নির্জীব নিস্মাণ কণ্ঠে উত্তর এল, রোডেরিক।
তৎকালীন ইংল্যান্ডে রবিনহুডের নাম শুনেও নির্বিকার থাকতে পারে এমন মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রবিন সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, তুমি কি কখনও আমার নাম শোননি?
না। আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম না।
কোথায় ছিলে?
উত্তর নেই। তরুণ নির্বাক।
রবিনহুড আর কথা বলার চেষ্টা করল না। অশ্বকে সবেগে চালনা করল শেরউড বনে তার আস্তানার দিকে।
শেরউড বনে রবিনহুডের আস্তানায় কয়েকটা দিন অতিবাহিত হল। রোডেরিকের ক্ষতস্থান ধুয়ে দলের চিকিৎসক ফ্রায়ার টাক ঔষুধ প্রয়োগ করে তাকে সুস্থ করে তুলল। কিন্তু রোডেরিকের আচরণ পূর্ববৎ। সে কারও সঙ্গেই কথা বলে না। শূন্যে দৃষ্টি মেলে গাছের তলায় বসে থাকে। প্রশ্ন করলে কখনও উত্তর দেয়, কখনও দেয় না, খাওয়ার ডাক পড়লে নিঃশব্দে এসে আহার গ্রহণ করে উঠে যায়।
রোডেরিকের সম্পর্কে সব কথাই দলের লোকেদের জানিয়েছিল রবিনহুড। প্রায় এক সপ্তাহ পরে দলের সবাই মিলে গল্পগুজব করছে, এমন সময় হঠাৎ লিটল জন বলে উঠল, ওহে রবিন, এই রোডেরিক ছোকরার ব্যাপারটা কি বলো তো? ছোকরার কোনো ব্যাপারেই গা নেই। মনে হয় আদর-ভালোবাসা, অবহেলা-অপমান সব কিছুই তার কাছে সমান, কোনো কিছুতেই তার স্পৃহা নেই।
উইল স্কারলেট বলল, রবিন। তোমার কাছে যা শুনেছি, তাতে মনে হয় ছেলেটা অতিশয় ভীরু। নর্ম্যান সৈন্যরা যখন তাকে প্রহার করছিল, সে বাধা দিতেও সাহস করেনি। একেবারেই মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ!
ফ্রায়ার টাক এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এইবার সে মুখ খুলল, ছেলেটার মনে কষ্ট আছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রয়োজন ওর কাছে ফুরিয়ে গেছে। ওকে শান্তিতে দিন যাপন করতে দাও, এক সময়ে হয়তো সে জীবনধারণের সার্থকতা খুঁজে পাবে।
একটু দুরেই একটা গাছের তলায় চুপ করে বসেছিল রোডেরিক। তার দিকে তাকিয়ে রবিনহুড হাঁক দিল, রোডেরিক, শুনে যাও।
যন্ত্রচালিতের মতো ধীর পদক্ষেপে রোডেরিক এসে দাঁড়াল রবিনহুডের সামনে।
রবিনহুড বলল, রোডেরিক, কয়েকদিন পরেই নটিংহ্যামের বাজারে তাতি উইলফ্রেড কাপড় বিক্রি করতে আসবে। যে-সব মাল বিক্রি হবে না, সেগুলোকে ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে উইলফ্রেড যাবে ইয়র্ক শহরে। তুমিও যাবে তার সঙ্গে। ঘোড়ার গাড়ির ভিতর থাকলে নর্মানরা তোমাকে দেখতে পাবেনা। এই অঞ্চল ছেড়ে ইয়র্ক শহরে গেলে তুমি নিরাপদ। এখানেও তোমার বিপদের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এটা হচ্ছে যোদ্ধাদের আস্তানা, এখানে তুমি বেশিদিন থাকতে পারবেনা।
নির্দিষ্ট দিনে নটিংহ্যামের বাজারে এসে অপেক্ষা করতে লাগল রবিনহুড ও রোডেরিক। ঠিক দুপুর বেলায় আসবে উইলফ্রেড। রবিন ও রোডেরিক একটু আগেই এসে পড়েছিল, অতএব অপেক্ষা করতেই হবে দুপুর পর্যন্ত।
