সেনানিবাসে ফিরে এসে মেজর গোরখাদের সব কথা জানালেন এবং তাদের সাহায্য চাইলেন। প্রত্যেকেই সাগ্রহে বাঘ-শিকারে অংশগ্রহণ করতে চাইল। দলের ভিতর থেকে হাবিলদার শিশুপালকে ডেকে সাহেব বললেন, সে যেন তার পছন্দমতো দুজন সৈন্যকে নিয়ে তার সঙ্গে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুপাল হাবিলদারের সঙ্গে দুজন গোরখা সৈনিক মেজরকে বাঘ শিকারে সাহায্য করতে এগিয়ে এল।
অতঃপর যেখানে পায়ের ছাপগুলো দেখা গিয়েছিল, সেইখানে এসে উপস্থিত হলেন মেজর এবং তাঁর সহকারী তিন সৈনিক। শিকারের ব্যাপারে সকলেই আনাড়ি, কাজেই শক্ত মাটির উপর বাঘের পায়ের ছাপ অনুসরণ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হল না।
অগত্যা মেজর সাহেব আবার খান মহম্মদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা জানাতে বাধ্য হলেন। খান মুহম্মদ পাকা লোক, শক্ত পাথুরে মাটির উপরেও সে কি করে বাঘের যাতায়াতের চিহ্ন আবিষ্কার করল সে-ই জানে, কিছুক্ষণের মধ্যে একটা সঙ্কীর্ণ নালার কাছে এসে সে মেজরকে জানিয়ে দিল– ওই নালাটার ভিতরই বাঘ আশ্রয় নিয়েছে।
খান মহম্মদ এবার একা আসে নি, তার সঙ্গে এসেছিল বহু সংখ্যক গ্রামবাসী। এতগুলো নিরস্ত্র মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি হলেন না মেজর, তার অনুরোধে পাঠানরা উঁচু জমির উপর দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখতে লাগল এবং মেজর তার সঙ্গীদের নিয়ে নেমে গেলেন নালাটার ভিতরে।
মেজরের সঙ্গীরা সকলেই সশস্ত্র নয়। মেজর ও হাবিলদার শিশুপাল রাইফেল হাতে এগিয়ে গেলেন। তাদের পিছনে আসতে লাগল দুজন নিরস্ত্র সৈনিক।
খানিকটা নামতে না নামতেই উপর থেকে ভেসে এল পাঠানদের উচ্চ কণ্ঠস্বর। খান মহম্মদ ও তার সঙ্গীরা চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছে বাঘ পাহাড়ের অন্য দিক দিয়ে সরে পড়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে মেজর তার সঙ্গীদের নিয়ে নালার ভিতর থেকে উপরে উঠে এলেন, তার পর খান মহম্মদের নির্দেশ অনুসারে বাঘের সন্ধানে যাত্রা করলেন। খান মহম্মদ সাহেবকে জানাল, কাছেই কয়েকটা পরিত্যক্ত কুটির ও একটি গোয়ালঘর আছে, বাঘ সেইদিকেই গেছে।
ভালো কথা, মেজর বললেন, তুমি পথ দেখাও।
খান মহম্মদ মহা উৎসাহে শিকারিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। তার সঙ্গীরা অবশ্য এল না, কারণ মেজর তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলে দিয়েছেন।
পথ-প্রদর্শক খান মহম্মদ যেখানে এসে থামল, সেখানে ঢালু জমির উপর একটা গভীর খাদের পাশে রয়েছে কয়েকটি পরিত্যক্ত কুটির ও একটি গোয়ালঘর। ওই কুঁড়ে ঘর ও গোয়ালের নীচে ঢালু পাহাড়ের গায়ে প্রায় বিশ গজ ফাঁকা জায়গার মধ্যে কোনো ঝোঁপঝাড় নেই, কিন্তু তারপরই শুরু হয়েছে ঘন ঝোঁপ-জঙ্গল আর সেই ঝোপের ভিতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো শুকনো গাছের সারি।
