ভীষনদর্শন এক রণকুঠার হাতে দাঁড়িয়েছিল জনৈক নর্ম্যান সৈন্য। সে কুঠার আস্ফালন করে প্রতিবাদে মুখর জনতার উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল, চুপ কর শয়তানের দল। বেশি চিৎকার করলে এই কুঠারের ধার তোদের উপর পরখ করব।
আচম্বিতে তার মুখের উপর পড়ল এক প্রচণ্ড মুষ্ট্যাঘাত, সঙ্গেসঙ্গে প্রবল আকর্ষণে তার কুঠার হল হস্তচ্যুত! যে ব্যক্তি কুঠার ছিনিয়ে নিয়েছিল, সে বিদ্যুৎবেগে কুঠার চালাল, এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল কয়েকজন নর্মান সৈন্য। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সৈন্যদের বেষ্টনী ভেঙে কুঠারধারী মঞ্চের কাছে ছুটে গেল এবং কেউ বাধা দেবার আগেই এক লাফে উঠে পড়ল মঞ্চের উপর।
মঞ্চে দণ্ডায়মান দলপতি সভয়ে পিছিয়ে গেল বন্দির সম্মুখ থেকেতার পার্শ্বরক্ষী তিনজন নর্ম্যান সেনা উদ্যত তরবারি হাতে কুঠারধারীকে আক্রমণ করল।
বন্যার মুখে বালির বাঁধ যেমন ভেসে যায়, তেমনি ভাবেই ব্যর্থ হয়ে গেল নর্ম্যানদের প্রতিরোধের প্রয়াস, রক্তাক্ত দেহে তিন সৈনিক লুটিয়ে পড়ল মঞ্চের উপর। দলপতি একলাফে মঞ্চ ত্যাগ করে সরে গেল কুঠারের নাগালের বাইরে। একটি ভূপতিত সৈনিকের তরবারি নিয়ে কুঠারধারী ব্যক্তি রবিনের বন্ধনরঙ্কু ছিন্ন করল, তারপর তলোয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল, রবিন! অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হও। ওরা আসছে।
রবিনহুড সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, রোডেরিক, তুমি!
হ্যাঁ আমি। কিন্তু কথা বলার সময় নেই। ওই দেখ, ওরা আসছে। সত্যই তাই। ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষণেকের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে অবস্থিত নর্মান সেনাদল। এখন সম্বিত ফিরে পেয়ে তারা অস্ত্র তুলে ছুটে আসছে মঞ্চের দিকে।
রক্তাক্ত কুঠার শূন্যে উত্তোলন করে রোডেরিক বলল, রবিন, ওরা আসছে।
ঊর্ধ্বে তরবারি নাচিয়ে রবিনহুড বলল, রোডেরিক, যারা আসছে তারা অনেকেই আর ফিরে যাবে না।
লড়াই শুরু হল। রবিনহুডের ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হতাহত সঙ্গীদের ফেলে নর্মান সৈন্যরা চম্পট দিল। তারা বুঝেছিল বেশিক্ষণ এখানে থাকলে তাদের মধ্যে একটি মানুষও জীবিত থাকবে না।
সমবেত জনতার ভিতর থেকে জাগল প্রবল উল্লাসধ্বনি, রবিনহুডের জয় হোক! শেরউড বনের রবিনহুড দীর্ঘজীবী হোক!
