দুই একবার ক্ষীণ প্রতিবাদ করে শান্তার কাছে হার মানলেন প্রদ্যোতনারায়ণ। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে প্রদ্যোতনারায়ণের খুবই দহরম-মহরম ছিল, হঠাৎ একটা বাঘের বাচ্চা উপহার পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ভারি খুশি হয়েছিলেন।
কিন্তু প্রদ্যোতনারায়ণ খুশি হতে পারেননি। শোনা যায়, তিনি নাকি এক মাস পর্যন্ত স্ত্রীর সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ রেখেছিলেন। শান্তা যে স্ত্রীর প্ররোচনাতেই ব্যাঘ্র শাবকের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছিল, এ বিষয়ে প্রদ্যোতনারায়ণের বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।
যাই হোক, এক সময় সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে এল। কয়েক বছর পরে যোগমায়া যখন বাঘের বাচ্চার কথা প্রায় ভুলতে বসেছেন, সেই সময় হঠাৎ একদিন কোথা থেকে একটি শূকরশাবক সঙ্গে নিয়ে কর্তা বাড়ি ফিরলেন এবং ঘোষণা করলেন ওটাকে তিনি পুষবেন। যোগমায়া এবারেও আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু তার আপত্তি ধোপে টিকল না। নোংরামির জন্য অভিযোগ করতেই প্রদ্যোতনারায়ণ জানালেন জমিদারবাড়িতে অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়ার কিংবা ময়লা ঘাঁটার সুযোগ জন্তুটার হবে না, অতএব সে-বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। শুয়োর খুব নিরীহ জন্তু না হলেও সে যে বাঘের মতো ভয়ানক জীব নয়, এ কথা যোগমায়া দেবীও মানতে বাধ্য হলেন। তার উপর শান্তা এবার শ্বশুরের পক্ষ নিল, সে সাফ বলে দিল সব ব্যাপারে খিটখিট করলে পুরুষ মানুষের রাগ তো হবেই- বিশেষত শুয়োরটা যখন ভিতর-বাড়িতে থাকবে না, তার জন্য যখন আলাদা খোঁয়াড়ের ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন আর মায়ের আপত্তির কি কারণ থাকতে পারে? বাড়িতে কুকুর আছে, বাঁদর আছে, হরেক রকমের পাখি আর বিড়ালও রয়েছে- শুয়োরছানা কি অপরাধ করল?
যোগমায়া কাবু হলেন। শূকর-শাবক থাকল। প্রতাপনারায়ণ কিছু বলল না, কারণ তার বলা কওয়া বাবা গ্রাহ্যই করেন না। তবু জন্তুটাকে সে বিশেষ সুনজরে দেখেনি। কিন্তু প্রতাপের ভালো না লাগলেও বালিকাবধুর সঙ্গে বাচ্চাটার ভারি ভাব হয়ে গেল। কথায় কথায় শান্তা জানতে পারল এক সাহেব শিকারির সঙ্গে মধ্যভারতের অরণ্যে শিকার করতে গিয়েছিলেন। প্রদ্যোতনারায়ণ এবং বাঙালি শিকারির হাতের টিপ দেখে মুগ্ধ হয়ে সাহেব ওই শূকর-শাবকটিকে উপহার দিয়েছে। জন্তুটা ভারতবর্ষের শূকর নয়। আফ্রিকার জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে ওই বাচ্চাটিকে ধরেছিল সাহেব– তারপর ভারতে আসার সময় জন্তুটাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে স্থানান্তরিত হয়ে আফ্রিকার ওয়ার্ট হগ প্রদ্যোতনারায়ণের গৃহেই আশ্রয় গ্রহণ করল।
