তাই মাটি খুঁড়ে গাছের মূল খেতে খেতে একটু দূরে উঁচু জমিটার উপর বসে থাকা খোকা-চিতাবাঘকে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় নি গুণ্ডা। একটু পরেই যে তার মা এসে সেখানে উপস্থিত হয়েছে সেই সংবাদও গুণ্ডার অজানা নয়– বনের বাতাস তার নাকে চিতাবাঘদের খবর জানিয়ে দিয়ে গেছে।
এত কাছাকাছি জোড়া চিতাবাঘের উপস্থিতি গুণ্ডা পছন্দ করে না। মুখ তুলে একটা ধমক দেবে কি না ভাবছে, এমন সময়ে তার মাথার উপর দিয়ে হলদেকালে উদার একটা কম্বল উড়ে গেল বিদ্যুৎ ঝলকের মতো। সচমকে মুখ তুলে তাকাতেই আর একটা হলদেকালো কম্বল বসানো শরীর তাকে ডিঙিয়ে দূরে ছিটকে পড়ল।
হতভম্ব হয়ে কয়েকটা মুহূর্ত চুপ করে রইল গুণ্ডা, তারপরই ব্যাপারটা তার বোধগম্য হল। তার দেহটাকে ডিঙিয়ে চিতাবাঘদের লং জাম্প প্র্যাকটিস গুণ্ডার বিবেচনায় খুব অপমানকর বলেই মনে হল, অতএব ধাবমান চিতাবাঘ দুটিকে পাকড়াও করে তাদের কিঞ্চিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য সে ঘুরে দাঁড়াল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে
সেই মুহূর্তে তার নাকে এসে ধাক্কা মারল একটা গন্ধ। শত্রু! উপর দিকে নাক তুলে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাসগ্রহণ করেই গুণ্ডা বুঝল বনে শত্রুর আবির্ভাব ঘটেছে। এই দিকে ছুটে আসছে অনেকগুলো মানুষ আর কুকুর। মানুষেরা কুকুর সঙ্গে নিয়ে কেন জঙ্গলে আসে সে-কথা ভালোভাবেই জানে গুণ্ডা। চিতাবাঘদের লাফালাফির কারণটাও সে বুঝতে পারল।
.
০৪.
কর্তা, ওরা শিকারের গন্ধ পেয়েছে, চেঁচিয়ে উঠল হারান-সর্দার।
হ্যাঁ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। গলার শিকল নিয়ে কুকুরগুলো যেরকম টানাটানি লাগিয়েছে, তাতে বোঝা যায় তারা শিকারের গন্ধ পেয়েছে।
ওদের ছেড়ে দাও, প্রতাপনারায়ণ আদেশ করলেন
কুকুরগুলো ছাড়া পেয়ে দ্রুতবেগে সামনে এগিয়ে গেল কিছু দূর। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল দলের নেতা ডিক। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল, একটা অনুচ্চ হাঁক দিয়ে সে দিক পরিবর্তন করল।
ভ্রূ কুঁচকে প্রতাপ বললেন, হারান, ব্যাপারটা লক্ষ করেছ? আমার মনে হল একটা জানোয়ারকে অনুসরণ করেই কুকুরগুলো ছুটতে শুরু করেছিল। হঠাৎ যেন নতুন শিকারের সন্ধান পেয়ে ওরা ঘুরে গেল।
প্রতাপ ঠিক ধরেছেন। চিতাবাঘদের গায়ের গন্ধ পেয়েই জন্তু দুটোকে অনুসরণ করেছিল কুকুরের দল। হঠাৎ অন্য একটা গন্ধ নাকে যেতেই থমকে দাঁড়িয়েছে তারা। ডিকের কাছে ওই গন্ধ পরিচিত, পুরোনো শত্রুর উপর প্রতিশোধ নেবার এমন সুযোগ সে ছাড়তে চাইল না কুকুর বাহিনী নিয়ে সে গুণ্ডার গায়ের গন্ধ অনুসরণ করে ছুটতে শুরু করল। শিকারির দলও তৎক্ষণাৎ কুকুরদের পিছু নিতে একটুও দেরি করল না…।
ঝোপের ভিতর থেকে ভেসে এল কুকুরের ক্ষুব্ধ গর্জন আর ঝটাপটির আওয়াজ। ঘোড়ার রাশ টেনে বন্দুক বাগিয়ে ধরলেন প্রতাপনারায়ণ আর দেবেন্দ্রবিজয়, সবিস্ময়ে ভাবতে লাগলেন, এমন জোর ঝটাপটি করছে কোন জন্তু এতগুলো কুকুরের সঙ্গে?
