এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি অট্টালিকার পিছন দিকে এগিয়ে গেলেন। নিশ্চয় বিরাট উঠানের পিছন দিকেই রয়েছে গুণ্ডা। ওইখানেই তো ছিল ওর খোঁয়াড়। এতক্ষণে শান্তাকে মেরে ফেলেছে কি না কে জানে- প্রতাপের বুকের ভিতর কাঁপতে লাগল, কল্পনায় ভেসে উঠল শান্তার প্রাণহীন দেহ, শুকরের দস্তাঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন ও রক্তাক্ত…
রক্তের মতোই লাল টকটকে দুটি জলভরা চোখ মেলে তাকালেন শান্ত, আর কেন? ওকে শান্তিতে মরতে দাও। আধমরা জীবটার উপর গুলি চালিয়ে আর নাই বা বীরত্ব দেখালে?
গুণ্ডা তখনও মরেনি। পরিত্যক্ত খোয়াড়টার সামনে শান্তার পায়ের কাছে পড়ে সে অতি কষ্টে নিঃশ্বাস ফেলছে। স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাতে পারলেন না প্রতাপ, বলতে পারলেন না এইমাত্র জন্তুটা নরহত্যা করে এসেছে মুখ নীচু করে তিনি সরে গেলেন সেখান থেকে।
পাঠান মুলুকের বাঘ
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভারতবর্ষ তখন ব্রিটিশ সরকারের অধীন। সেই সময় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের একটি পার্বত্য অঞ্চলে একদল গোরখা সৈনিকের নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেছিলেন মেজর পি. এডওয়ার্ডস নামক জনৈক ইংরেজ।
সেনাদলের ছাউনি পড়েছে পেশোয়ার থেকে কয়েক মাইল দূরে একটা ছোটো শহরের কাছে। পাহাড়ের উপর অবস্থিত ওই সেনানিবাসের নীচে পার্বত্য ভূমির উপর পাঠানদের একটি গ্রাম। পাঠান মুলুকের মানুষের সঙ্গে তখনকার ইংরেজ সরকারের সম্পর্ক ছিল অহি-নকুল সম্পর্কের মতোই মধুর। অতএব স্থানীয় বাসিন্দারা যে মেজরের গোরখা বাহিনীকে দেখে বিশেষ খুশি হয়নি, সে কথা বলাই বাহুল্য। কিছু দিনের মধ্যেই স্থানীয় পাঠানদের সঙ্গে গোরখাদের কয়েকটা ছোটোখাটো সংঘর্ষ হয়ে গেল। তবে ব্যাপারটা খুব বেশি গুরুতর হওয়ার আগেই উভয় পক্ষে মিটমাট হয়ে যায় এবং সৈন্যদের দিন কাটতে থাকে বেশ শান্ত ভাবেই।
মেজর একদিন মধ্যাহ্নভোজনের জন্য প্রস্তুত হয়ে টেবিলের সামনে এসে বসেছেন, হঠাৎ তার সামনে ছুটে এল তারই অধীনস্থ এক সৈনিক ধান বাহাদুর।
উত্তেজিত ধান বাহাদুরের মুখ থেকে মেজর শুনলেন নিকটবর্তী গ্রাম থেকে খান মহম্মদ নামক জনৈক পাঠান এক চিতাবাঘের চমকপ্রদ আবির্ভাবের সংবাদ বহন করে এনেছে। উক্ত খান মহম্মদ নাকি চিতাবাঘটিকে স্বচক্ষে দেখে সেনানিবাসকে খবর দিতে এসেছে।
মেজর কথাটা বিশ্বাস করলেন না। আশেপাশে বড়ো জঙ্গল নেই, দুপুরের কাঠফাটা রোদে লোকালয়ের এত কাছে চিতাবাঘের আবির্ভাব বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বাঘ কিংবা বাঘের জাত-ভাইদের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে আমাদের মেজর সাহেবের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, জীবনে তিনি কখনো বাঘ অথবা চিতাবাঘ দেখেন নি, কিন্তু শুনেছেন, ছোটো বড়ো কোনো বাঘই প্রকাশ্য দিবালোকে লোেকালয়ের আশেপাশে পদার্পণ করে না।
