দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, দেরির জন্য আমি দায়ী নই। তোমরা কর্তা গিন্নি যদি শিকারে যাওয়ার আগে বরাহতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করো, তাহলে আমি কি করব?
অন্তঃপুর থেকে বাইরের দালানের দিকে পা চালাতে চালাতে প্রতাপনারায়ণ বললেন, আর সময় নষ্ট করব না। চল, ঘোড়া সাজাতে বলে দিয়েছি অনেকক্ষণ আগে।
বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে লক্ষ করতে লাগলেন শান্তা দেবী। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারটে প্রকাণ্ড শিকারি কুকুর আর একদল লাঠি ও বর্শাধারী মানুষ নিয়ে দুই বন্ধু অশ্বপৃষ্ঠে অগ্রসর হলেন।
লাঠি-সোঁটা হাতে যে লোকগুলো শিকারিদের সাহায্য করতে চলল, তাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শান্তার সুন্দর মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া পড়ল, অস্পষ্ট স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ও কি, হারান-সর্দার! সেও আছে দলের মধ্যে! কী জানি, আজ কী সর্বনাশ হয়?
অস্ত্রধারী মানুষগুলোর মধ্যে হারান-সর্দার নামক যে বিশেষ ব্যক্তিটি জমিদার-গৃহিণীর চিত্তে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে তার একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। ওই সঙ্গে পূর্ব কথা নিয়েও একটু আলোচনা নিতান্তই প্রয়োজন। শিকারিরা এগিয়ে যাক সেইদিকে, যেখানে খোকা-চিতাবাঘ আর তার মা গুপ্তার ঘাড়ের উপর দিয়ে লাফ মেরে চম্পট দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে আমরা ততক্ষণ হারানো অতীত নিয়ে একটু আলোচনা করি।
.
০৩.
প্রতাপনারায়ণের পিতা প্রদ্যোতনারায়ণ চৌধুরী অদ্ভুত মানুষ। তখনকার দিনে অধিকাংশ জমিদারই হতেন স্বেচ্ছাচারী ও বিলাসী প্রদ্যোতনারায়ণকে সেদিক থেকে নিয়মের ব্যতিক্রম বললে সত্যের অপলাপ হয় না। তবে তিনি ছিলেন ভয়ংকর খামখেয়ালি। আর সেই খেয়ালের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তাঁর স্ত্রী যোগমায়া দেবী।
প্রদ্যোতনারায়ণের প্রধান শখ ছিল শিকার এবং জন্তু-জানোয়ার পোষা। বই পড়তেও তিনি খুব ভালোবাসতেন। তখনকার দিনের ভূস্বামীদের মতো বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে তিনি অধিকাংশ সময়েই পড়াশুনা করে সময় কাটাতেন। এই ব্যাপারে যোগমায়ার বিশেষ আপত্তি ছিল না। অবশ্য খুব দরকারি কথা বলতে এসে পাঠমগ্ন স্বামীর মুখ থেকে যখন হাঅথবা না ছাড়া আর কোনো কথা শোনা যেত না তখন জমিদারপত্নী খুবই বিরক্ত হতেন সন্দেহ নেই, তবে সেই বিরক্তিটা এমন কিছু ধর্তব্য নয়। সংসার করতে গেলে অনেক কিছুই মানিয়ে নিতে হয়, স্বামীর বই পড়া বাতিকটাও যোগমায়া মেনে নিয়েছিলেন। বিভিন্ন জাতের পাখি আর জানোয়ার (কুকুর তো ছিলই) দিয়ে কর্তা যখন জমিদার বাড়িকে প্রায় চিড়িয়াখানা করে তুললেন তখনও বিশেষ আপত্তি করেননি যোগমায়া, কিন্তু একবার শিকার করে ফিরে আসার সময়ে কর্তা যখন একটা বাঘের বাচ্চা নিয়ে এলেন এবং জানালেন সেটাকে তিনি পুষবেন, সেই দিনই যোগমায়া সরোষে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন।