ধরাশায়ী নর্মান সেনাদের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে রবিনহুড বলল, এবার আমাদের এখান থেকে সরে পড়াই ভালো। একটু পরেই দলে ভারি হয়ে নর্ম্যানরা এখানে ছুটে আসবে। সম্ভবত শেরিফ মহাশয়ও তার তিরন্দাজদের নিয়ে এখানে উপস্থিত হবেন।
সায় দিয়ে রোডেরিক বলল, হ্যাঁ রবিন। ঠিক বলেছ। এই জায়গাটা আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে বিশেষ ভালো হবে বলে মনে হয়না। এইবেলা সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
দুজন চটপট স্থানত্যাগ করল।
বনের পথে চলতে চলতে রবিনহুড বলল, রোডেরিক, আমি ভেবেছিলাম তুমি নিতান্ত নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ। কিন্তু তোমার কাণ্ড দেখে আমি দস্তুর মতো চমকে গিয়েছি।
রোডেরিক বলল, অশান্তি যখন আঘাত হানে, শান্তিরক্ষার চেষ্টা তখন বিড়ম্বনা মাত্র। তাই নিরীহ মানষের ভমিকা ত্যাগ করে আমি যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলাম।
রোডেরিক, তোমার মুখে শুনেছিলাম তুমি নাকি ইংল্যান্ডে ছিলে না। কোথায় ছিলে জানতে চাইলেও তুমি উত্তর দাওনি। এখন যদি সেই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করি বোধ হয় সদুত্তর পাব।
আমি দীর্ঘকাল ইটালিতে ছিলাম, একটু ইতস্তত করে রোডেরিক বলল, রবিন তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। অত্যাচারী নর্মানদের বিরুদ্ধে তুমি ও তোমার সঙ্গীরা যেভাবে জেহাদ ঘোষণা করেছ সেটা সত্যই প্রশংসনীয়। আমিও তোমাদের দলে যোগ দিতে চাই। আশা করি শেরউড বনের আস্তানায় আমাকে স্থান দিতে এবার তুমি আপত্তি করবে না।
রবিনহুড হেসে বলল, তোমার মতো মানুষকেই তো আমরা চাই। কিন্তু দলে আসতে হলে তোমার যথার্থ পরিচয় আমাদের জানা দরকার।
ভ্রূ কুঞ্চিত করে কিছুক্ষণ নীরবে পদচালনা করল রোডেরিক, তারপর হঠাৎ মুখ তুলে বলল, সব কথাই বলব। আমার মনের মধ্যে একটা দারুণ ঝড় ছুটোছুটি করছে। কোনো একজনকে সব কথা খুলে বলতে না পারলে আমি শান্তি পাবনা। রবিন, তোমার চেয়ে উপযুক্ত শ্রোতা আর কোথায় পাব?
একটু থেমে রোডেরিক তার আত্মকথা শুরু করল, আমি পেশাদার সৈনিক, অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধ করাই ছিল আমার জীবিকা।* ইটালিতে অবস্থিত মন্টফেরাট রাজ্যের অধিপতি প্রিন্স ফেসিনোর হাত থেকে অর্থ নিয়ে আমি তাঁর বাহিনীতে ভাড়াটে সৈনিক হিসাবে লড়াই করতে সম্মত হই। [*দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপের চেহারার সঙ্গে আজকের ইউরোপের কোনোই সাদৃশ্য নেই। সেই সময় ইউরোপের বহু রাজ্যই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। ওইসব রাষ্ট্রের অধিপতিগণ প্রায় সর্বদাই পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত থাকতেন। বর্তমান কাহিনিতে উল্লিখিত মন্টফেরাট ও লোগি নামক রাজ্য দুটি তৎকালীন ইটালির উত্তর অংশে অবস্থান করত।] অনেকগুলি লড়াইতে আমি অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করি। আমার বীরত্বে খুশি হয়ে প্রিন্স ফেসিনো আমাকে প্রচুর স্বর্ণ দিয়ে পুরস্কৃত করেন। প্রতিবেশী রাজ্য লোগির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ঘোষণা করলেন প্রিন্স ফেসিনো। লোগির রাজা নিকোলো সাহসী রণনিপুণ পুরুষ, তাঁর অধীনে ছিল বহুসংখ্যক বীর্যবান যোদ্ধা। বিনা প্রতিবাদে প্রিন্স ফেসিনোর হাতে রাজ্য সমর্পণ করতে রাজি হলেন না রাজা নিকোলো। যুদ্ধ ক্রমশ ভীষণ থেকে ভীষণতর হয়ে উঠল। অবশেষে একদিন প্রিন্স ফেসিনোর সৈন্যদল রাজা নিকোলোর রাজধানীর দ্বারে উপস্থিত হয়ে নগর অবরোধ করল।
