাজা নিকোলোর আদেশ অনুসারে ঘোষণা করছি, আমাদের নির্বাচিত যোদ্ধা প্রিন্স ফেসিনোর নির্বাচিত যোদ্ধাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছে। দ্বৈরথ রণের ফলাফলের উপর দুই রাষ্ট্রের জয় পরাজয় নির্ধারিত হবে। আশা করি মন্টফেরাট রাজ্যের অধিপতি প্রিন্স ফেসিনো দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান উপেক্ষা করবেন না। এই রইল লৌহ দস্তানা
একটি লৌহ-দস্তানা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে রাজদূত বলল, যার সাহস আছে, সে এগিয়ে এসে এই দস্তানা গ্রহণ করুক।
(তখনকার দিনে ওই ভাবেই দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানানো হত। যে ব্যক্তি দ্বৈরথ রণে অংশগ্রহণ করত, সে স্বয়ং গ্রহণ করত ওই লৌহ দস্তানা।)
প্রিন্স ফেসিনো তাঁর যোদ্ধা নির্বাচন করার সময় পেলেন না, তার আগেই আমি এগিয়ে এসে দস্তানা তুলে নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বললাম, মন্টফেরাট রাজ্যের পক্ষ থেকে আমি দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান গ্রহণ করলাম। লোগি রাজ্যের নির্বাচিত যোদ্ধার সঙ্গে আমি একঘণ্টা পরে এখানেই মিলিত হব। রাজদূত, তোমাদের যোদ্ধাকে প্রস্তুত হতে বলো।
নগর-প্রাকারের উপরে এবং নগরীর বহির্ভাগে দণ্ডায়মান পরস্পরবিরোধী দুই দল সৈন্যের কণ্ঠে জাগল তীব্র উল্লাসধ্বনি।
একঘণ্টার মধ্যেই মস্তক, মুখ ও সর্বাঙ্গ লৌহবর্মে আবৃত করে ভল্ল, ঢাল ও রণকুঠার নিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করলাম, তারপর নগরকারের সম্মুখে মুক্ত প্রান্তরের উপর অপেক্ষা করতে লাগলাম প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নগরীর সিংহদ্বার দিয়ে আবির্ভূত হল আপাদমস্তক বর্মাবৃত ঢাল ও ভল্লধারী এক ব্যক্তি- রাজা নিকোলোর নির্বাচিত যোদ্ধা অর্থাৎ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। অশ্বপৃষ্ঠ থেকে স্থানচ্যুত হলে অথবা ভল্ল ভগ্ন হলে লড়াই করার জন্য আমি নিয়েছিলাম কুঠার আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণ করেছিল সুদীর্ঘ তরবারি।
মধ্যস্থ যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্কেত দিল। সঙ্গেসঙ্গে আমরা দুই প্রতিদ্বন্দী উদ্যত ভল্ল হাতে পরস্পরকে লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম। আমরা পরস্পরের ভল্পের আঘাত ঢালের উপর গ্রহণ করলাম এবং সংঘাতের বেগে ভারসাম্য হারিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লাম মাটির উপর। এবার আর ঘোড়ার পিঠে নয়, মাটির উপর দাঁড়িয়ে শুরু হল মৃত্যুপণ যুদ্ধ। আমি তুলে নিলাম রণকুঠার, প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে ঝক ঝক করে উঠল শাণিত তরবারি।
ঊর্ধ্বে তরবারি তুলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কঠোর স্বরে বলল, তোর শরীর মানুষের কিন্তু মাথাটা কুকুরের। কুকুরের মাথা মানুষের দেহে শোভা পায়না। অতএব মাথাটা আমি এখনই কেটে ফেলব।
দারুণ ক্রোধে আমার রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠল, কুঠার আস্ফালন করে বললাম, আমার কুঠার তৃষ্ণার্ত হয়েছে। ওরে লোগির শূকর, তোর রক্তে কুঠারের তৃষ্ণা শান্ত করব।
প্রতিদ্বন্দী সবেগে ছুটে এসে আঘাত হানল। কুঠারে প্রতিহত হল তরবারি। আবার, আবার, আবার। বারংবার হত্যার আগ্রহে ঝাঁপ দিল তরবারি এবং প্রতিবারই কুঠার ফলকে ব্যর্থ হল আক্রমণ। তারপর আমি এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলাম। কুঠার নামিয়ে এগিয়ে গেলাম প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। সে তৎক্ষণাৎ আঘাত হানল আমার অরক্ষিত মস্তক লক্ষ্য করে। আমি কুঠার তুললাম, কিন্তু কুঠার ফলকের পরিবর্তে আড়াআড়িভাবে হাতলের উপর অসির আঘাত গ্রহণ করলাম। প্রচণ্ড সংঘাতে অসিধারীর হাতের মাংসপেশী ক্ষণিকের জন্য অসাড় হয়ে গেল; মুহূর্তের দুর্বলতার সুযোগ নিলাম আমি, দুই হাতে কুঠার ধরে প্রচণ্ড আঘাত হানলাম প্রতিদ্বন্দ্বীর স্কন্ধে। সেই দারুণ আঘাত সহ্য করতে পারল না লোগির যোদ্ধা, সে লুটিয়ে পড়ল মাটির উপর। প্রিন্স ফেসিনোর সৈন্যদল উল্লাসে গর্জন করে উঠল। নগরকারের শত্রু সেনা স্তব্ধ নির্বাক।
আমি এগিয়ে গেলাম। লৌহ-মুখোশ উন্মোচন করে শত্রুর মুখ দেখব এবং চরম আঘাতে শেষ করে দেব তার ইহলীলা। একহাতে মুখোশ খুলে অন্য হাতে কুঠার তুলে ধরলাম।
সঙ্গেসঙ্গে হিম হয়ে গেল আমার দেহের রক্ত, এ কি! আমার ছোটো ভাই ফিলিপ! একেই আমি আঘাত করেছি। হয়তো এই আঘাতের ফলে তার মৃত্য হবে, শেষকালে ভ্রাহ্য করলাম।
কে জানত আমার ভাই ফিলিপও সৈনিকের পেশা গ্রহণ করেছে এবং নিয়তির নিষ্ঠর পরিহাসে ইটালিতে এসে আমার বিরোধীপক্ষে যোগ দিয়েছে।
দেখলাম তখনও তার দেহে প্রাণ রয়েছে। তাকে দুই হাতে তুলে নিলাম আমার বুকের উপর।
প্রিন্স ফেসিনোর সেনাদল তখন আমার নামে জয়ধ্বনি তুলে আকাশ ফাটাচ্ছে। কিন্তু আমি কোনোদিকে দৃকপাত না করে ভাইকে নিয়ে প্রবেশ করলাম আমার নিজস্ব শিবিরে এবং শুইয়ে দিলাম আমারই শয্যার উপর।