সঙ্গের লাঠিসোঁটাধারী মানুষগুলো এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। কিন্তু তারা কিছু করার আগেই ঝোপের ভিতর থেকে তিরবেগে বেরিয়ে এল দুটো কুকুর। দারুণ আতঙ্কে তাদের গায়ে লোম খাড়া হয়ে উঠেছে এবং নিশানের মতো উদ্ধত লাঙ্গুল প্রবেশ করেছে পেটের তলায়! কুকুর দুটো ভীষণ ভয় পেয়েছে!
ডিক! ডিক কোথায়? চেঁচিয়ে উঠলেন প্রতাপনারায়ণ, ব্রাউনেরও তো দেখা পাচ্ছি না। চল, সবাই এগিয়ে চল।
তীব্রবেগে তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন সেইদিকে, যেদিক থেকে ছুটে এসেছে কুকুর দুটো। তার সঙ্গে ছুটল দেবেন্দ্ৰবিজয়ের ঘোড়া এবং অশ্বারোহীদের পিছন পিছন ছুটতে লাগল লাঠি আর বর্শাধারী গ্রাম্য শিকারির দল।
বেশি দূর যেতে হল না। জঙ্গল শেষ হয়ে যে ফাঁকা মাঠটা দেখা যাচ্ছে, সেই মাঠের উপর পড়ে আছে দুটো প্রকাণ্ড কুকুরের রক্তাক্ত দেহ। একটা আর নড়াচড়া করছে না, আর একটার শরীরে তখনও প্রাণের চিহ্ন বর্তমান।
এক লাফে ঘোড়া থেকে নেমে কুকুর দুটোর সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রতাপ, তারপর উত্তেজিত স্বরে ডাকলেন, ডিক! ডিক!
যে কুকুরটা তখনও মৃত্যু-যাতনায় ছটফট করছিল, সে একবার লেজ নেড়ে প্রভুকে স্বাগত জানিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল- পরক্ষণেই তার সমস্ত শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে আবার সোজা হয়ে আছড়ে পড়ল মাটির উপর। সব শেষ!
হাঁটু পেতে মাটিতে বসে পড়লেন প্রতাপ। সঙ্গীরা চারপাশে ভিড় করে দাঁড়াল। কুকুর দুটোর মৃতদেহ পর্যবেক্ষণ করে দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, চিরে ফাঁক করে দিয়েছে। বুনোনা শুয়োরের কীর্তি!
হারান-সর্দার নীচু হয়ে জমিতে কি যেন লক্ষ করল, তারপর অস্ফুট স্বরে বলল, গুণ্ডার খুরের দাগ দেখতে পাচ্ছি। ওর পায়ের খোঁচ আমি চিনি।
দেবেন্দ্রবিজয় সবিস্ময়ে বললেন, গুণ্ডা! বৌ-ঠাকরুন কি এই জন্তুটার কথাই বলছিলেন প্রতাপ?
প্রতাপ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। দাঁত কামড়ে ঠোঁট কামড়ে তিনি আবেগ সামলাতে চেষ্টা করছিলেন।
ডিক তাঁর বাপের আমলের কুকুর। প্রতাপের সঙ্গে অনেক শিকার-অভিযানের সঙ্গী হয়েছিল
হারান বলল, একলা হাতে চার-চারটে ডালকুত্তার মওড়া নিতে পারে এমন খ্যামতা গুণ্ডা ছাড়া এ তল্লাটে কোনো জানোয়ারের নেই।
দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, তবে তো মুশকিল। আমরা ওকে মারতে পারব না। এবার তাহলে ফিরে যাওয়াই ভালো।
