হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মতো ঘুরে দাঁড়ালেন প্রতাপ, কেন? কেন? ওকে মারতে পারব না কেন? তোমার ভয় হলে তুমি ফিরে যেতে পার, আমি এই ব্যাপারের শেষ না দেখে ঘরে ফিরব না।
আমতা আমতা করে দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, না মানে আমি ঠিক ভয় পাইনি। তবে ইয়ে মানে- বৌ-ঠাকরুন বলছিলেন।
বৌ-ঠাকরুন কি বলছিলেন আমি শুনতে চাই না, বাধা দিয়ে গর্জে উঠলেন প্রতাপ, যে শয়তান জানোয়ার ডিককে এমনভাবে খুন করেছে তাকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না। হারান!
–হুজুর!
–শোনো হারান, একটু দূরে ফাঁকা মাঠের ও ধারে যে ঝোঁপটা আছে, ওইখানেই নিশ্চয় শয়তানটা লুকিয়েছে। জমিটা বাঁ দিকে ঢালু হয়ে গেছে, দেখেছ?… ঢালু জমির উপর উঁচু জায়গাটাতে কয়েকজনকে উঠে দাঁড়াতে বল। শুয়োর লাফিয়ে উপরে উঠতে পারবে না, ও ঘুরে একটা ঢাল বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করলে তোমরা উঁচু জায়গা থেকে সড়কি আর লাঠি চালিয়ে ওকে ঘায়েল করতে পারবে। নীচে জঙ্গলের বাইরে একদিকে দেবেনকে নিয়ে আমি পাহারা দেব, আর-একদিকে নজর রাখবে তুমি। দলের আর সবাই ঝোপের ভিতর ঢুকে ওকে তাড়া লাগাও।
প্রতাপনারায়ণের নির্দেশ অনুসারে কাজ শুরু হল। শুয়োরের খোঁচ (পায়ের দাগ) দেখে অভিজ্ঞ হারান-সর্দার জানিয়ে দিল জন্তুটা যে ঝোপের ভিতর রয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কুকুর দুটো কিছুতেই শিকারিদের পথ দেখাতে রাজি হল না। অতএব লাঠি-সোঁটা হাতে মানুষগুলো কুকুরের সাহায্য ছাড়াই বন ঠ্যাঙাতে শুরু করল।
…হঠাৎ ঝোপের ভিতর থেকেতিরবেগে বেরিয়ে এল গুণ্ডা। একটু দূরে খাড়া জমির একপাশে যে ঢালু জায়গাটা রয়েছে সেটাই তার লক্ষ্য বোধহয় উপরে উঠে সে আক্রমণকারীদের ফাঁকি দিতে চায়।
কিন্তু উপর থেকে তাড়া খেয়ে সে আবার নীচে নামতে বাধ্য হল। প্রথমবার সে হারানের পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল, এবার সে শত্রুকে এড়িয়ে যেতে পারল না। হারানের হাতের বর্শা ছুটে এসে বিধল তার কাঁধে। আফ্রিকার জঙ্গলে ওয়ার্ট হগের শক্ত রবারের মতো কাঁধের মাংসপেশী শাপদের সনখ থাবার আক্রমণ বহুবার ব্যর্থ করে দিয়েছে আজ হারান-সর্দারের বর্শাও গুণ্ডার কঠিন স্কন্ধদেশের উপর মারাত্মক দংশনে চেপে বসতে পারল না, এক ঝলক রক্ত ঝরিয়ে অস্ত্রটা ছিটকে পড়ল মাটির উপর। পরক্ষণেই উল্কার মতো ছুটে এল আফ্রিকার জান্তব হিংস্র হারান সর্দারের দিকে।
উপর থেকে কে যেন একটা বর্শা ছুঁড়ে মারল। বর্শা বিঁধল গুণ্ডার পিঠে, কিন্তু তার গতি রুদ্ধ হল না, গুণ্ডা ঝাঁপিয়ে পড়ল হারানের উপর। এক গুঁতো মেরে শত্রুকে ধরাশায়ী করে সে ধারালো দাঁতের সদ্ব্যবহার শুরু করল।