মেজর সাহেব কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছেন না দেখে ধান বাহাদুর বাইরে বেরিয়ে গেল এবং একটু পরেই খান মহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মেজরের সামনে উপস্থিত হল। খান মহম্মদ খুব জোরের সঙ্গে বলল যে, সে ভুল করে নি, মেজর সাহেব যদি তার সঙ্গে যেতে রাজি থাকেন তবে যেখানে সে চিতাবাঘটাকে দেখেছিল সেই জায়গাটা সে সাহেবকে দেখিয়ে দিতে পারে।
খান মহম্মদের কথা শুনে খাওয়া মাথায় উঠল মেজরের, দুপুরের খানা ফেলে খান মহম্মদের সঙ্গে অকুস্থল দর্শন করতে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে কিছু দূরে এসে খান মহম্মদ সত্যিই কয়েকটা পায়ের ছাপ দেখিয়ে দিল। ছাপগুলো দেখে সাহেব বুঝলেন, সেগুলো কোনো চতুষ্পদ পশুর থাবার।
আগেই বলেছি, জন্তু-জানোয়ারের ব্যাপারে মেজর ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ, তাই পদচিহ্নের মালিক কোন চতুস্পদ পশু, তা তিনি বুঝতে পারলেন না। কিন্তু খান মহম্মদের কছে তো তা কবুল করা যায় না। তাই তিনি অটল গাম্ভীর্যের সঙ্গে মস্তক আন্দোলন করে তাকে জন্তুটার বর্ণনা দিতে বললেন। প্রবল উৎসাহে খান মহম্মদ জন্তুটার বিশদ বর্ণনা দিল, চিতাবাঘের গায়ের উপর লম্বা লম্বা ডোরার কথাও সে উল্লেখ করতে ভুলল না। শুনে মেজরের দুই চক্ষু ছানাবড়া! অ্যাঁ! ওটা তাহলে বুটিদার চিতাবাঘ নয়, ভোরাদার বাঘ! লেপার্ড নয়, টাইগার!
যদিও পশু-জগৎ সম্বন্ধে মেজর সাহেবের ধারণা ছিল নিতান্তই সীমাবদ্ধ, তবু বাঘ সম্বন্ধে যে সব জনশ্রুতি তার কানে এসেছিল তাতে তার ধারণা হল যে, উক্ত জীবটি মোটেই সুবিধের নয়। অবশ্য চিতাবাঘের সান্নিধ্যও মানুষের পক্ষে বিশেষ আনন্দদায়ক নয়, তবে বাঘ নাকি চিতাবাঘের চাইতেও অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি ভয়ানক।
যাই হোক, এখন আর পিছিয়ে যাবার উপায় নেই। বাঘের পিছু না নিলে পাঠানরা তাঁকে কাপুরুষ ভাববে, চাই কি সামনাসামনি বিদ্রূপও করতে পারে। পাঠানদের বিদ্রুপের পাত্র হতে রাজি নন মেজর এডওয়ার্ডস। তিনি খান মহম্মদকে জানিয়ে দিলেন, বাঘটাকে তিনি মারতে চেষ্টা করবেন। খান মহম্মদ খুব খুশি, সে তৎক্ষণাৎ গ্রামবাসীদের খবর দিতে ছুটল।
মেজর কিন্তু বিশেষ উৎফুল্ল হতে পারেন নি। শিকার সম্বন্ধে তার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, এবং তার হাতের টিপ ছিল এত খারাপ যে পরিচিত ব্রিটিশ অফিসারদের কাছে তিনি ছিলেন বিদ্রুপের পাত্র।
কিন্তু হাতের টিপ না থাকলেও মেজর সাহেবের সাহসের অভাব ছিল না, জীবন বিপন্ন করেও তিনি বাঘটাকে হত্যা করার সংকল্প করলেন।