বাঘ যে কুকুরের মতোই পোষ মানতে পারে, এ কথা বিশ্বাস করলেন না যোগমায়া। বাঘ সম্বন্ধে জীবতত্ত্ববিদদের মূল্যবান তথ্যগুলোকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিলেন মানুষখেকো জন্তুর সঙ্গে ঘর করতে তিনি রাজি নন, প্রদ্যোতনারায়ণ যদি নিতান্তই বাঘের বাচ্চা পষতে চান তবে স্ত্রী সান্নিধ্য তাঁকে ত্যাগ করতে হবে, কারণ, যোগমায়া তাহলে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতেই বসবাস করবেন।
বাঘ মাত্রেই যে মানুষখেকো হয় না, এ কথা বার বার বলেও কোনো ফল হল না, গেম-কিলার আর ক্যাটল লিফটার-এর সঙ্গে ম্যান-ঈটার বাঘের তফাত বোঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন অভিজ্ঞ শিকারি প্রদ্যোতনারায়ণ–কিন্তু যোগমায়া স্বামীর কথায় কর্ণপাত করলেন না। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে সব বাঘই মানুষ খায় এবং ছেলেপুলের ঘরে এমন বিপজ্জনক জানোয়ারকে তিনি স্থান দিতে রাজি নন~ অতএব বাঘের বাচ্চা আর স্ত্রীর মধ্যে এক জনকে প্রদ্যোতনারায়ণের বেছে নিতে হবে।
প্রদ্যোতনারায়ণকে দেখলে খুব শান্ত মানুষ মনে হয়। তাকে কেউ কখনো উত্তেজিত হতে দেখেনি। মাত্র দশ হাত দূর থেকে তেড়ে-আসা বাঘকে যখন তিনি গুলি চালিয়ে মাটির উপর পেড়ে ফেলেছেন তখনো তার মুখে-চোখে সঙ্গীরা উত্তেজনার চিহ্ন দেখতে পায়নি। কিন্তু আপাতশান্ত প্রদ্যোতনারায়ণ ছিলেন ভীষণ জেদি। একবার জেদ ধরলে তাঁকে নিরস্ত করা খুবই কঠিন।
স্ত্রীর সঙ্গে অনেকক্ষণ বাদানুবাদ করার পরেও যোগমায়া যখন বাঘের বাচ্চার সান্নিধ্য সহ্য করতে রাজি হলেন না, তখ ভাবেই প্রদ্যোতনারায়ণ জানালেন কারও স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা দিতে তিনি চান না এবং তার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করে, এটাও বাঞ্ছনীয় নয়– অতএব যোগমায়া যদি নিতান্তই বাপের বাড়ি যেতে চান তবে যাবেন, কিন্তু বাঘের বাচ্চা থাকবে।
ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কি হত বলা মুশকিল, তবে শেষ রক্ষা করল পুত্রবধূ শান্তা। খুব অল্প বয়সেই একমাত্র পুত্র প্রতাপের বিয়ে দিয়ে এই সুলক্ষণা মেয়েটিকে পুত্রবধূ করে ঘরে এনেছিলেন প্রদ্যোতনারায়ণ। কন্যাসমা এই মেয়েটির আবদার তিনি ঠেলতে পারতেন না। ঘরের বৌ নয়, ঘরের মেয়ের মতোই ব্যবহার করতে শান্তা শ্বশুরের সঙ্গে।
যোগমায়া যখন বাপেরবাড়ি যাওয়ার উদ্যোগ করছেন, এবং সেদিকেদৃকপাতনা করেপ্রদ্যোতনারায়ণ যখন ব্যাঘ্ৰশাবকের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, সেই সময় হঠাৎ এগিয়ে এল শান্তা-বাবা! এ কি হচ্ছে? মার চাইতে কি বাঘের বাচ্চা তোমার কাছে বড়ো হল?