এর মধ্যেই গুণ্ডাকে লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটিয়েছেন দেবেন্দ্রবিজয় আর প্রতাপনারায়ণ। হারানের রক্তাক্ত মৃতদেহটা ছেড়ে এবার নতুন শত্রুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল গুণ্ডা। পিঠের উপর বেঁধা বর্শাটাকে এক ঝটকায় ছিটকে ফেলে সে দেবেন্দ্রবিজয়ের দিকে তেড়ে গেল। দেবেন্দ্রবিজয় বন্দুক ছুঁড়লেন, গুণ্ডার রক্তাক্ত শরীরে আরও একটা লাল চিহ্নের সৃষ্টি হল- পরক্ষণেই কাতর আর্তনাদ করে ধরাশয্যা গ্রহণ করল দেবেন্দ্রবিজয়ের ঘোড়া, গুণ্ডার দস্তাঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেছে তার উদর। ঘোড়াকে ছেড়ে সওয়ারের দিকে ফিরল গুণ্ডা। ভূপতিত দেবেন্দ্রবিজয় দুহাতে ভর দিয়ে উঠে বসে সভয়ে দেখলেন বন্দুকটা তার নাগালের বাইরে ছিটকে পড়েছে এবং তাকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসছে মুর্তিমান মৃত্যুর মতো আহত বরাহ।
কিন্তু গুণ্ডা শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই প্রতাপের বন্দুক সশব্দে অগ্নিবর্ষণ করল। এক মুহূর্তের জন্য মাটির উপর লম্বমান হল গুণ্ডার দেহ- পরক্ষণেই রক্তাক্ত দাঁত দুটো উঁচিয়ে সে ছুটে গেল দুই নম্বর শত্রুর দিকে।
প্রতাপ আবার গুলি চালানোর উপক্রম করলেন। তার বরাত খারাপ, ঘোড়াটা হঠাৎ ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল– টাল সামলাতে না পেরে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে প্রতাপ এসে পড়লেন মাটির উপর। বন্দুক হাত থেকে খসে পড়েছিল। সেটাকে হস্তগত করার জন্য হাত বাড়ালেন প্রতাপ, কিন্তু অস্ত্রে হাত দেবার আগেই তার সামনে এসে পড়ল গুণ্ডা।
প্রতাপ দেখলেন বাঁকা ছোরার মতো এক জোড়া ভয়ংকর দাঁত তাঁর দেহ লক্ষ্য করে উদ্যত হয়েছে এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে জ্বলে জ্বলে উঠছে এক জোড়া লাল টকটকে চোখ- এক জোড়া জ্বলন্ত কয়লার মতো!-দারুণ আতঙ্কে তিনি চোখ বুজে ফেললেন।
কেটে গেল কয়েকটা মুহূর্ত। শরীরের উপর ধারালো দাঁতের যাতনাদায়ক স্পর্শ পেলেন না প্রতাপ, ভয়ে ভয়ে তিনি আবার চোখ মেলে তাকালেন
একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে গুণ্ডা! সামনের পা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে, কিন্তু আক্রমণের চেষ্টা করছে না।
মানুষ ও শূকর পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপরই হঠাৎ একটা অস্ফুট শব্দ করে গুণ্ডা ছুটল। না, প্রতাপের দিকে নয়– তাঁর পাশ কাটিয়ে পিছনের জঙ্গল লক্ষ্য করেই ছুটেছিল গুণ্ডা।
জঙ্গলের ভিতর থেকে তখন বন-তাড়ুয়ারা বেরিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গুণ্ডাকে রুখতে চেষ্টা করল। শন শন শব্দে ছুটে এসে দুটো বর্শা গুণ্ডার রক্তাক্ত শরীর থেকে আরও কিছুটা রক্ত ঝরিয়ে দিল, প্রচণ্ড শব্দে পড়ল কয়েকটা লাঠি তার পিঠে আর কাঁধে কিন্তু কার সাধ্য রোধে তার গতি? গুণ্ডার গ্রাহ্যই নেই!