জানোয়ার ওইখানেই আছে।- ঝোপগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল খান মহম্মদ।
মেজর শুধু ওইটুকুই জানতে চেয়েছিলেন। খান মহম্মদকে স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে মেজর এইবার বাঘের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার উদ্যোগ করলেন। তার পরিকল্পনা : দুজন নিরস্ত্র সৈনিক গোয়ালঘর ও কুটিরগুলোর বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে ঝোপের উপর পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে চিৎকার করবে এবং পূর্বোক্ত স্থানের ডান দিক দিয়ে ঘুরে এসে হাবিলদার ও স্বয়ং মেজর রাইফেল হাতে অপেক্ষা করবেন বাঘের জন্য। নরকণ্ঠের চিৎকার ও প্রস্তর বৃষ্টিতে বিব্রত হয়ে বাঘ নিশ্চয়ই ঝোপের আশ্রয় ছেড়ে শিকারিদের সামনে আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হবে আর তৎক্ষণাৎ তাকে সগর্জনে অভ্যর্থনা জানাবে দুদুটো মিলিটারি রাইফেল।
মেজরের আদেশ অনুসারে গোয়ালঘর ও পরিত্যক্ত কুটিরগুলোর বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে গেল দুজন নিরস্ত্র সৈনিক এবং ডান দিক দিয়ে ঘুরে এসে রাইফেল হাতে সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন মেজর ও হাবিলদার।
আচম্বিতে নির্জন পাহাড়ের নীরবতা ভঙ্গ করে জেগে উঠল শ্বাপদ কণ্ঠের বজ্রনাদ আর তার পরক্ষণেই নর কণ্ঠের আর্ত-চিৎকার!
মেজর বুঝলেন, আক্রান্ত হওয়ার আগেই পাঠান মুলুকের বাঘ শত্রুকে আক্রমণ করেছে। ইঙ্গিতে হাবিলদারকে অনুসরণ করতে বলে শব্দ লক্ষ্য করে ছুটলেন তিনি। অকুস্থলে পৌঁছে এক জন সৈনিককে তাঁরা দেখতে পেলেন মারাত্মক অবস্থায়। লোকটির মাথার পিছন দিক থেকে মাংসের খণ্ড ছিঁড়ে ঝুলছে এক ফালি ছেঁড়া কাপড়ের মতো এবং ক্ষতস্থান থেকে তপ্ত রক্তের ধারা গড়িয়ে নামছে তার সর্বাঙ্গ প্লাবিত করে!
ওই অবস্থাতেও টলতে টলতে সৈন্যটি এগিয়ে এল সাহেবের দিকে, একবার অস্পষ্ট স্বরে শুধু বলল, আমি আহত, জন্তুটা আমাকে মেরেছে!
তার পরই অজ্ঞান হয়ে সে পড়ে গেল মাটিতে।
মেজর ও হাবিলদার ধরাধরি করে আহত সেনাটিকে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে এলেন সেনাটির নাম প্রেম সিং এবং তার নিখোঁজ সঙ্গীর নাম শামশের বাহাদুর। মেজর চিৎকার করে শমশেরের নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
ইতিমধ্যে হাবিলদার আহত সৈনিকটির মাথায় সুন্দরভাবে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে ফেলেছে। প্রেম সিংয়ের চেতনা ফিরে এল একটু পরেই। মেজরের আদেশে আহত প্রেম সিংকে নিয়ে হাবিলদার সেনানিবাসের দিকে রওনা হল সুতরাং নিঃসঙ্গ মেজরের ঘাড়ে পড়ল গুরুদায়িত্বের ভার।
বাঘের সঙ্গে নিরুদ্দিষ্ট শামশেরকেও এখন খুঁজে বার করতে হবে। মেজরের আশঙ্কা, শামশেরও হয়তো বাঘের কবলে পড়েছে।
