কিন্তু বাঘের সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
একে একে সব কুটিরগুলোর মধ্যেই পাথর বৃষ্টি করে যখন বাঘের সাড়া পাওয়া গেল না, তখন মেজর সাহেব গোয়ালঘর আক্রমণ করলেন। এইবার ফল হল অন্ধকার গোয়ালঘরের ভিতর থেকে ভীষণ গর্জন করে বাঘ জানিয়ে দিল, এই সব পাথর ছোঁড়াছুড়ির ব্যাপারটা সে মোটেই পছন্দ করছে না!
বাঘের সাবধানবাণীতে মেজর কিন্তু কর্ণপাত করলেন না। দ্বিগুণ উৎসাহে তিনি পাথর ছুঁড়তে লাগলেন। গোয়ালঘরের অন্ধকার গর্ভ থেকে ভেসে আসা গর্জন ধ্বনি ক্রমশ হয়ে উঠল আরও ভয়ঙ্কর, আরও তীব্র, আরও হিংস্র!
অবশেষে সম্মুখযুদ্ধে আত্মপ্রকাশ করল বাঘ। এত দ্রুতবেগে সে গোয়ালঘরের ভিতর থেকে বাইরে এল, এমন অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সে মেজরকে লক্ষ্য করে লাফ দিল যে, সমস্ত ব্যাপারটা তিনি ভালো করে বুঝতেই পারলেন না। তিনি শুধু দেখলেন, কালো-হলুদ ডোরাকাটা এক জীবন্ত বিদ্যুৎ শূন্যকে বিদীর্ণ করে উড়ে আসছে তারই দিকে!
নিশানা স্থির করার সময় নেই তখন, রাইফেল তুলে ট্রিগার টিপে দিলেন মেজর। রাইফেল গর্জে উঠল। পরক্ষণে এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে মেজর সাহেব ঠিকরে পড়ে গেলেন মাটির উপর। ভাগ্যক্রমে রাইফেলটা তার হস্তচ্যুত হয়নি, তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, মাত্র কয়েক হাত দূরে তিনি ছিটকে পড়েছেন।
মেজর তখন এত উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন যে, বাঘের ধারালো নখের আঘাতে তার জামাটা যে ছিঁড়ে গেছে, সেটা খেয়ালই করেননি। পরে অবশ্য তিনি বুঝেছিলেন, একটুর জন্য তার জীবন বেঁচে গেছে- বাঘের লাফ ফসকে গেছে, দ্বিতীয় বারও সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
মেজরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বাঘ ছিটকে পড়েছিল। সে এই বার মেজরের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চাইল, তার সর্বাঙ্গের পেশিতে জাগল মৃদু কম্পন আক্রমণের পূর্বাভাস!
মেজর এডওয়ার্ডস বাঘের মস্তক লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড মাথাটা প্রসারিত দুই থাবার উপর নেমে এসে স্থির হয়ে গেল।
সব শেষ!
আনাড়ি মেজরের গুলি এইবার লক্ষ্যভেদ করেছে!
