মেজর এডওয়ার্ডস পলাতক ব্যাঘ্রের সন্ধান কতক্ষণে পেতেন অথবা আদৌ পেতেন কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু এইবার বাঘেরই বুঝি ধৈর্যচ্যুতি হল- সে নিজেই এগিয়ে এল মেজরের সঙ্গে দেখা করতে!
ঝোপের ভিতর থেকে হঠাৎ ফাঁকা জায়গার উপর আত্মপ্রকাশ করল বাঘ!
মেজর গুলি চালানোর সময় পেলেন না, ভীষণ গর্জন করে বাঘ তার দিকে তেড়ে এল।
একটা মস্ত পাথরের পাশে সরে গেলেন মেজর। বাঘ তাকে লক্ষ্য করে মারল লাফ।
বাঘ খুব তাড়াতাড়ি লাফ মেরেছে বটে, কিন্তু মেজর সাহেব তার চেয়েও তাড়াতাড়ি সরে গেছেন। নখরে সজ্জিত একটা থাবা বোঁ করে মেজরের মুখের পাশ দিয়ে শুন্যে ছোবল মারল, পরক্ষণেই লক্ষ্যভ্রষ্ট শ্বাপদ মেজরের থেকে কয়েক হাত দূরে মাটির উপর এসে পড়ল।
বাঘ কিন্তু এবার শত্রুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল না, সোজা ছুটল সামনের দিকে। মেজর বাঘকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন এবং তার স্বভাবসিদ্ধ নিশানায় বাঘের বদলে একটা পাথরকে ঘায়েল করল। রাইফেলের গুলি বাঘকে বিদ্ধ করতে না পারলেও রাইফেলের গর্জন বাঘের গতিবেগ বৃদ্ধি করতে বিলক্ষণ সহায়তা করল, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জন্তুটা একটা ঝোপের ভিতর ঢুকে লুকিয়ে পড়ল।
এতক্ষণ পর্যন্ত মেজরের মনে অস্বস্তি ও আতঙ্কের আভাস ছিল, এইবার তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন। যদিও কোনো পক্ষেরই রক্তপাত হয়নি এবং যদিও বাঘের থাবার মতো মেজরের রাইফেলও অবস্থানকেই বিদ্ধ করেছে, তবু নিজেকে বিজয়ী মনে করে মেজর উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। আক্রমণকারী বাঘ রণে ভঙ্গ দিয়ে পলায়ন করেছে, কিন্তু মেজর এখনও রণস্থলে উপস্থিত; অতএব পলাতক শত্রুকে পরাজিত মনে করে মেজর যদি উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, তবে তাকে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না।
মেজর এডওয়ার্ডস নতুন উদ্যমে পলাতক ব্যাকে অনুসরণ করার উপক্রম করছেন, এমন সময় তার সামনে আবির্ভূত হল নিরুদ্দিষ্ট সৈনিক শামশের বাহাদুর!
