শোন খোকা, মা বলল, এখান থেকে এক লাফ মেরে শুয়োরটাকে ডিঙিয়ে চলে যা। তারপর সামনের ছোটো বিলটার মধ্যে নেমে সাঁতার কেটে উলটোদিকে গিয়ে ঢুকে যাবি পাশের বনে। আমি তোর পিছনে আসছি।
খোকা অবাক হয়ে বলল, কেন মা? শুয়োরটাকে তো আমরা দুজনে মিলে মেরে ফেলতে পারি। আর যদি ওকে না মারি তাহলেই বা শুধু শুধু ছুটোছুটি করতে যাব কেন? আমার খিদে পেয়েছে। আমি এখন খেতে চাই, ছুটতে বা সাঁতার কাটতে চাই না।
মা বলল, ওই গুণ্ডা শুয়োরটাকে আমরা দুজনে মিলেও মারতে পারব না। তবে ওকে নিয়ে এখন আমি একটুও মাথা ঘামাতে রাজি নই। ওকে না ঘটালে ও আমাদের সঙ্গে লাগতে আসবে না। তা ছাড়া, গাছে উঠে আমরা ওকে অনায়াসেই ফাঁকি দিতে পারি। কিন্তু শুয়োর নয় আমাদের পিছন দিক থেকে এগিয়ে আসছে আর এক বিপদ। গ্রাম থেকে এক দল লোক কুকুর নিয়ে বনে শিকার করতে আসছে। পাজি কুকুরগুলো গন্ধ শুঁকে আমাদের ধরে ফেলবে। গাছে উঠেও রক্ষা নেই, মানুষগুলো তলা থেকে এক রকম লাঠি থেকে আগুন ছুঁড়ে মারবে, আর সেই আগুন গায়ে লাগলেই আমরা মারা যাব। গুণ্ডা শুয়োরটা এখনো শিকারিদের খবর পায় নি। ও হয়তো আমাদের তাড়া করতে পারে। কিন্তু সেজন্য ভাবনা নেই। চিতাবাঘদের সঙ্গে দৌড়ে কোনো শুয়োর জিততে পারে না। আর কুকুরগুলো যদি ওর পিছনে তাড়া করে তাহলে তো আমরা বেঁচেই গেলাম।
খোকা প্রশ্ন করল, দলে কতগুলো কুকুর আছে তুমি জানো? মা বলল, জানি বৈকি। গাছের উপর থেকে ওদের দেখতে পেয়েই আমি এদিকে ছুটে এসেছি। দলে আছে চার-চারটি কুকুর। কুকুরদের সঙ্গে আছে অনেকগুলো মানুষ। তাদের হাতে অনেক অস্ত্রশস্ত্র। দু’জন আবার ঘোড়ায় চড়ে আসছে। নাঃ, আর দেরি করা ঠিক নয়। খোকা! এইবার টেনে এক লাফ মার, কে জানে ভাগ্যে কি আছে!
.
০২.
ভাগ্যে কি আছে ভগবানই জানেন, শান্তা দেবীর গলার স্বরে ক্ষোভ, বাবার বড় আদরের জীব ছিল ও। ওকে মারতে যাওয়া কি উচিত হবে?
প্রতাপনারায়ণ হেসে উঠলেন, বাবার আদরের জীব এখন আর আদর করার মতো নেই। হয়তো একদিন শুনবে সে মানুষ মেরে বসেছে। তা ছাড়া ওকে মারব বলেই যে শিকারে যাচ্ছি একথা ভাবছ কেন? ওই জঙ্গলে দুটো চিতাবাঘ এসেছে; বুনো খরগোশ আর ছোটো হরিণও ওখানে পাওয়া যায়।
শান্তা বললেন, তুমি যাই বলল না কেন, আমি তো জানি গুপ্তার উপর তোমার অনেক দিনের রাগ। গাঁয়ের ধারে ছোটো জঙ্গলগুলোতে আজকাল ওকে প্রায়ই দেখা যায়। আমার মনে হচ্ছে সুবিধে পেলেই তুমি ওকে মারবার চেষ্টা করবে।
কী মুশকিল, প্রতাপনারায়ণ বললেন, মারার ইচ্ছে থাকলে আমি কি আগেই ওকে মারতে পারতুম না?
