এই অভাবিত স্পর্ধায় তিন সৈনিক স্তম্ভিত হয়ে গেল। আগন্তুকের পরনে স্যাক্সনদের মতো পোশাক। মাথায় সুন্দর টুপি। টুপি আর পোশাকের রং ঘন সবুজ। টুপির উপর সযত্নে বসানো হয়েছে একটি পাখির পালক। নাকের তলায় সরু গোঁফের দুই প্রান্ত ঔদ্ধত্যে উন্নত, চোয়াল পরিষ্কার ভাবে কামানো, শুধু চিবুকের উপর অবস্থান করছে একটুখানি ছাগল-শাড়ি! এক নজরে দেখলেই বোঝা যায়, লোকটি দস্তুরমতো শৌখিন।
তবে চেহারা ও পোশাকে বাহার থাকলেও মানুষটি যে নিতান্ত নিরীহ ফুলবাবুটি নয়, সে কথা বুঝতে কষ্ট হয় না। কারণ, তার কোমরের বাঁ দিকে ঝুলছে একটি দীর্ঘ তরবারি! কটিবন্ধের ডান দিকে একটি সুবৃহৎ শিঙাও দৃশ্যমান। শিঙাটি কোন কাজে লাগবে কে জানে, কিন্তু আপস্তুকের চোখের দৃষ্টি দেখলেই বোঝা যায়, তলোয়ারটা কেবল অঙ্গশোভার জন্য কটিদেশে স্থান গ্রহণ করেনি, তলোয়ারের মালিক ওই বস্তুটিকে ভালোভাবেই ব্যবহার করতে জানে।
নর্মান সেনারাও সশস্ত্র। তাদের কটিদেশেও অবস্থান করছে শাণিত তরবারি। উপরন্তু তাদের দেহ লোহবর্মে সুরক্ষিত এবং তারা দলে ভারি, একের বিরুদ্ধে তিন! তবু আগন্তুকের অতর্কিত আবির্ভাব ও উদ্ধত আচরণে তারা চমকে গিয়েছিল। বর্মধারী তিনজন সৈনিকের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ নাগরিকের এমন উদ্ধত আচরণ কল্পনা করা যায়না।
বিস্ময়ের চমক কেটে যেতেই নর্মান সৈন্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। যে সৈনিকের কাঁধে হাত দিয়ে আগন্তুক সরিয়ে দিয়েছিল, সে ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এল, কে তুই? এখানে তোর কী দরকার? স্যাক্সন হয়ে তুই নর্মান সেনার গায়ে হাত দিস? তোর এত স্পর্ধা?
আগন্তুক হাসল, স্পর্ধা আমার একটু বেশি সন্দেহ নেই। আর দরকার? হ্যাঁ, দরকার একটু আছে। এইমাত্র কড়া ওষুধ দেওয়ার কথা হচ্ছিল না? আমি চিকিৎসক, রোগ বুঝে ওষুধ দিতে এসেছি।
মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই আগন্তুক হাত চালাল। স্যাক্সন তরুণকে যে সৈন্যটি লাথি মেরেছিল, মুখের উপর ঘুসি খেয়ে সে সশব্দে ধরাশয্যা গ্রহণ করল। তার দুই সঙ্গী সবিস্ময়ে দেখল লোকটি একটুও নড়াচড়া করছে না, সে অজ্ঞান হয়ে গেছে!
