এক জন বর্শাধারীকে এক তোয় ছিটকে ফেলে বন-তাড়ুয়াদের ব্যুহ ভেদ করে ঝড়ের মতো ছুটে চলল গুণ্ডা ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে খুরের বাজনা বাজাতে বাজাতে!
প্রতাপের শুকনো গলায় আওয়াজ ফুটল না, কিন্তু দেবেন্দ্রবিজয় এখন নিজেকে সামলে নিয়েছেন। দুহাতে ভর দিয়ে মাটির উপর উঠে বসে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, মারো! মারো! ও যে গাঁয়ের দিকেই যাচ্ছে!
সত্যি কথা! গুণ্ডার গতি গাঁয়ের দিকেই বটে!
বন-তাড়ুয়ার দল হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। প্রতাপ এবার সম্বিৎ ফিরে পেলেন, যা, যা, ওর পিছনে যা। চোট-খাওয়া জানোয়ার গাঁয়ের ভিতর ঢুকে মানুষ মারতে পারে। যেভাবেই হোক, ওকে সামাল দে।
সাধারণ বন-তাড়ুয়া হলে দলটা আর এগোতে চাইত না। কিন্তু এই দলটা শিকারের তালিম নিয়েছে প্রদ্যোতনারায়ণের কাছে, বুনো জানোয়ারের আক্রমণে অপঘাত মৃত্যু তারা অনেকবার দেখেছে, হুকুম পেলে তারা আহত বাঘের মুখেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে হৈ হৈ শব্দে তারা ছোটো-হুঁজুরের হুকুম তামিল করতে ছুটল।
.
০৫.
আমরা দুজনেই আজ খুব বেঁচে গেছি, দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, তোমার গুলি খেয়েই জন্তুটা আমাকে ছেড়ে তোমার দিকে ফিরল। কিন্তু সামনে এসে তোমাকে ও কিছু বলল না– ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। তাই না?
মাথা নেড়ে বন্ধুর কথায় সায় দিলেন প্রতাপ, তারপর হারানের রক্তাক্ত মৃতদেহের দিকে আঙুল তুলে বললেন, আমার অবস্থাও হত হারান-সর্দারের মতো, তবে
তবে?–
তবে আফ্রিকার বুনো শুয়োরের স্মৃতিশক্তি খুব জোরালো বলেই বোধহয় এযাত্রা বেঁচে গেলাম।
হা হা করে হেসে উঠে দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, স্মৃতিশক্তি না ঘোড়ার ডিম। তুমি যদি ভেবে থাকো ও তোমাকে চিনতে পেরে ছেড়ে দিয়েছে তাহলে বলব তুমি একটি আস্ত হাঁদাগঙ্গারাম। বুনো জানোয়ার অনেক সময় অপ্রত্যাশিত কাণ্ড করে থাকে। শিকারি হিসাবে তুমি কি জানো না আমার কথা কতটা সত্যি?
আশেপাশে আরও লোকজন ছিল বলেই জন্তুটা ভয় পেয়েছিল, আর সেইজন্যই শেষ মুহূর্তে ওটা তোমাকে আক্রমণ করতে সাহস পায়নি।
প্রতাপ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, অস্ফুট স্বরে তিনি বললেন, হয়তো তোমার কথা সত্যি, হয়তো তোমার কথা সত্যি নয়। কিন্তু আমার মনে হয়
হঠাৎ চমকে উঠলেন প্রতাপ, উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, গাঁয়ের শিকারিদের হাতে বন্দুক নেই, আছে শুধু বর্শা আর লাঠি। গুণ্ডার কবলে যদি আবার কারও প্রাণ যায় তাহলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। দেবেন, তোমার ঘোড়াটা তো মারা গেছে, তুমি আস্তে আস্তে হেঁটে এস। আমি ঘোড়া ছুটিয়ে চললুম গুণ্ডার খোঁজে। ফিরে এসে হারানের মৃতদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করব।
দেবেন্দ্রবিজয় মাথা নেড়ে বন্ধুকে সমর্থন জানালেন। ধুলোর ঝড় তুলে প্রতাপের ঘোড়া ছুটল গ্রামের দিকে…
সিংদরজার সামনে দণ্ডায়মান জনতা চমকে উঠল। দুই হাতে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে প্রতাপ বলে উঠলেন, তোরা এখানে কী করছিস? গুণ্ডা কোথায়?
