অনেক সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোপনে তদন্ত চালিয়ে অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করত শেরিফ স্লটার। উপযুক্ত প্রমাণ হাতে এলেই সে অপরাধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে দশ দিনের মধ্যে শহর ত্যাগ করার আদেশ দিত। অপরাধী জানত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শহর ছাড়তে রাজি না হলে তাকে পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হবে–অতএব সুবোধ বালকের মতোই সে শেরিফের আদেশ পালন করত নির্বিবাদে!
কোনো কোনো চিন্তাশীল নাগরিক কিন্তু স্লটারের কার্যকলাপ সমর্থন করতেন না। তারা বলতেন, স্লটারকে শেরিফের পদে নির্বাচিত করা হয়েছে, কিন্তু সে অবতীর্ণ হয়েছে একাধারে বিচারক, জুরি এবং ঘাতকের ভূমিকায়!
যে যাই বলুক, টম্বস্টোন শহরে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্লটারের চেষ্টায়। ১৯২২ সালে যখন জন স্লটারের মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স প্রায় বিরাশি।
[১৩৮৭]
পলাতক গুণ্ডা
০১.
সন-তারিখের হিসাব গুণ্ডা রাখে না। আমরা রাখি। তাই পৌষমাসের এক সকালে জমিদার প্রতাপনারায়ণ চৌধুরী এবং তার বন্ধু দেবেন্দ্রবিজয় বসুর শিকারের তোড়জোড় করার কথা শুনে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ, সময়টা হচ্ছে ১৯১০ সাল, ইংরেজ-অধিকৃত ভারতে তখনও জমিদারি প্রথা বর্তমান।
গুণ্ডা অবশ্য এ সব ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। সত্যিকথা বলতে কি, একমাত্র খাবার-দাবারের ব্যাপার ছাড়া খুব কম বিষয়েই সে মাথা ঘামায়। একটু দূরে উঁচু জমির উপর দাঁড়িয়ে থোকাবাবু যে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঠোঁট চাটছে, সেই দৃশ্যটা গুণ্ডার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি, কিন্তু ব্যাপারটাকে সে মোটেই গুরুত্ব দেয়নি। সামনের ভিজে মাটিতে বেশ মিষ্টি মিষ্টি গাছের মুল পাওয়া গেছে, সেগুলো দিয়ে পেট ভরাতেই সে ব্যস্ত কোথাকার কে খোকাবাবু তার দিকে তাকিয়ে কি ভাবছে আর কি করছে তা নিয়ে চিন্তা করতে সে এখন রাজি নয়।
গুণ্ডা চিন্তা না করলেও খোকাবাবু কিন্তু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। গুণ্ডার দিকে তাকিয়ে তার জিভে জল জমছে। তবে হঠাৎ তার উপর লাফিয়ে পড়া উচিত হবে কি না বুঝতে পারছে না।
ওই যাঃ! প্রথমেই তো আসল কথাটা বলতে ভুলে গেছি! গুণ্ডা হচ্ছে একটা মস্ত দাঁতাল শুয়োর। আর আমাদের খোকাবাবু হচ্ছে একটি খোকা-চিতাবাঘ। চিতাবাঘদের সমাজে তাকে বাচ্চা মনে করা হয় বটে, কিন্তু তোমরা তাকে দেখলে কিছুতেই বাচ্চা বা খোকা বলে মানতে রাজি হবে না। মাত্র দেড় বছর বয়সেই তার কাধ আর পায়ের মাংসপেশী দস্তুরমতো পুষ্ট, থাবার নখ আর মুখের দাঁত দেখলে মস্ত বড়ো ‘হাউণ্ড’ কুকুরও তার সামনে এককভাবে এগিয়ে আসতে সাহস পাবে না।
