শুধু কুকুর নয়, গুণ্ডার আরও একটি শত্রু ছিল। সে হচ্ছে পাইকদের দলপতি হারান-সর্দার। যখন-তখন জন্তুটাকে বিরক্ত করে হারান ভারি মজা পেত।
গুণ্ডার খোঁয়াড়টা ছিল মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি। একদিন ওই গুঁড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে হারান যখন একটা কলা নিয়ে শুয়োরটাকে লোভ দেখাচ্ছে, আর সে কলাতে কামড় বসাতে গেলেই সেটা চট করে টেনে নিচ্ছে সেই সময়ে হঠাৎ ব্যাপারটা দেখে ফেললেন প্রদ্যোতনারায়ণ স্বয়ং।
কঠোরভাবে তিরস্কৃত হল হারান। অনেকদিনের পুরোনো লোক বলে আর শিকার-খেলাতে খুব ওস্তাদ খেলোয়াড় বলে কর্তা তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেন না; কিন্তু ভবিষ্যতে এরকম কিছু ঘটলে চাকরি তো থাকবেই না, উপরন্তু পৃষ্ঠদেশের চামড়াও যে স্থানত্যাগ করতে পারে সে কথা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রদ্যোতনারায়ণ।
বলাই বাহুল্য, এরপর আর গুণ্ডার পিছনে লাগতে সাহস পায়নি হারান-সর্দার।
শেষ পর্যন্ত গুণ্ডা হয়তো বহাল তবিয়তে জমিদারবাড়িতেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারত, কিন্তু পর পর দুটো দুর্ঘটনার ধাক্কায় সব কিছুই বদলে গেল।
প্রথমে মারা গেলেন যোগমায়া দেবী। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেলেন তিনি। ডাক্তার এল, চিকিৎসাও হল, কিন্তু তাকে বাঁচানো গেল না।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে গেলেন প্রদ্যোতনারায়ণ। তার অসুরের মতো স্বাস্থ্যে ভাঙন ধরল। কয়েক বছর পরে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে প্রদ্যোতনারায়ণও সহধর্মিণীর পথ অনুসরণ করলেন।
পিতার মৃত্যর পর জমিদারির মালিক হল প্রতাপনারায়ণ। পূর্বোক্ত গুণ্ডা এখন সত্যিই গুণ্ডা তার দৈহিক আয়তন এবং চোয়ালের দুধারে বেরিয়ে-আসা দাঁত দুটো এখন ভয়ানক আকার ধারণ করেছে।
আগের মতো তার পরিচর্যা এখন হয় না। গৃহস্থালির অনেক দায়িত্ব নিয়ে বিব্রতা শান্তা সবসময়ে শুকরের তত্ত্বাবধান করতে পারে না। ভৃত্য তার কর্তব্যে গাফিলতি করে।
এইসব অসুবিধা বিশেষ গ্রাহ্য করে না গুণ্ডা। তার লাল লাল চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘুরে পরিচিত মানুষটির সন্ধান করে, তাকে দেখতে পায় না। মাঝে মাঝে শান্তাকে দেখে সে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দে আনন্দ জানায়, কিন্তু বিশালকায় গুণ্ডা যে-মানুষটিকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত তার দেখা না পেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়ে, আফ্রিকার বুনো চোখে ভাসে বিষাদের ছায়া। শান্তা সবসময় কাছে এসে খোঁজ নিতে পারে না, খোঁয়াড়ের মধ্যে নিঝুম হয়ে শুয়ে থাকে গুণ্ডা।