বাচ্চাটার নামকরণ হল কালু। নাম রেখেছিল শান্তা নিজেই। শূকর-শাবকের নিরাপত্তার জন্য শান্তার দুশ্চিন্তা ছিল যথেষ্ট। দুশ্চিন্তা অহেতুক নয়, জমিদারবাড়িতে বাস করত অনেকগুলো শিকারি কুকুর! অবশ্য কুকুরগুলো দিনের বেলা বাঁধা থাকত, শূকর-শাবকের খোঁয়াড়টাও ছিল বেশ মজবুত। তবু শান্তার ভয় করত- দৈবাৎ যদি সারমেয়বাহিনীর কোনো একটি কুকুর বাচ্চাটার নাগাল পায় তবে শূকর-শাবকের মৃত্যু যে অনিবার্য, এ বিষয়ে শান্তার সন্দেহ ছিল না বিন্দুমাত্র।
কিন্তু আফ্রিকার ওয়ার্ট হগ যে কেমন জিনিস সেটা শান্তার জানা ছিল না। খুব অল্প বয়সেই বাচ্চাটা প্রমাণ করে দিল কারও সাহায্য ছাড়াই সে আত্মরক্ষা করতে জানে। এক রাত্রে হঠাৎ কুকুরদের চিৎকার শুনে বাড়িসুদ্ধ লোকের ঘুম ভেঙে গেল। চিৎকারের শব্দ আসছিল কালুর খোয়াড়ের দিক থেকে। সেখানে গিয়েই সকলের চোখ ছানাবড়া! খুব সম্ভব খাবার দেবার সময়ে ভৃত্য নিধিরাম খোঁয়াড়টা ভালো করে বন্ধ করেনি, ফলে শূকর-শাবক বেরিয়ে পড়েছে নৈশ-ভ্রমণে। রাতের টহলদারকুকুরগুলো বাচ্চাটাকে দেখে ফেলেছে, তারপরই লেগেছে ধুন্ধুমার কাণ্ড! পূর্ববর্তী ঘটনা কি ঘটেছে তা বলা মুশকিল, সকলের চোখে যে দৃশ্য ধরা পড়ল তা হচ্ছে এই :
খোঁয়াড়ের কাছেই একটা কোণ নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে কালু এবং তাকে ঘিরে গর্জন করছে ক্রুদ্ধ কুকুরের দল। দলের পাণ্ডা ডিক (কর্তার প্রিয় হাউন্ড) রক্তাক্ত কাঁধ নিয়ে মাটির উপর ছটফট করছে, স্পষ্টই বোঝা যায় শূকর-শাবকের দন্তাঘাতেই তার ওই দুর্দশা। অন্যান্য কুকুরগুলোর মধ্যে কয়েকটির দেহে রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছে, কালু নিজেও অক্ষত নয়। কিন্তু কুকুরগুলো এখন আর শুকর-শাবকের দিকে এগোতে চাইছে না, দূরে দাঁড়িয়ে আস্ফালন। করছে পয়লা দফা লড়ায়ের পরই তারা বুঝে গেছে এ শিকার খুব নিরীহ নয়, বিশেষ করে দলপতি ডিক আহত হওয়ায় ককরবাহিনী দস্তুরমতো ঘাবড়ে গেছে। দর থেকে জাতীয় ভাষায় গালাগালি করলেও সামনে এসে মোকাবিলা করার সাহস আর কুকুরদের ছিল না।
কুকুর সামলে শূকর-শাবককে খোঁয়াড়ে পুরে ফেলা হল। কর্তা তার পোষা জন্তুর নূতন করে নামকরণ করলেন–গুণ্ডা। নামটা সার্থক হয়েছিল সন্দেহ নেই। মনে রাখতে হবে কুকুরগুলো সাধারণ কুকুর নয়, শক্তিশালী হাউন্ড। এতগুলো শিকারি কুকুরের মহড়া নেওয়া চিতাবাঘের পক্ষেও কঠিন।
কর্তা অবশ্য খুব অবাক হননি। তিনি জানতেন ওয়ার্ট হগ কি জিনিস। আহত কুকুরগুলোর চিকিৎসা করা হল। সবচেয়ে ভীষণভাবে আহত হয়েছিল ডিক। চিকিৎসার গুণে সেও আবোগ্যলাভ করল। মাঝে মাঝে গুণ্ডার দিকে তাকিয়ে গর্জন করলেও ডিক আর শক্তিপরীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেনি- এক রাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝে গিয়েছিল এ শত্রু বড়ো ভয়ানক, দুর থেকে একে গালি দেওয়া যায় কিন্তু কাছে গিয়ে ঠোকাঠুকি করলে যে কোনো সময়ে প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হতে পারে।