খোকা দাঁড়িয়ে ছিল একটু উঁচু জমির উপর। এতক্ষণে সে হয়তো লাফিয়ে পড়ত, তবে কয়েকটা কথা ভেবে সে একটু ইতস্তত করছিল। খুব ছোটোবেলা থেকেই সে মায়ের কাছে শুনে এসেছে দাঁতাল শুয়োরগুলো বড়ো সাংঘাতিক জীব, ওদের সঙ্গে লাগতে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। ও সব কথার খুব বেশি দাম দেয়নি খোকা। অল্প বয়সের গরম রক্তে এখন খুনের নেশা, খোকা সুবিধা পেলেই শিকারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তে চায় বেশি বয়সের অভিজ্ঞতার দাম সে এখনও দিতে শেখেনি। তবু সে যে এতক্ষণে শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, তার কারণ মায়ের উপদেশ নয় শুয়োরের চেহারা দেখেই সে একটু ঘাবড়াচ্ছে। এর মধ্যে জন্তুটা একবার তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে, তারপর আবার মাটি খুঁড়ে শিকড় বার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিকারের এমন নির্বিকার ভাব দেখে আশ্চর্য হয়েছে খোকা। তার অভিজ্ঞতায় সে জেনেছে জন্তুরা তাকে দেখলে দৌড়ে পালায়, অথবা রুখে দাঁড়ায় কিন্তু এই জটা তাকে গ্রাহ্যই করছে না।
খোকা মনস্থির করে ফেলল। তার কাঁধের মাংসপেশী ফুলে উঠল, দুই কান চ্যাপটা হয়ে মিশে গেল মাথার খুলির সঙ্গে, লেজটা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মাটির উপর একবার, দুবার, তিনবার কিন্তু লাফ দেবার আগেই ঘাড়ের উপর এক দারুণ থাপ্পড় খেয়ে ছিটকে পড়ল খোকাবাবু, সঙ্গে সঙ্গে মায়ের চাপা গর্জন, করছিস কি খোকা? মরবি নাকি?
মা-চিতাবাঘ যে কিছুক্ষণ আগেই ছেলের খোঁজ করতে করতে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে এবং আড়াল থেকে সবকিছু লক্ষ করছে সে কথা খোকা জানতে পারেনি- এখন আচমকা মার খেয়ে তার মেজাজ বিগড়ে গেল।
দুই চোখে আগুন জ্বালিয়ে থোকা মায়ের দিকে ফিরল, আমি মরব না, ওকে মারব। কিন্তু তুমি আমায় যখন-তখন চড় মারবে না। সাবধান!
মায়ের চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠল। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে খোকার চোখের আগুন নিবে গেল তৎক্ষণাৎ। খোকা জানে এখনও মায়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা তার হয়নি। গায়ের জোর হয়তো তার মায়ের চাইতে কম নয়, কিন্তু লড়াইয়ের কায়দা-টায়দাগুলো সে এখনও তেমন রপ্ত করতে পারেনি মা এত চটপট দাঁত আর নখ চালাতে পারে যে মারামারি করতে গেলে খোকা মার খেয়ে ভূত হয়ে যাবে।
তোমরা হয়তো ভাবছো, সে কি! ভারি অসভ্য ছেলে তো! মা মারলে কোনো ছেলে উলটে মাকে মারে নাকি?
তা মারে; চিতাবাঘদের সমাজে মাতৃস্নেহ আছে, মায়ের প্রতি ছেলের আকর্ষণও থাকে— কিন্তু সময়-বিশেষে খুনোখুনি করতে তাদের বাধে না।
আমাদের খোকাবাবু অবশ্য মায়ের গায়ে এখনও পর্যন্ত থাবা তোলেনি। তবে তার মা জানে কয়েক দিন বাদেই খোকা আর মাকে মানতে চাইবে না। সেইজন্য মা-চিতাবাঘ যে বিশেষ চিন্তিত তা নয়, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে সে ভালোভাবেই জানে এখন ছেলের অবাধ্যতার চাইতে পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়েই সে বিশেষভাবে চিন্তিত।