আগন্তুক নর্ম্যান সেনাদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যে অপেক্ষা করল না। তার মুষ্টিবদ্ধ হস্ত আবার আঘাত হানল দ্বিতীয় সৈনিকের উদরে। দুই হাতে পেট চেপে দ্বিতীয় সৈনিক অসহ্য যাতনায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তেই আগন্তুক বলল, তোমার পেট ব্যথা করছে নাকি? নিশ্চয়ই খাবার হজম হয়নি। এখন তাহলে একটু শুয়ে বিশ্রাম করা উচিত।
সঙ্গেসঙ্গে চোয়ালের উপর পড়ল আর একটি মুষ্ট্যাঘাত এবং দ্বিতীয় সৈনিকও জ্ঞান হারিয়ে লম্ববান হল ভুমিপৃষ্ঠে।
তৃতীয় ব্যক্তি ছিল সৈন্যদলের সেনাপতি, সে এতক্ষণ কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়েছিল, সমস্ত ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে, সে মারামারিতে অংশগ্রহণ করার সময়ই পায়নি।
এবার খ্যাপা ষাঁড়ের মতো গর্জন করে সে আগন্তুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পরক্ষণেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে মাটির উপর গড়াগড়ি খেতে লাগাল। আচম্বিতে দলপতির বিশাল দেহ শূন্যে ছিটকে উঠে ঘরের দেয়ালে আছড়ে পড়ল এবং সেখান থেকে মেঝের উপর পড়ে স্থির হয়ে গেল।
আগন্তুক ধরাশয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, তারপর ডান হাতে ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এসে দলপতির মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে শত্রুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। পর্যবেক্ষণের ফলাফল বোধহয় সন্তোষজনক হল। কারণ, আগন্তুকের ঘুসি পাকানো মুঠি শিথিল হয়ে এল এবং গোঁফের তলায় দেখা দিল ব্যঙ্গের হাসি। সরাইখানার মালিকের দিকে তাকিয়ে সে স্মিতমুখে বলল, খোকা ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন ও কিছুক্ষণ ঘুমাবে। বড়ো দুষ্টুমি করছিল, তাই ওদের ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।
সরাইখানার মালিক নর্ম্যান। সৈন্যদের উপর সহানুভূতি থাকলেও তাদের হয়ে কিছু বলার সাহস তার ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটা স্বচক্ষে দর্শন করে সে বুঝেছিল, আগন্তুক মুষ্টিযুদ্ধ ও মল্লযুদ্ধে অতিশয় দক্ষ। এমন মানুষকে ঘাঁটানো বিপজ্জনক, অতএব সে বুদ্ধিমানের মতো মৌনব্রত অবলম্বন করল।
আহত স্যাক্সন তরুণকে আগন্তুক হাত ধরে তুলল। তরুণের আচরণে উত্তেজনার চিহ্ন নেই। এইমাত্র তাকে কেন্দ্র করে চারপাশে যে ঘটনা ঘটে গেল সে-বিষয়ে সে আদৌ সচেতন নয়।
আহত তরুণকে ধরে সরাইখানার বাইরে যেতে যেতে আগন্তুক বলল, আমি ঠিক সময়েই এসে পড়েছিলাম।
নিষ্প্রাণ, নিরুৎসুক স্বরে তরুণ বলল, ধন্যবাদ মহাশয়, কিন্তু আপনি না এলেও বোধহয় বিশেষ ক্ষতি ছিল না।
আরও কিছুদূর এগিয়ে এসে গাছতলায় বাঁধা একটি ঘোড়ার কাছে দাঁড়াল আগন্তুক। তারপর তরুণকে উদ্দেশ্য করে বলল, উঠে পড়ো। ঘোড়ায় চড়ার অভ্যাস আছে নিশ্চয়ই? না থাকলেও অসুবিধা হবে না, আমি তোমার পিছনে উঠে তোমাকে ধরে রাখব।
আগন্তুক সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এল, কিন্তু তার প্রসারিত হস্তকে উপেক্ষা করে তরুণটি মুহূর্তের মধ্যে অশ্বপৃষ্ঠে স্থান গ্রহণ করল। কিছুক্ষণ অশ্বারোহণে চলার পর আগন্তুক বলল, আমরা এখন শেরউড বনের দিকে চলেছি।
তরুণ নির্বাক। মনে হয়, কোথায় যাওয়া হচ্ছে অথবা চারপাশে কি ঘটছে সে-বিষয়ে তার কিছুমাত্র কৌতূহল নেই।
স্তব্ধতা ভঙ্গ করল আগন্তুক, আমার নাম রবিনহুড। আমি মাঝে মাঝে এই অঞ্চলে টহল দিয়ে থাকি, কারণ চারপাশে কি ঘটছে সেটা জানা আমার কর্তব্য। ভাগ্যক্রমে এদিকে এসে পড়েছিলাম বলেই নর্মান সেনাদের অত্যাচার থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারলাম। ভালো কথা, তোমার নাম কি?