বন্ধু রবিনহুড
নটিংহ্যাম প্রদেশের নিকটস্থ আলসফোর্ড শহরের একটি সরাইখানায় বসে একজন অ্যাংলো-স্যাক্সন তরুণ ভোজন করছিল। আগন্তুকের মলিন পরিচ্ছদ দেখলেই বোঝা যায় সে অতি দরিদ্র। তার আহার্যও ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের। স্পষ্টই বোঝা যায় বেশি দাম দিয়ে ভালো খাবার খাওয়ার সামর্থ্য তার নেই।
একটু দূরে আর একটি টেবিলে তিন জন নর্মান সৈনিক পানভোজন করতে করতে নিজেদের মধ্যে কথা কইছিল এবং মাঝে মাঝে স্যাক্সন তরুণটির দিকে বক্র কটাক্ষে দৃষ্টিনিক্ষেপ করছিল। অনুমান করা যায় তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে পূর্বোক্ত স্যাক্সন তরুণ।
নর্মান সেনাদের পানভোজনের পালা প্রায় শেষ। সুরার পাত্রে শেষ চুমুক দিয়ে শুন্য পাত্র সশব্দে টেবিলের উপর নামিয়ে একজন সৈনিক কাষ্ঠাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল, তারপর সঙ্গীদের দিকে চোখের ভঙ্গিতে ইশারা জানিয়ে তরুণের পাশে এসে দাঁড়াল। অপর দুটি সৈনিকও . উঠে এসে তরুণটিকে ঘিরে দণ্ডায়মান হল।
যে সৈন্যটি প্রথমে উঠে গিয়েছিল, সে তরুণকে উদ্দেশ করে বলল, ওরে হতভাগা, তোর চেহারা দেখেই বুঝেছি তোর কাছে পয়সাকড়ি কিছু নেই। বিনা পয়সায় খাওয়ার জায়গা এটা নয়, বুঝেছিস?
তরুণ মুখ তুলে তাকাল, কথা কইল না। উত্তর না পেয়ে বক্তা খেপে গেল। সে ক্রুদ্ধস্বরে বলল, কিরে, কথার উত্তর দিচ্ছিস না যে? ভদ্রলোকের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয় তাও জানিসনা? এখনই উঠে দাঁড়া। বর্বর স্যাক্সন! আমরা দাঁড়িয়ে আছি আর তুই বসে আছিস?
পার্শ্বে দণ্ডায়মান দুই সৈনিকের মধ্যে একজন হেসে বলল, ওহে রবার্ট! এই স্যাক্সনগুলো ভালো কথার মানুষ নয়। ওকে ভদ্রতা শিখিয়ে দাও। এই রোগের জন্য কড়া ওষুধ দরকার।
সঙ্গেসঙ্গে প্রথম সৈনিক তরুণের চোয়ালে সজোরে ঘুসি বসিয়ে দিল। তরুণ ছিটকে পড়ল মাটিতে। আহত চোয়ালে একবার হাত বুলিয়ে সে উঠে বসল, তারপর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু সে উঠে দাঁড়ানোর আগেই দ্বিতীয় সৈনিক তার মুখের উপর প্রচণ্ড বেগে পদাঘাত করল। স্যাক্সন তরুণ রক্তাক্ত মুখে আবার লুটিয়ে পড়ল মাটির উপর।
কয়েক মুহূর্ত অবসন্ন ভাবে পড়ে থেকে তরুণটি উঠে বসল। কিন্তু এবার সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল না। ভূমিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে স্থির হয়ে বসে রইল।
নর্মানরা চমকে গেল। তাদের পায়ে ছিল লোহার জুতো। সেই জুতো-পরা পায়ের লাথি সজোরে মুখের উপর পড়লে যে কোনো মানুষের পক্ষে অজ্ঞান হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু এই স্যাক্সন ছোকরা অজ্ঞান হওয়া তো দুরের কথা, মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদ পর্যন্ত করছে না। এমন কি তার চোখে মুখে যন্ত্রণার কোনো চিহ্নও ফুটে ওঠেনি।
যে সৈন্যটি পদাঘাত করেছিল, সে আবার লাথি মারার উদ্যোগ করল, কিন্তু তার চেষ্টা সফল হল না। আচম্বিতে তার কাঁধের উপর এসে পড়ল একটি হাত, পরক্ষণেই প্রবল আকর্ষণে তার দেহটা ছিটকে এল কয়েক হাত দূরে।
তিনটি সৈনিক সচমকে দেখল, সরাইখানার মধ্যে উপস্থিত হয়েছে এক বলিষ্ঠ পুরুষ। বলা বাহুল্য, সেই নবাগত পুরুষই টান মেরে প্রহারে উদ্যত সৈনিকটিকে স্যাক্সন তরুণের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