বিশেষ কাজে বাপের বাড়িতে গিয়েছিল শান্তা কয়েক দিনের জন্য। ঘটনাটা ঘটল সেইদিন, যেদিন সে ফিরল স্বামীর ঘরে। পালকি তখন সিংহদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকছে, হঠাৎ কানে এল গুণ্ডার তীব্র চিৎকার। তাড়াতাড়ি পালকি থামিয়ে নেমে পড়ল শান্তা এবং ছুটে গেল বাড়ির পিছনে উঠানের দিকে ওইখানেই ছিল গুপ্তার খোঁয়াড় এবং শব্দটা আসছিল সেদিক থেকেই। অকুস্থলে গিয়ে শান্তা দেখল গুণ্ডাকে পরমানন্দে লাঠি দিয়ে খোঁচাচ্ছে হারান-সর্দার। লাঠিটাকে কামড়ে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে খেপে উঠেছে গুণ্ডা। হারানের নাম ধরে চেঁচিয়ে ওঠার উপক্রম করল শান্তা, কিন্তু তার গলা থেকে আওয়াজ বেরিয়ে আসার আগেই অঘটন ঘটে গেল। লাঠিটাকে আক্রমণের চেষ্টা ছেড়ে হঠাৎ গুণ্ডা খোঁয়াড়ের দরজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং শাণিত ছোরার মতো এক জোড়া দাঁতের প্রচণ্ড আঘাতে দরজা ভেঙে ছুটে এল হারান-সর্দারের দিকে।
অন্য লোক হলে তখনই মারা পড়ত, কিন্তু হারান হচ্ছে পাকা লাঠিয়াল এক মুহূর্তের জন্য সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। তারপরই নিজেকে সামলে লাঠির উপর ভর দিয়ে মারল এক দারুণ লাফ। সে কী লাফ– এক লাফেই হারান পৌঁছে গেল নিকটবর্তী পাঁচিলের উপর।
একটা ক্রুদ্ধ চিৎকার ছাড়ল গুণ্ডা। তারপর ঝড়ের বেগে সিংদরজা পার হয়ে অদৃশ্য হল। শান্তার দিকে তাকিয়েও দেখল না।
হারানকে যথাসম্ভব তিরস্কার করল শান্তা। স্বামীর কাছে ব্যাপারটা জানিয়েছিল সে যথাসময়ে। প্রতাপনারায়ণ বলল হারান-সদারকে সে শাস্তি দেবে, কিন্তু শান্তার মনে হয়েছিল তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই ও কথা বলল প্রতাপ- আসলে হারানের অপরাধটা স্বামীর কাছে খুব গুরুতর নয়।
তা যাই হোক, গুণ্ডা আর জমিদারবাড়িতে ফিরল না। গাঁয়ের পাশে জঙ্গলের মধ্যে তার দেখা পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। গ্রামবাসীদের মুখে তার খবর পেত শান্তা। আফ্রিকার ওয়ার্ট হগ বাংলার জঙ্গলেই দিন কাটাতে লাগল নির্বিবাদে। না, একেবারে নির্বিবাদে নয়- গোড়ায় একটু গোলমাল হয়েছিল। তিনটে নেকড়ে, যারা ওই এলাকাতেই থাকত গুণ্ডার নধর রূপ দেখে লোভ সংবরণ করতে পারেনি, এগিয়ে এসেছিল শূকরমাংসের স্বাদ গ্রহণ করতে। গুণ্ডার দস্তাঘাতে সর্দার নেকড়ে মারা পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই, আর অন্য দুটো প্রাণপণে ছুটে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বাঁচল।
তারপর থেকে আর কেউ তাকে বিরক্ত করে না। খরগোশ আর হরিণদের সঙ্গে গুণ্ডার ঝগড়া নেই। বেশ স্বচ্ছন্দেই তার দিন কাটছিল। সম্প্রতি কিছুদিন হল দুটো চিতাবাঘ এই অঞ্চলে
আস্তানা পেতেছে। গুণ্ডা জানে ওরা মা আর ছেলে। ওই ফোঁটাকাটা বিড়াল দুটোকে সে মোটেই পছন্দ করে না, তবে সে জানে ওরা তার সঙ্গে লাগতে সাহস পাবে না।