তাদের বরাত খারাপ। একদল নর্ম্যান সৈন্য বাজরের মধ্যে টহল দিচ্ছিল। তাদের মধ্যে ছিল সরাইখানার নর্মান দলপতি, এতদিনেও তার গায়ে ব্যথা যায়নি। হঠাৎ তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল রবিনহুডের দিকে।
রবিনহুড ও রোডেরিক কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে এসেছিল। কিন্তু রবিনের মাথায় কালো কাপড়ের আবারণ থাকা সত্ত্বেও শত্রুকে চিনে ফেলল দলপতি। তৎক্ষণাৎ সে চিৎকার করে। সৈন্যদের বলল, ওই যে স্যাক্সন কুকুরটা দাঁড়িয়ে আছে। মনে করেছে কালো কাপড়ে মাথা ঢাকলে ওকে কেউ চিনতে পারবেনা। সৈন্যগণ! ওকে ধর। শয়তানটা যেন পালাতে না পারে।
একপাল হিংস্র নেকড়ের মতো ছুটে এল নর্মান সৈন্যদল। সঙ্গেসঙ্গে রবিনহুডের হাতে সূর্যালোকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ঝক ঝক করে উঠল কোষমুক্ত তরবারি। কিন্তু রোডেরিক পিছন ফিরে ছুটল তিরবেগে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
নর্ম্যানরা রোডেরিকের দিকে একবারও তাকাল না, তাদের দৃষ্টি তখন রবিনহুডের দিকে।
সংঘর্ষ শুরু হল। দুজন নর্ম্যান সেনা আহত হয়ে আর্তনাদ করতে করতে হাতের অস্ত্র ফেলে দিল। রবিনের হাতের ঘূর্ণিত অসি বারংবার ব্যর্থ করে দিল শত্রুর দলবদ্ধ আক্রমণ। কিন্তু এতগুলো লোকের বিরুদ্ধে একটিমাত্র মানুষ কতক্ষণ যুদ্ধ করতে পারে? একটা কাটা বসানো লৌহমুষল সজোরে এসে পড়ল রবিনের মাথায়, সঙ্গেসঙ্গে অচৈতন্য হয়ে সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
নর্ম্যান দলপতি রূঢ়স্বরে বলল, ওকে বেঁধে ফেল। আদেশ পালিত হল তৎক্ষণাৎ। হঠাৎ একজন নর্মান সৈন্য সংজ্ঞাহীন বন্দির মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলে উঠল, আরে! আরে! এ যে দেখছি স্যাক্সন দস্য রবিনহুড! রাজদরবার থেকে রবিনহুডের ছিন্নমণ্ডের জন্য এক সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
অট্টহাস্য করে নর্মান দলপতি বলল, বাজারের মাঝখানে মঞ্চের উপর যে থামটা রয়েছে, সেই থামের সঙ্গে ওকে বেঁধে ফেলে শেরিফকে খবর দাও। মৃত্যুদণ্ড তার সামনেই অনুষ্ঠিত হবে। ওই সঙ্গে তিনি যেন পুরস্কারের সহস্র স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আসেন।
রবিনহুডের যখন জ্ঞান ফিরে এল, সে দেখল তাকে থামের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। নর্ম্যান দলপতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বন্দির দিকে তাকিয়েছিল, রবিনহুডকে চোখ মেলে চাইতে দেখে সে বলে উঠল, ওরে স্যাক্সন কুকুর! তোকে এখনই হত্যা করা হবে। কিন্তু তার আগে আমি একটু হাতের সুখ করে নিতে চাই।
বলার সঙ্গেসঙ্গে হাত চলল, বন্দির মুখের উপর প্রচণ্ড বেগে এসে পড়ল দলপতির বদ্ধমুষ্টি। রবিনের মুখ থেকে একটিও শব্দ শোনা গেল না, কেবল তার চোখ দুটো দারুণ ক্রোধে জ্বলে উঠল। চারপাশে দণ্ডায়মান জনতা নর্মান দলপতির নিষ্ঠুর আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে লাগল উচ্চৈঃস্বরে। হয়তো তারা রবিনহুডকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসত, কিন্তু সশস্ত্র নর্মান সৈন্যদের বেষ্টনী ভেদ করে মঞ্চের সামনে যাওয়ার ক্ষমতা জনতার ছিল না।