লাঠি হাতে একজন শিকারি বলে উঠল, হুজুর! জন্তুটা ভিতরে চলে গেছে।
-বলিস কি! আর তোরা এখানে দাঁড়িয়ে সং-এর মতো তামাশা দেখছিস! ভিতরে যেতে সাহস হল না? ও যদি ঝি-চাকরদের কাউকে চোট করে? কেমন মরদ তোরা? শিকারের পিছু নিতে ভয় পাস?
একাধিক কণ্ঠ উগ্রস্বরে সাড়া দিল, ভয়? আজ্ঞে ভয় মোরা যমকেও করি না। বড়ো হুজুরের সাথে আমরা অনেকবার শিকারে গেইছি। কিন্তুক বৌ-ঠাকরুন
–বৌ-ঠাকরুন?
—আজ্ঞে হাঁ, বউ-ঠাকরুন তো আমাদের মানা করলেন ভেতরে আসতে।
–সেকি!
-আজ্ঞা হাঁ। উপর থেকে তিনি তো বলে দিলেন, তোরা ভেতরে আসবি না। তাই জন্য তো মোরা এখানে দাঁইড়ে রইচি।
-বেশ করেছ। তবে তোদর বৌ-ঠাকরুনের বুদ্ধি আছে। চোট-খাওয়া জানোয়ার উপরে গিয়ে লোকজন জখম করতে পারে সে বিষয়ে ও নিশ্চয়ই খেয়াল রেখেছে, আর লাঠি-সড়কি দিয়ে শুয়োর মারতে গিয়ে তোরা বিপদে পড়বি সেটাও বোধহয় ও চায় না– উপরে যাওয়ার দরজা বন্ধ করে শান্তা বোধহয় আমার জন্যই অপেক্ষা করছে।
–আজ্ঞা না। উপরের দরজা বন্ধ হয়নি। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে বৌ-ঠাকরুন তো নেমে গেলেন নীচে।
সর্বনাশ, দারুণ আতঙ্কে চমকে উঠলেন প্রতাপ, ও সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নীচে! আরে, ওইখানেই কোথায় গুণ্ডা ঘাপটি মেরে আছে কে জানে… তোরা সব জেনেও বৌ-ঠাকরুনের কথা বেদবাক্যি ধরে নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস?
বন্দুক বাগিয়ে এক লাফে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লেন প্রতাপ, তারপর দ্রুতবেগে পা চালিয়ে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। ঘোড়ার পিঠে ভিতরে ঢুকতে সাহস হল না, ভড়কানো-ঘোড়া যদি আবার ঘাবড়ে যায় তবে তার পিঠ থেকে গুলি চালানো মুশকিল হবে।
জনতা হঠাৎ প্রতাপের অগ্রগতিতে বাধা দিল, আমরা ভিতরে তো গেছিলাম। কিন্তু বৌ-ঠাকরুন আবার ধমকে উঠতে বেইরে এইচি। কিন্তু আপনি ভেতরে যাবেন না। বিপদ হতি পারে।
গর্দভ, রাগে ফেটে পড়লেন প্রতাপ, আমার বিপদ হতে পারে বলে খুব তত দরদ দেখাচ্ছিস! আর একটা মেয়েমানুষের কি অবস্থা হতে পারে ওই শুয়োরটার সামনে পড়লে সে খেয়াল আছে?
সমান ওজনে জবা এল, আজ্ঞা, খেয়াল থাকবে না কেনে? দেখেই তো এলাম বৌ-ঠাকরুন ওই গুণ্ডার সামনে বসে আছে। কিন্তু আপনাকে দেখলে ও নিচ্যয় মেরে দিবে।
অ্যাঁ! বলে কি! চোট-খাওয়া শুয়োরের সামনে বসে আছে শান্তা! জনতার দিকে একবার জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেউড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন প্রতাপনারায়ণ।