সে তো আমার জন্যে, শান্তা বললেন, প্রত্যেক বার শিকারে যাওয়ার আগে আমি তোমাকে দিব্যি দিয়ে গুণ্ডাকে মারতে নিষেধ করেছি।
-তবে আর ভয় পাচ্ছো কেন?
-ভয় পাচ্ছি, কারণ, এইবার তোমার সঙ্গে আছেন দেবেনবাবু। তাকে তো আর আমি দিব্যি দিয়ে বারণ করতে পারব না। তোমার ইশারায় যদি দেবেনবাবু–
দেবেনবাবু আবার কি অপরাধ করল বৌঠান? বলতে বলতে সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রতাপনারাণের বন্ধু দেবেন্দ্রবিজয়।
শশব্যস্তে ঘোমটা টেনেশান্তা বললেন, আপনার বন্ধুকে একটা কথা বলছিলাম। পাশের জঙ্গলে একটা মস্ত শুয়োর আছে। ওটা এককালে এই বাড়িতেই ছিল, বাবা শখ করে পুষেছিলেন ওকে। বাবার মৃত্যুর পর গুণ্ডা অর্থাৎ ওই শুয়োরটা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তাই ওঁকে সাবধান করে দিচ্ছিলাম ওটার উপর যেন হামলা না হয়। আর আপনাকেও ব্যাপারটা জানিয়ে দিতে বলছিলাম।
দেবেন্দ্রবিজয় বললেন, আপনার শ্বশুরমশাইয়ের পোষা শুয়োরের কথা আমি আগেই শুনেছি প্রতাপের মুখে। আপনি যদি বারণ করেন তাহলে ওটাকে না হয় ছেড়েই দেওয়া হবে। তবে জঙ্গলে তো আরও দুচারটে শুয়োর থাকতে পারে, আর শুয়োরদের গায়ে নাম লেখাও থাকে না– সুতরাং অজান্তে যদি ওটাকে মেরে বসি, তাহলে অপরাধ নেবেন না। আরও একটা কথা বলছি বৌঠান– বুনো শুয়োর সাংঘাতিক জীব। গাঁয়ের এত কাছে জন্তুটা থাকে, এ ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না, কোনোদিন হয়তো তোকজনকে মেরে ফেলতে পারে।
শান্তার মুখে ক্রোধের আভাস ফুটে উঠল, কিন্তু অতিথির মর্যাদার কথা ভেবে তিনি কণ্ঠস্বর সংযত করলেন, ঠাকুরপো! গুণ্ডাকে আমি ছোটোবেলা থেকেই দেখছি। ওকে না মারলে ও কারুকে মারবে না। আর গায়ে নাম লেখা না থাকলেও ওর চেহারা দেখলেই ওকে আপনি চিনতে পারবেন। ভারতবর্ষের কোনো শুয়োরের ঘাড়ে ওরকম ঝাঁকড়া কেশরের মতো লোম হয় না, চেহারাটাও বেশ অন্য রকম– আপনি যখন ওর কাছে সব কথাই শুনেছেন, তখন এ কথাও নিশ্চয়ই জানেন যে, গুণ্ডা এখানকার জন্তু নয়।
দেবেন্দ্রবিজয় বুদ্ধিমান মানুষ, বন্ধুপত্নীর সংযত স্বর থেকেও তিনি উম্মার আভাস ধরে ফেললেন। ব্যাপারটাকে সহজ করে নেবার চেষ্টা করলেন তিনি, হ্যাঁ শুনেছি, আফ্রিকা থেকে এক সাহেব ওকে ধরে এনেছিল। আপনার শ্বশুরমশাই সেই সাহেবের কাছ থেকেই ওই শুয়োরটা উপহার পেয়েছিলেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন বৌঠান আপনার আদরের শুয়োর যদি গায়ে পড়ে মারামারি করতে না আসে, তাহলে আমরা তাকে মারতে যাব না।
প্রতাপনারায়ণ বললেন, কিন্তু অন্য জন্তু তো মারব। যদি শিকারে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে এইবার বেরিয়ে পড়া উচিত। যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে।