মেজর দেখলেন, সামশের সম্পূর্ণ অক্ষত, তার দেহে কোথাও আঁচড় কামড়ের দাগ নেই। তিনি খুবই খুশি হলেন। শামশের তাকে যে ঘটনার বিবরণী দিল, তা হচ্ছে এই :
মেজরের নির্দেশ অনুসারে সে এবং প্রেম সিং ঝোপের ভিতর পাথর ছুঁড়তে উদ্যত হয়। হঠাৎ প্রেম সিং বলে, বাইরে থেকে পাথর না ছুঁড়ে ঝোপের ভিতর প্রবেশ করে পাথর ছুড়লে বাঘকে তাড়াতাড়ি তাড়িয়ে আনা যায়। শামশের সঙ্গীর প্রস্তাবে সম্মত হয়নি, সে তাকে নিষেধ করে। শামশেরের নিষেধে কর্ণপাত না করে প্রেম সিং ঝোপের ভিতর প্রবেশ করে এবং একটু পরেই শামশের শুনতে পায় বাঘের গর্জন ও সঙ্গীর আর্তনাদ। ঝোপের কিনারায় এসে শামশের তখন বাঘকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকে। ক্রমাগত প্রস্তর বৃষ্টির ফলে বাঘ বিব্রত হয়ে পড়ে, তাই প্রেম সিংকে জখম করলেও জন্তুটা হত্যা করতে পারেনি, মেজর সাহেব ও হাবিলদার যখন অকুস্থলে উপস্থিত হয়েছেন, বাঘ তখন প্রেম সিংকে ছেড়ে দিয়ে আহত শিকারের একটু দূরেই বসে আছে। মেজর যখন শামশেরকে উদ্দেশ করে চিৎকার করছেন, তখন শামশের তার ডাক শুনেও সাড়া দিতে সাহস পায় নি, কারণ তার কণ্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে বাঘ হয়তো তাকেই আক্রমণ করত।
মেজর বুঝলেন, শামশের বুদ্ধিমানের মতোই কাজ করেছে। তিনি তাকে সেনানিবাসে ফিরে যেতে বললেন এবং আহত প্রেম সিং-এর পরিচর্যায় নিযুক্ত হাবিলদারকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন।
সানন্দে মেজরের আদেশ পালন করতে চলে গেলে শামশের। মেজর সম্পূর্ণ একক ভাবেই। বাঘের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হলেন। এবং তার পরেই যা করলেন, তা মুখ ও আনাড়ি ছাড়া কেউ করে না।
ঢালু জমি বেয়ে তিনি নীচের দিকে নেমে গেলেন সেই ঝোঁপটার দিকে, যেখানে একটু আগেই বাঘ গা-ঢাকা দিয়েছে। মেজর ঝোঁপটার কাছে আসতে-না-আসতেই বাঘ ঝোপের বাইরে এসে পূর্বোক্ত গোয়ালঘর লক্ষ্য করে দৌড় দিল। মেজর দুবার গুলি ছুড়লেন। ভাগ্যক্রমে একটা গুলি বোধহয় বাঘের গায়ে লেগে থাকবে। কারণ হঠাৎ ঘরে দাঁড়িয়ে বাঘ মেজরের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল। মেজর ভাবলেন, বাঘ এইবার তার দিকে তেড়ে আসবে, কিন্তু জন্তুটা দাঁত খিঁচিয়ে মেজরকে এক ধমক দিয়েই গোয়ালঘরের পিছনে অদৃশ্য হয়ে গেল। তাকে অনুসরণ করে মেজর গোয়ালঘরের পিছনে এসে দেখেন, বাঘ অদৃশ্য!
মেজর ভাবতে লাগলেন, এখন কি করা যায়। বাঘ কোথায় আছে কে জানে! সে গোয়ালঘরের অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে, অথবা পরিত্যক্ত কুঁড়েঘরগুলোর যে কোনো একটির মধ্যেই গা-ঢাকা দিলেই বা তাকে খুঁজে বার করছে কে? অন্ধকার গোয়ালঘরের ভিতর অনুসন্ধানেরও কোনো উপায় নেই। প্রত্যেকটি কুটিরের ভিতর ঘুরে ঘুরে বাঘের সন্ধান চালানোর অর্থ আত্মহত্যারই নামান্তর।
তবে? এখন কি করা যায়?…
শিকারি হিসাবে আনাড়ি হলেও এডওয়ার্ডস হচ্ছেন একজন সৈনিক পুরুষ। সাধারণ সৈনিক তিনি নন, দস্তুর মতো একজন মেজর এবং ব্রিটিশ মেজর! অতএব আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের কায়দাকানুন তিনি ভালোই বোঝেন। মাটি থেকে পাথর কুড়িয়ে তিনি পরিত্যক্ত কুঁড়ে ঘরগুলির উপর প্রস্তরবৃষ্টি শুরু করলেন। আগেই তিনি দেখে নিয়েছেন, পরিত্যক্ত কুটিরগুলোর মধ্যে কোনোটারই দরজার বালাই নেই। দরজার পরিবর্তে যে ফাঁকগুলো হাঁ করে আছে, তারই ভিতর দিয়ে দমাদ্দম শব্দে মেজরের নিক্ষিপ্ত পাথরগুলো ভিতরে গিয়ে পড়তে লাগল।
